
কেউ আমেরিকায় এসেছিলেন উচ্চশিক্ষার টানে, কেউ জীবিকার সন্ধানে, কেউ পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার আশায়। কেউ গবেষণাগারে বসে পিএইচডির শেষ ধাপ পার করছিলেন, কেউ চিকিৎসকের পরিচয় পেছনে রেখে পরিবারের প্রয়োজনে খাবার পৌঁছে দিচ্ছিলেন মানুষের দুয়ারে। কেউ নিউইয়র্কে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, কেউ বছরের পর বছর দোকান বা রেস্তোরাঁয় কাজ করে সংসার চালাচ্ছিলেন। আবার কেউ জীবন বাজি রেখে মেক্সিকো সীমান্ত পেরিয়ে আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন, শুধু এই আশায় যে দূরে ফেলে আসা স্ত্রী-সন্তানদের জীবনটা একদিন একটু ভালো হবে।
তাঁদের আমেরিকায় আসার সময় এক ছিল না, পথও এক ছিল না। শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, পুলিশ কর্মকর্তা, দোকানকর্মী, রেস্তোরাঁকর্মী কিংবা ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মী, প্রত্যেকের জীবন ছিল আলাদা। কিন্তু ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ১৬ মাসে তাঁদের গল্প এসে মিলেছে এক নির্মম জায়গায়। উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘দেশে বিদেশে’র অনুসন্ধানে এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের চারটি অঙ্গরাজ্যে অন্তত আটজন বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারানোর তথ্য পাওয়া গেছে। সাতটি পৃথক ঘটনায় নিহত হয়েছেন তাঁরা। এর মধ্যে পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন সরাসরি কাজ করতে গিয়ে বা কর্মস্থলে।
সংখ্যাটি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মোট জনসংখ্যার তুলনায় হয়তো খুব বড় নয়। এসব হত্যার মধ্যে পরস্পরের কোনো যোগসূত্রও পাওয়া যায়নি। জাতিগত পরিচয়ের কারণে তাঁদের বেছে নেওয়া হয়েছিল, এমন প্রমাণও নেই। কিন্তু আটটি নাম পাশাপাশি রাখলে আমেরিকায় অভিবাসী জীবনের আরেকটি ছবি সামনে আসে। উচ্চশিক্ষার ক্যাম্পাস থেকে গ্যাস স্টেশন, রাতের রেস্তোরাঁ থেকে খাবার ডেলিভারির রাস্তা, নিরাপত্তার দায়িত্ব থেকে ছোট দোকানের কাউন্টার পর্যন্ত সেই ছবিতে বারবার ফিরে আসে একই প্রশ্ন, জীবনের নতুন শুরু করতে এসে কতটা অনিরাপদ পরিবেশের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে অনেক প্রবাসীকে?
এই আটজনের মধ্যে প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল ফ্লোরিডায়। ২০২৫ সালের ২ মে সকালে মাউন্ট ডোরার Scenic Hills Drive ও Wolf Branch Road এলাকার পাশে পড়ে ছিল ৪৪ বছর বয়সী মনিকা ইসলামের নিথর দেহ। কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি ছিলেন নিজের কর্মস্থলে।
বাংলাদেশ থেকে আসা মনিকা ২০২১ সালে মেয়েকে নিয়ে ফ্লোরিডার ইউস্টিস শহরে বসবাস শুরু করেছিলেন। একটি কনভিনিয়েন্স স্টোরে ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। সেদিন ভোরে মেয়ের সঙ্গে দোকানে পৌঁছেছিলেন তিনি। এর কিছুক্ষণ পরই তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে রাস্তার পাশে মরদেহ খুঁজে পান এক পথচারী। ময়নাতদন্তে জানা যায়, তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
