মোহাম্মদ সালাহর বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে চোখের জলে। অন্যদিকে লামিন ইয়ামালের বিশ্বকাপ যেন কেবল শুরু। এক প্রজন্ম বিদায় নিচ্ছে, আরেক প্রজন্ম উঠে আসছে বিশ্বফুটবলের কেন্দ্রে। এই দুই গল্পই যেন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে আছে বিশ্বকাপ ২০২৬-এ।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বহুল আলোচিত ও ঘটনাবহুল ম্যাচে ২-৩ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে মিশর। কিন্তু মোহাম্মদ সালাহর জন্য ম্যাচটা ছিল স্রেফ একটা হার নয়, এক যুগের সমাপ্তি। একই সঙ্গে শুরু হচ্ছে আরেকটি অধ্যায়। উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বকাপে মুসলিম ফুটবলাররা শুধু আরব কিংবা আফ্রিকার প্রতিনিধিই নন, তারা এখন ইউরোপ ও আমেরিকার বড় দলগুলোরও প্রধান ভরসা।
আটলান্টা স্টেডিয়ামে গত মঙ্গলবার রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচে মিশর ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা তখন বিদায়ের মুখে। কিন্তু শেষ ১১ মিনিটে ৩৯ বছর বয়সী মেসি আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাকে এখনো লেখা শেষ করা যায় না। ইয়াসের ইব্রাহিম আর মোস্তফা জিকোর গোলে এগিয়ে থাকা মিশরকে ভেঙে দিয়ে আর্জেন্টিনা জেতে ৩-২ ব্যবধানে। এই ম্যাচকে ঘিরে সারাবিশ্বের ফুটবল ভক্তরা এখনও মেতে আছেন আলোচনা ও সমালোচনায়।
দুই নাম্বার টেনের লড়াই
ম্যাচটা ছিল আসলে দুই প্রজন্মের প্রতীকী সংঘর্ষ। কায়রোর পূর্বে এল-মোকাওলুন একাডেমি থেকে উঠে আসা কিশোর সালাহকে একসময় ডাকা হতো ‘মিশরীয় মেসি’ বলে। বাঁ পায়ের কারিকুরি, গতি আর গোলের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকা যেকোনো উইঙ্গারকেই তখন এই তকমা দেওয়া হতো বিশ্বজুড়ে। জাপানের রিও মিয়াইচি, স্কটল্যান্ডের রায়ান গল্ড, মেক্সিকোর জিওভানি দস সান্তোস, প্রত্যেক দেশই খুঁজছিল নিজেদের একটা ‘মেসি’। বেশিরভাগই হারিয়ে গেছেন, সালাহ ব্যতিক্রম। তিনি তুলনার কাছাকাছি পৌঁছেও নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার গল্পটা থেকে গেছে অপূর্ণ। ক্লাব ফুটবলে প্রায় সবকিছু জিতলেও জাতীয় দলের জার্সিতে ভাগ্য কখনো পুরোপুরি হাসেনি তার দিকে। ২০১৮ বিশ্বকাপে ইনজুরির কারণে নিজের সেরাটা দিতে পারেননি। ২০১৭ ও ২০২২, দুইবার আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে হেরেছেন, একবার ক্যামেরুনের কাছে, একবার সেনেগালের কাছে। এবারের বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মতো মিশরকে গ্রুপ পর্বের বাধা পেরিয়ে নক-আউট রাউন্ডে জয় এনে দিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআউটে। আর্জেন্টিনাকে হারাতে পারলে মিশর হতো ক্যামেরুন (১৯৯০), সেনেগাল (২০০২), ঘানা (২০১০) ও মরক্কোর (২০২২, ২০২৬) পর পঞ্চম আফ্রিকান দেশ, যারা কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখে। সেই স্বপ্নভঙ্গ হলো মেসির হাতেই।
৩৪ বছর বয়সী সালাহর জন্য এটাই সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ। মিশরের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আক্ষেপ একটাই, যে ট্রফিটা মেসি খুঁজে পেয়েছেন নিজের প্রায়শ্চিত্তের গল্পে, সালাহর হাতে সেটা এলো না।