তদন্ত ধীরে ধীরে পরিবারের ভেতরের পুরোনো বিরোধের দিকে যায়। Lake County Sheriff’s Office-এর তদন্তকারীদের ভাষ্য, বাংলাদেশে সম্পত্তি ও জমির কাগজপত্র নিয়ে বিরোধ চলছিল মনিকার স্বামী রাশেদুল ইসলাম ও তাঁর ভাই শাহিদুল ইসলামের সঙ্গে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মনিকা পুলিশের কাছে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগও করেছিলেন। তদন্তকারীরা বলেন, হত্যার সকালে শাহিদুলের সঙ্গে মনিকাকে দেখা যায় এবং তাঁর গাড়ির গতিপথ, নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ, গাড়িতে পাওয়া রক্ত ও ডিএনএসহ বিভিন্ন আলামত তাঁকে মামলার সঙ্গে যুক্ত করে।
হত্যার পর শাহিদুল নিউইয়র্কে চলে যান বলে তদন্তকারীদের অভিযোগ। পরে তাঁকে ফেডারেল অভিবাসন মামলায় আটক করা হয় এবং ফ্লোরিডায় ফিরিয়ে আনা হয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে একটি গ্র্যান্ড জুরি (grand jury) তাঁর বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে পূর্বপরিকল্পিত প্রথম ডিগ্রির হত্যা (premeditated first-degree murder with a firearm)-এর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনে। তিনি বর্তমানে জামিনের সুযোগ ছাড়াই আটক রয়েছেন। প্রসিকিউটররা তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড চাইছেন। বিচার কার্য এখনো শেষ হয়নি।
মনিকা ইসলামের মৃত্যুর প্রায় তিন মাস পর আমেরিকার সবচেয়ে ব্যস্ত শহরের প্রাণকেন্দ্রে এমন এক ঘটনা ঘটে, যা শুধু বাংলাদেশি কমিউনিটি নয়, গোটা নিউইয়র্ককে নাড়িয়ে দেয়।
২০২৫ সালের ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় ম্যানহাটনের ৩৪৫ পার্ক অ্যাভিনিউয়ের আকাশচুম্বী অফিস ভবনে অস্ত্র হাতে ঢুকে পড়ে শেন তামুরা নামের এক বন্দুকধারী। ভবনটিতে NFL, Blackstone, KPMG-সহ বড় প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ছিল। লবিতে ঢুকেই সে গুলি শুরু করে। প্রথম দিকেই তার গুলির সামনে পড়েন নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের ৩৬ বছর বয়সী কর্মকর্তা দিদারুল ইসলাম।
দিদারুল সেদিন তাঁর নিয়মিত পুলিশ ডিউটিতে ছিলেন না। NYPD-এর অনুমোদিত একটি ব্যবস্থার অধীনে ইউনিফর্ম পরেই ভবনটির অতিরিক্ত নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। বন্দুকধারীর হামলায় দিদারুলসহ চারজন নিহত হন। পরে হামলাকারীও আত্মহত্যা করে।
বাংলাদেশ থেকে অভিবাসী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসা দিদারুল নিউইয়র্ক পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে। ব্রঙ্কসে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। মৃত্যুর সময় তাঁর স্ত্রী আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পৃথিবীতে আসার কথা ছিল তাঁদের তৃতীয় সন্তানের। যে বাবা সন্তানের জন্মের অপেক্ষায় ছিলেন, সেই সন্তানের মুখ আর দেখা হয়নি তাঁর।
NYPD পরে দিদারুল ইসলামকে Detective First Grade পদে মরণোত্তর পদোন্নতি দেয়। ২০২৬ সালের জুনে তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের সর্বোচ্চ সম্মান মেডেল অব অনার (Medal of Honor)। এক বছর পর তাঁর মৃত্যুদিনে নিউইয়র্ক সিটি আবার তাঁকে স্মরণ করেছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল আসতে না আসতেই ফ্লোরিডায় আবার বাংলাদেশি কমিউনিটিকে স্তব্ধ করে দেয় দুটি ঘটনা। একটি ফোর্ট মায়ার্সে, আরেকটি টাম্পায় University of South Florida ঘিরে।