ক্লাব ফুটবলে অবশ্য ‘মিশরীয় রাজা’র অর্জনের ভাণ্ডার ঠাসা। লিভারপুলের হয়ে ৯ মৌসুমে প্রায় ২৪৫ গোল করে তিনি ক্লাবটির ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা, প্রিমিয়ার লিগে বিদেশিদের মধ্যে সর্বোচ্চ গোলদাতাও। জিতেছেন চারটি প্রিমিয়ার লিগ গোল্ডেন বুট, দুটি লিগ শিরোপা (২০১৯-২০ ও ২০২৪-২৫), ২০১৯ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ, আর দুবার হয়েছেন ফুটবল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের বর্ষসেরা। চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা আফ্রিকান খেলোয়াড়ও তিনিই। বিশ্বকাপ কখনো কখনো সেরা খেলোয়াড়কেও অসম্পূর্ণ রেখেই ইতিহাস লিখে ফেলে। সালাহ সেই ইতিহাসেরই আরেকটি নাম।
আরও আলো ছড়িয়েছেন যারা
সালাহর বিদায়ের পরও এই বিশ্বকাপে মুসলিম তারকাদের উপস্থিতি ফুরিয়ে যায়নি। বরং কোয়ার্টার ফাইনালেই (৯ জুলাই) মুখোমুখি দুই মুসলিম মহাতারকা: আশরাফ হাকিমি ও উসমান ডেম্বেলে।
মরক্কোর অধিনায়ক হাকিমি এই আসরে নিজেকে বিশ্বের সেরা রাইট-ব্যাক হিসেবে আরও একবার প্রমাণ করেছেন, একটা গোল, দুটি অ্যাসিস্ট আর রক্ষণে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কানাডাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে মরক্কোই প্রথম দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছিল। ফ্রান্সের বিপক্ষে ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের সেই তিক্ত হারের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ এবার হাকিমিদের সামনে।
হাকিমির পাশে মরক্কোর এবারের সবচেয়ে বড় চমক ইসমাইল সাইবেরি। স্পেনে জন্ম, বেলজিয়ামে বেড়ে ওঠা এই ২৫ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড স্পেন, বেলজিয়াম ও মরক্কো, তিন দেশের হয়ে খেলার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বেছে নিয়েছিলেন বাবা-মায়ের দেশ মরক্কোকে। এই আসরে ‘ফলস নাইন’ ভূমিকায় তিনিই টুর্নামেন্টের অন্যতম ব্রেকআউট তারকা, গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করে হয়েছেন সালাহর পর দ্বিতীয় আফ্রিকান, যিনি নিজের প্রথম দুই বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল পেয়েছেন।

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শুটআউটে জয়সূচক পেনাল্টিটাও তার পা থেকেই এসেছিল। বিশ্বকাপ চলাকালেই বায়ার্ন মিউনিখ তাকে দলে ভেড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। কানাডার বিপক্ষে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি অবশ্য ফ্রান্সের বিপক্ষে তার খেলা নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে।
অন্যদিকে ফ্রান্সের আক্রমণভাগে ডেম্বেলে, ২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী, এই আসরে করেছেন চার গোল, অ্যাসিস্ট দুটি। নরওয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকও আছে তার নামের পাশে। মালিয়ান বাবা ও সেনেগালিজ-মৌরিতানিয়ান মায়ের সন্তান ডেম্বেলে তার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে খোলাখুলিভাবে কথা বলেন, রোজা রাখেন খেলার মধ্যেও।
আফ্রিকার আরেক মহাতারকা সাদিও মানেও এই আসরে সেনেগালের নেতৃত্বে ছিলেন। লিভারপুল ও বায়ার্ন মিউনিখ ঘুরে এখন সৌদি আরবের আল-নাসরে খেলা এই ফরোয়ার্ড বাছাইপর্বে পাঁচ গোল করে দলকে বিশ্বকাপে তুলেছিলেন। সেনেগালের হয়ে ২০২১ ও ২০২২ সালে আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ের নায়ক তিনি, ২০২২ সালে জিতেছিলেন আফ্রিকান বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিও।