ফোর্ট মায়ার্সের একটি Chevron গ্যাস স্টেশনের কনভিনিয়েন্স স্টোরে কাজ করতেন ৫১ বছর বয়সী নিলুফা ইসমিন, যিনি পরিচিত ছিলেন ইয়াসমিন নামেও। প্রায় তিন দশক আগে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন তিনি। দুই মেয়ের মা নিলুফা দক্ষিণ ফ্লোরিডার বিভিন্ন এলাকায় থাকার পর পশ্চিম উপকূলে এসে বসবাস শুরু করেন। কনভিনিয়েন্স স্টোরের কাজের পাশাপাশি আরও একটি কাজও করতেন বলে তাঁর পরিচিতরা জানিয়েছেন।
এপ্রিলের এক সকালে তিনি যখন কর্মস্থলে ছিলেন, তখন Rolbert Joachin নামে এক ব্যক্তি তাঁর গাড়ির কাচ হাতুড়ি দিয়ে ভাঙতে শুরু করে বলে সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ও তদন্তকারীদের অভিযোগ। শব্দ শুনে বাইরে বেরিয়ে আসেন নিলুফা। এরপর সেই হাতুড়িই তাঁর মাথায় একের পর এক আঘাত করে হামলাকারী। ঘটনাস্থলেই শেষ হয়ে যায় প্রায় তিন দশক ধরে আমেরিকায় গড়ে তোলা একটি জীবন।
প্রথমে দ্বিতীয় ডিগ্রির হত্যার অভিযোগ আনা হলেও পরে Lee County-এর গ্র্যান্ড জুরি (grand jury) Joachin-এর বিরুদ্ধে প্রথম ডিগ্রির হত্যা (first-degree murder)-এর অভিযোগ আনে। প্রসিকিউটররা এ মামলাতেও মৃত্যুদণ্ড চাইছেন। তিনি জামিন ছাড়াই আটক রয়েছেন।
ফোর্ট মায়ার্সের সেই হত্যাকাণ্ডের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই টাম্পায় শুরু হয় দুই বাংলাদেশি তরুণ গবেষককে ঘিরে রহস্য।
২৭ বছর বয়সী জামিল আহমেদ লিমন এবং একই বয়সী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি দুজনই University of South Florida-তে পিএইচডি করছিলেন। লিমনের গবেষণার বিষয় ছিল ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি। দক্ষিণ ফ্লোরিডার জলাভূমির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কাজ করছিলেন তিনি। পিএইচডি শেষ করে বাংলাদেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার ইচ্ছার কথা পরিবারকে জানিয়েছিলেন। বৃষ্টি পড়ছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। বাংলাদেশে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন তিনি।
১৬ এপ্রিল তাঁদের শেষবার দেখা যায়। পরদিন নিখোঁজের খবর দেওয়া হয়। কয়েক দিন ধরে পরিচিতজন ও পরিবারের উৎকণ্ঠার পর ২৪ এপ্রিল Howard Frankland Bridge-এর কাছে কালো আবর্জনার ব্যাগের মধ্যে পাওয়া যায় লিমনের মরদেহ। দুই দিন পর Tampa Bay এলাকায় আরেকটি ব্যাগে পাওয়া মরদেহ ডিএনএ ও দাঁতের রেকর্ডের মাধ্যমে বৃষ্টির বলে নিশ্চিত করা হয়।
লিমনের সাবেক রুমমেট ২৬ বছর বয়সী Hisham Abugharbieh-এর বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত প্রথম ডিগ্রির হত্যার দুটি অভিযোগ (two counts of first-degree premeditated murder) আনা হয়েছে। তিনি দোষ স্বীকার করেননি এবং জামিন ছাড়াই আটক রয়েছেন। মামলায় প্রসিকিউশন মৃত্যুদণ্ড চাইছে। আদালতের সর্বশেষ নথি অনুযায়ী, জুরি বিচার (jury trial) শুরু হওয়ার তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ৩ নভেম্বর ২০২৭।
তাঁদের যে ডক্টরেট ডিগ্রি হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, শেষ পর্যন্ত সেই ডিগ্রি গ্রহণ করেছেন অন্যরা। ২০২৬ সালের ৮ মে USF-এর সমাবর্তনে দুটি চেয়ার খালি রাখা হয়েছিল। চেয়ারে ছিল ডক্টরাল গাউন, ক্যাপ ও হুড। জামিল ও বৃষ্টিকে মরণোত্তর ডক্টরেট দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশ কনস্যুলেটের প্রতিনিধি পরিবারের পক্ষে সেগুলো গ্রহণ করেন।