৩৩ বছর বয়সী মানের জন্যও এটাই সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ। যদিও সেনেগাল এবার গ্রুপ পর্বের বাধা পেরোতে পারেনি, একজন অনুশীলনরত মুসলিম হিসেবে মানে বহু বছর ধরে আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম বড় মুখ হয়ে আছেন সাদিও মানে।
আলজেরিয়ার রিয়াদ মাহরেজ এবার দলকে নক-আউট পর্বে তুলতে পারেননি, তবে স্পেনের জার্সিতে এখনো টিকে আছেন আরেক মুসলিম তারকা লামিন ইয়ামাল। এছাড়া সুইজারল্যান্ডের মিডফিল্ড সামলাচ্ছেন কসোভো বংশোদ্ভূত মুসলিম গ্রানিত জাকা, যার দল কোয়ার্টার ফাইনালে এখনো টিকে আছে।
ইউরোপ-আমেরিকার জার্সিতে মুসলিম মুখ
মুসলিম ফুটবলারদের গল্প এখন আর শুধু মরক্কো, মিশর বা সেনেগালের গল্প নয়। ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী ফুটবল শক্তিগুলোর পরিচয়ও বদলে দিয়েছে অভিবাসী পরিবারের নতুন প্রজন্ম। মরক্কো, সেনেগাল, মালি, তুরস্ক, কসোভো বা তিউনিসিয়া থেকে আসা পরিবারের সন্তানরা আজ ফ্রান্স, সুইডেন, বেলজিয়াম বা ইংল্যান্ডের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপ খেলছেন এবং নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় আড়াল করেন না।
সুইডেন: ইয়াসিন আয়ারি
স্টকহোমে জন্ম নেওয়া মিডফিল্ডার আয়ারির বাবা তিউনিসিয়ান, মা মরক্কান। তিন দেশেরই হয়ে খেলার সুযোগ থাকলেও তিনি বেছে নিয়েছিলেন জন্মভূমি সুইডেনকে।
তিউনিসিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই তৈরি করেছিলেন টুর্নামেন্টের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য। সপ্তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক শটে গোল করেন তিনি, সুইডেন শেষ পর্যন্ত জেতে ৫-১ গোলে।
তবে প্রথম গোলের পর তিনি উদযাপন করেননি, হাত তুলে সিজদায় নত হয়েছিলেন। কারণটা ব্যক্তিগত। বাবার দেশের বিপক্ষে গোল করে উল্লাস করাটা তার কাছে মনে হয়েছিল অসম্মানজনক। ৯৫তম মিনিটে দ্বিতীয় গোলের পরই কেবল নিজের পরিচিত হাঁটু-স্লাইড উদযাপনে মাতেন তিনি।
ইংল্যান্ড: জেড স্পেন্স
টটেনহ্যাম ডিফেন্ডার জেড স্পেন্স ইংল্যান্ডের ইতিহাসে সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে খেলা প্রথম প্রকাশ্য মুসলিম খেলোয়াড়। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন খেলোয়াড়দের ধর্মীয় পরিচয়ের রেকর্ড রাখে না, তবে বিবিসিসহ একাধিক গণমাধ্যম তাকে এই তকমা দিয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সার্বিয়ার বিপক্ষে বাছাইপর্বের ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে গড়েছিলেন এই ইতিহাস। স্পেন্স নিজেই বলেছেন, তরুণ মুসলিমদের জন্য, এবং যেকোনো ধর্মের শিশুদের জন্য, একটা উদাহরণ হয়ে থাকতে চান তিনি।
বেলজিয়াম: আমাদু ওনানা
সেনেগালিজ বংশোদ্ভূত ওনানা বেলজিয়ামের মাঝমাঠের মূল স্তম্ভ। শারীরিক শক্তি আর বল দখলের দক্ষতায় তিনি দলের অন্যতম নির্ভরতা।
যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে বেলজিয়াম শেষ ষোলো নিশ্চিত করার পথে ওনানার মাঝমাঠ-নিয়ন্ত্রণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
ফ্রান্স: ডেম্বেলের পাশে আরও যারা