এই দুই তরুণ গবেষকের মৃত্যু এমন সময়ে ঘটেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। Institute of International Education-এর Open Doors 2025 অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ছিলেন ২০ হাজার ১৫৬ জন। আগের বছরের তুলনায় সংখ্যাটি ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পাঠানোর হিসাবে বাংলাদেশ তখন বিশ্বে নবম স্থানে।
এপ্রিলের সেই শোক কাটতে না কাটতেই জুলাইয়ে পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়া থেকে আসে আরেকটি খবর। এবার নিহত ব্যক্তি শুধু একজন খাবার ডেলিভারি কর্মী ছিলেন না। তাঁর জীবনের পেছনে ছিল আরেক গল্প।
মোহাম্মদ মাহফুজুল হক বাংলাদেশে একজন চিকিৎসক ছিলেন। স্ত্রী মিনারা রহমানও চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁদের পরিচয় মেডিকেল কলেজে, তারপর বিয়ে। পরে পরিবারটি কানাডায় চলে আসে এবং কয়েক বছর ভ্যাঙ্কুভারে বসবাস করে। ২০২৩ সালে স্ত্রীর অপটোমেট্রি পড়ার সুযোগ হলে তাঁরা ১৪ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে ফিলাডেলফিয়ায় যান। স্ত্রীর পড়াশোনার সময় সংসারের খরচ সামলাতে ৪৩ বছর বয়সী মাহফুজ DoorDash-এর মাধ্যমে খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন।
৭ জুলাই রাত প্রায় সাড়ে ৯টায় Kingsessing এলাকার South Ithan Street-এ খাবার পৌঁছে দিতে গিয়ে মাথার পেছনে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে তাঁর গাড়ির ইঞ্জিন তখনো চলছে, পাশে পড়ে আছে খাবারের ব্যাগ। যে ঠিকানায় খাবার পৌঁছানোর কথা ছিল, সেখানকার বাসিন্দারা পুলিশকে জানান, তাঁরা কোনো DoorDash অর্ডারই করেননি।
যুক্তরাষ্ট্রে খাবার সরবরাহ করতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত
তদন্তের পর ১৫ বছর বয়সী Zakah Johnson নামে এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বয়স ১৫ হলেও তার বিরুদ্ধে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে মামলা চালানো হচ্ছে (charged as an adult)। হত্যা (murder), ডাকাতি (robbery), ষড়যন্ত্র (conspiracy) ও আগ্নেয়াস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পুলিশ আরও দুজনকে খুঁজছে বলে জানিয়েছে।
মাহফুজের স্ত্রী পরে Philadelphia Inquirer-কে বলেছিলেন, অভিযুক্ত কিশোরটির বয়স তাঁর নিজের ছেলের চেয়ে মাত্র এক বছর বেশি, এই বিষয়টিই তাঁকে আরও স্তব্ধ করেছে। একটি পরিবার আমেরিকায় এসেছিল স্ত্রীর নতুন পেশাজীবন শুরু করতে। সেই পড়াশোনার খরচ চালাতে যিনি রাতে খাবার পৌঁছে দিতেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই আর ঘরে ফিরলেন না।
জুলাই মাসেই নিউইয়র্কে আরেক বাংলাদেশি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। ৫৩ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক রুহুল আমিন নাসির ব্রুকলিনে যাত্রী নামানোর সময় তাঁর গাড়িতে আরেকটি গাড়ি ধাক্কা দেয়। যাত্রী ও অপর পক্ষের মধ্যে বিরোধ থামাতে গাড়ি থেকে নামলে গুলি এসে লাগে তাঁর মুখে। একাধিক অস্ত্রোপচারের পর তিনি বেঁচে যান। এই প্রতিবেদনের আট মৃত্যুর হিসাবে তাঁর নাম নেই, কিন্তু রাস্তায় কাজ করা অভিবাসীদের ঝুঁকির আরেকটি উদাহরণ হয়ে আছে ঘটনাটি।
তারপর আসে ২৩ আগস্ট। একই দিনে দুই অঙ্গরাজ্যে দুই বাংলাদেশির জীবন থেমে যায়। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে Brownsville এলাকার 842 Rockaway Avenue-র American Best Wings & Pizza রেস্তোরাঁয় রাত পেরিয়ে তখন নতুন দিন শুরু হয়েছে। ভেতরে কাজ করছিলেন ৪৪ বছর বয়সী ইউসুফ রাজু ও তাঁর বাংলাদেশি সহকর্মী রাসেল। হঠাৎ গুলি। রাজুর মাথায়, রাসেলের পায়ে। দুজনকেই Brookdale University Hospital Medical Center-এ নেওয়া হয়। রাজুকে আর বাঁচানো যায়নি।