ডেম্বেলে একা নন, ফ্রান্স দলে মুসলিম খেলোয়াড়দের উপস্থিতি আরও বিস্তৃত। অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার এনগোলো কন্তে, ডিফেন্ডার ইব্রাহিমা কোনাতে ও মিডফিল্ডার ইউসুফ ফোফানা, সবাই মুসলিম পরিবার থেকে উঠে এসে জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন।
অধিনায়ক এমবাপ্পে নিজে খ্রিষ্টান বিশ্বাসের কথা বলেছেন, তবে তার মা ফাইজা লামারি আলজেরীয় কাবাইল মুসলিম পরিবারের সন্তান, ফরাসি ফুটবলের বহুত্ববাদী চরিত্রের আরেকটা প্রতিচ্ছবি।
সুইজারল্যান্ড: জাকা ও কোমার্ট
কসোভোর আলবেনীয় মুসলিম পরিবার থেকে আসা গ্রানিত জাকা সুইজারল্যান্ডের মাঝমাঠের নেতা। রক্ষণে তুর্কি বংশোদ্ভূত এরাই কোমার্টও দলের গুরুত্বপূর্ণ ভরসা।
কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার মুখোমুখি সুইজারল্যান্ড এখনো টুর্নামেন্টে টিকে আছে এই দুজনের ওপর ভর করেই।
তুরস্ক: আর্দা গুলার
মুসলিম-প্রধান দেশ হলেও তুরস্ক ইউরোপীয় ফুটবলের অংশ হিসেবেই পরিচিত। ২০০২ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফেরা দলটির সবচেয়ে বড় তারকা রিয়াল মাদ্রিদের ২১ বছর বয়সী আর্দা গুলার।
সৃজনশীলতা আর গোলের কাছাকাছি খেলার সহজাত দক্ষতায় তিনি এই প্রজন্মের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল তুর্কি মিডফিল্ডার হিসেবে বিবেচিত।
এই তালিকা শুধু ফুটবলীয় দক্ষতার প্রশ্ন নয়, ইউরোপের সমাজে অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়ার গল্পও বটে, যা মহাদেশটির বদলে যাওয়া চিত্রেরই প্রতিফলন।
ইয়ামাল ও নতুন প্রজন্মের ঝলক
সালাহ বিদায় নিচ্ছেন। আর বিশ্বফুটবল বরণ করে নিচ্ছে নতুন এক সুপারস্টারকে। তার নাম লামিনে ইয়ামাল।
এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে আলোচিত তরুণ মুখ নিঃসন্দেহে ১৮ বছর বয়সী এই বার্সেলোনা উইঙ্গার। মরক্কান বাবার সন্তান ইয়ামাল নিজের মুসলিম পরিচয় খোলাখুলিভাবে তুলে ধরেন।
সৌদি আরবের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি কাটিয়ে প্রথম পূর্ণ ৯০ মিনিট খেলতে নেমেই ১০ মিনিটের মাথায় গোল করেন ইয়ামাল, যা তাকে পেলের পাশে বসিয়ে দেয় ১৮ বা তার কম বয়সে বিশ্বকাপ ম্যাচের প্রথম গোলদাতা হিসেবে। গোল করার পর মাটিতে লুটিয়ে সিজদা দেন তিনি, যা ইসলামি রীতিতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভঙ্গি। এরপর নিজের পরিচিত ‘৩০৪’ উদযাপন করেন তিনি, যা তার শৈশবের কাতালান পাড়া মাতারোর পোস্টাল কোডের প্রতীক।
মাঠের বাইরে ইয়ামাল আলোচিত তার ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের জন্যও। বিশ্বকাপের আগে সামাজিক মাধ্যমে তার এই সরব অবস্থান নিয়ে বিতর্ক হলেও তিনি পিছু হটেননি।
ফুটবলীয় কীর্তিতেও ইয়ামাল অনন্য। ২০২৪ ইউরোতে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে টুর্নামেন্ট-সেরা গোল করে স্পেনকে জিতিয়েছিলেন, হয়েছিলেন প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা। ১৭ বছর বয়সে ইউরো জিতে হয়েছিলেন সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপাজয়ী। ২০২৫ সালের ব্যালন দ’অরে দেম্বেলের পেছনে রানার্স-আপ হয়েছিলেন তিনি। পর্তুগালের বিপক্ষে সাম্প্রতিক শেষ ষোলোর ম্যাচেও তার পারফরম্যান্সকে স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে আখ্যা দিয়েছেন তার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পারফরম্যান্স হিসেবে।
তবে ইয়ামাল একা নন। এই বিশ্বকাপে বিভিন্ন দেশের জার্সিতে ঝলক দেখিয়েছেন আরও একঝাঁক উঠতি মুসলিম তারকা।
আইয়ুব বুয়াদ্দি (মরক্কো), সম্ভবত ইয়ামালের পর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ১৮ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার ফরাসি যুব দলের অধিনায়ক ছিলেন, কিন্তু বিশ্বকাপের ঠিক আগে বেছে নেন বাবা-মায়ের দেশ মরক্কোকে। ব্রাজিলের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচেই কাসেমিরোর মতো তারকাকে ম্লান করে দিয়ে ৯১ শতাংশ পাস নিখুঁতভাবে দিয়ে নজর কাড়েন তিনি।
মজার ব্যাপার, লিল-এর হয়ে খেলা এই কিশোর একইসঙ্গে গণিতে ডিগ্রি নিচ্ছেন, ফরাসি ব্যাকালরিয়েট পরীক্ষা দিয়েছিলেন এক বছর আগেই।
বিলাল এল খান্নুস (মরক্কো), মরক্কোর আরেক তরুণ প্রতিভা, বাঁ প্রান্তে তার ড্রিবলিং প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাটল ধরায়। বুয়াদ্দির সঙ্গে মিলে তিনি মরক্কোর মাঝমাঠকে দিয়েছেন নতুন প্রজন্মের ধার।
মোহাম্মদ আমুরা (আলজেরিয়া), আফ্রিকান বাছাইপর্বে অন্যতম শীর্ষ গোলদাতা এই স্ট্রাইকার আলজেরিয়ার আক্রমণভাগের মূল ভরসা। মাহরেজ-পরবর্তী প্রজন্মে তিনিই দেশটির সবচেয়ে বড় আশা।
মুসা আল-তামারি (জর্দান), ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপে ওঠা জর্দানের সবচেয়ে বড় তারকা। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে খেলা প্রথম জর্দানিয়ান ফুটবলার হিসেবে তিনি দলের আক্রমণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জর্দানের এই অভিষেক-অভিযাত্রার নায়ক তিনিই।
উজবেকিস্তান, ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপে ওঠা এই মধ্য এশিয়ার দলের অধিনায়ক ও তারকা এলদর শোমুরোদভ, দেশটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, যিনি এখন খেলছেন তুরস্কের ইস্তানবুল বাশাকশেহিরে। কলম্বিয়ার বিপক্ষে দেশের ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি করেন তরুণ উইঙ্গার আব্বোসবেক ফায়জুল্লায়েভ, যাকে ঘিরে লিভারপুলের আগ্রহের গুঞ্জনও আছে। রক্ষণে ম্যানচেস্টার সিটির আব্দুকোদির খুসানভ দলের ভরসা।
সেনেগাল, আফ্রিকার চ্যাম্পিয়নদের আক্রমণে সাদিও মানের পাশে আছেন এভারটনের ইলিমান এনদিয়ায়ে ও তরুণ মিডফিল্ডার হাবিব দিয়ারা।
কাতার, গত আসরের স্বাগতিকরা এবার নিজেদের যোগ্যতায় এসেছে, তাদের সবচেয়ে বড় নাম দুইবারের এশিয়ান বর্ষসেরা আকরাম আফিফ। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ড্র তাদের অন্যতম সেরা ফল।
সৌদি আরব, আল-হিলালের অভিজ্ঞ উইঙ্গার সালেম আল-দাওসারি এখনো দলের প্রাণভোমরা, যিনি ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের গোলদাতা ছিলেন।
এছাড়া ঘানার দলে আছেন আথলেতিক বিলবাওয়ের ইনাকি উইলিয়ামস ও তার ভাই, আর কঙ্গো (ডিআর) প্রথমবারের মতো নক-আউট পর্বে উঠে চমক দেখিয়েছে, যাদের আক্রমণের বড় নাম নিউক্যাসলের ইয়োয়ান উইসা।
সব মিলিয়ে এই বিশ্বকাপ যেন মুসলিম ফুটবলের নতুন প্রজন্মেরই মঞ্চ, যেখানে প্রতিটি মহাদেশ থেকেই উঠে আসছে নতুন মুখ।
অতীতের মুসলিম কিংবদন্তিরা
বিশ্বকাপের ইতিহাসে মুসলিম ফুটবলারদের উপস্থিতি নতুন নয়। জিনেদিন জিদান, আলজেরীয় কাবাইল বংশোদ্ভূত ফরাসি কিংবদন্তি, ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন ফ্রান্সকে। নিজে ছিলেন তিনবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী। তার হেড থেকেই ফাইনালে প্রথম গোল এসেছিল ব্রাজিলের বিপক্ষে, এবারের বিশ্বকাপেও রয়েছে জিদান পরিবারের উপস্থিতি। জিদান পুত্র লুকা জিদান আলজেরিয়ার গোলরক্ষক হিসেবে নজর কেড়েছেন।
আরেক ফরাসি তারকা করিম বেনজেমাও বহু আসরে খেলেছেন, ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ খেললেও ফর্মে থেকেও ২০২২ বিশ্বকাপের ঠিক আগে ইনজুরিতে ছিটকে গিয়েছিলেন; ২০২২ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই স্ট্রাইকার এখন খেলছেন সৌদি প্রো লিগে।
জার্মানির হয়ে ২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত মেসুত ওজিল, যিনি ম্যাচের আগে নীরবে প্রার্থনা করার জন্য পরিচিত ছিলেন।
এই কিংবদন্তিদের হাত ধরেই তৈরি হয়েছিল সেই ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে আজ সালাহ, দেম্বেলে, হাকিমি আর ইয়ামালরা বিশ্বফুটবলের কেন্দ্রে মুসলিম পরিচয়কে নিয়ে যাচ্ছেন নতুন উচ্চতায়।
একসময় ইউরোপের বড় দলে মুসলিম ফুটবলার ছিলেন ব্যতিক্রম। আজ তারা অনেক দলের নেতৃত্বে। সালাহ হয়তো শেষ বিশ্বকাপ খেললেন, কিন্তু ইয়ামাল, হাকিমি, সাইবেরি, দেম্বেলে কিংবা আরও অনেক তরুণকে দেখে বোঝা যায়, বিশ্বফুটবলে মুসলিম তারকাদের এই অধ্যায় কেবল শুরু।
আরও পড়ুন:
পর্ব ১: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: মাঠে খেলা শুরুর আগেই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা
পর্ব ২: বিশ্বকাপের বিলিয়ন ডলারের জার্সি বাণিজ্যে কেন নেই বাংলাদেশ?
পর্ব ৩: বল থেকে রেফারি: ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিচ্ছে সবকিছু
পর্ব ৪: ফুটবলের আড়ালে ক্ষমতার লড়াইয়ে আমেরিকা-চীন ও উপসাগরীয় শক্তি
পর্ব ৫: বিশ্বকাপের ৯৬ বছরে প্রথমবার, যে কীর্তি তিন ফুটবল মহাতারকার
পর্ব ৬: বিশ্বকাপে এশিয়ার ঝড়: জর্ডান-উজবেকিস্তান পারলে, বাংলাদেশ কেন নয়?
পর্ব ৭: পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের যে গল্পগুলো অনেকেই জানেন না
পর্ব ৮: জার্মানির বিপক্ষে কেমন করবে ২৫ প্রবাসী খেলোয়াড়ে সমৃদ্ধ ‘কুরাসাও’
পর্ব ৯: ড্র-জ্বর ছড়াচ্ছে বিশ্বকাপে, রেহাই পাচ্ছে না কোনো পরাশক্তিই
পর্ব ১০: ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার যেসব ঘটনায় হাসবেন-কাঁদবেন আবার ঝগড়াও করবেন
পর্ব ১১: ২০২৬ বিশ্বকাপের ১৩ তারকা, যাদের বাবারাও খেলেছিলেন বিশ্বকাপ
পর্ব ১২: ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো: হাজার গোলের পথে, আবারও জ্বলে ওঠার অপেক্ষায়
পর্ব ১৩: একজনে নির্ভরশীল নয়, পুরো দলের চেষ্টায় এগোচ্ছে ব্রাজিল
পর্ব ১৪: মেসি শুধু একা নন, আর্জেন্টিনায় আরও যারা জ্বলে উঠতে প্রস্তুত
পর্ব ১৫: অপরাজিত থেকেও বিশ্বকাপে ইরানের বিদায় যেন ‘বিতর্কের গল্প’
পর্ব ১৬: বিশ্বকাপ কে জিতবে, ৪ বিলিয়ন ডলারের প্রেডিকশন মার্কেটে এগিয়ে ‘৭ দেশ’
পর্ব ১৭: ফুটবলের নির্মম বিচার ‘টাইব্রেকার’: সেরা তারকাদের ব্যর্থতা আর কান্নার ইতিহাস
পর্ব ১৮: হেরেও কোটি মানুষের হৃদয় জিতেছে ‘পিপলস চ্যাম্পিয়ন’ কেপ ভার্দে
পর্ব ১৯: যে মাঠে শুরু, সেই মাঠেই বিদায়
পর্ব ২০: বড় দলের পক্ষে প্রভাব বিস্তার, ফিফার বিরুদ্ধে অভিযোগের আসল রহস্য