রাজুর আমেরিকা-যাত্রা ছিল দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। প্রায় তিন বছর আগে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকেছিলেন তিনি। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেই যাত্রায় দালালকে দিতে হয়েছিল প্রায় ৩০ লাখ টাকা। পরে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর কংশনগরে তাঁর স্ত্রী, তিন সন্তান, মা-বাবা ও ভাই-বোন রয়েছেন।
হত্যার পর প্রথম দিকে স্থানীয়ভাবে একটি খাবারের বিল নিয়ে বিরোধের কথা শোনা গেলেও নিউইয়র্ক পুলিশের পরবর্তী তদন্ত ঘটনাটিকে আরও বড় একটি ধারাবাহিক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করেছে। NYPD এখন ৩১ বছর বয়সী Jesus Acosta-কে রাজু হত্যার সন্দেহভাজন হিসেবে খুঁজছে। পুলিশের অভিযোগ, ব্রুকলিনের ঘটনার দুই দিন পর একই ব্যক্তি ব্রঙ্কসের একটি deli-তে ঢুকে ডাকাতির সময় আরেক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে। ২৬ আগস্ট সন্ধ্যা পর্যন্ত Acosta পলাতক ছিল। তার গ্রেপ্তার ও দণ্ড নিশ্চিত করতে সহায়ক তথ্যের জন্য FBI ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে।
একই তারিখে, অর্থাৎ ২৩ আগস্ট, টেনেসির ছোট শহর Bells-এ আরেক বাংলাদেশির জীবনও শেষ হয়ে গেছে কর্মস্থলে। ৩৬ বছর বয়সী শাহেদ রানা মোহসিন কয়েক বছর ধরে Tennessee-র Safari Corner Market-এ কাজ করতেন। পরিবার বাংলাদেশে। পরিচিতদের বক্তব্য অনুযায়ী, উপার্জনের বড় অংশই পাঠাতেন দেশে। Highway 412-এর পাশে ওই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেই তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। তদন্তকারীরা বলেছেন, তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ঘটনার পর খুব দ্রুত Corey William Douglas Houge নামে এক ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাঁর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিকল্পিত প্রথম-ডিগ্রি হত্যা এবং বিশেষভাবে গুরুতর ডাকাতির অভিযোগ। তাঁকে জামিন ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ ইতোমধ্যে জানিয়েছে, রানা হত্যা মামলায় হাউজের মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হবে। ২৬ আগস্ট ক্রকেট কাউন্টি সার্কিট কোর্টে হাউজকে হাজির করা হলে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি জেনারেল ফ্রেডেরিক এজি আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্ত জানান।
Bureau of Labor Statistics-এর সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও সহিংসতায় ৫ হাজার ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭০টি ছিল হত্যাকাণ্ড। কর্মস্থলে অন্য ব্যক্তির গুলিতে নিহত হয়েছেন ৩৭৯ জন। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা কোনো একটি অভিবাসী গোষ্ঠীর সমস্যা নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের বাস্তব একটি নিরাপত্তা সমস্যা।
এই বাস্তবতার মধ্যেও আমেরিকাকে ঘিরে বাংলাদেশিদের স্বপ্ন থেমে নেই। প্রতি বছর নতুন শিক্ষার্থী আসছেন, নতুন অভিবাসী কাজে যোগ দিচ্ছেন, কেউ ব্যবসা গড়ছেন, কেউ গবেষণায় এগিয়ে যাচ্ছেন, কেউ জননিরাপত্তার দায়িত্ব নিচ্ছেন। আমেরিকার মাটিতে বাংলাদেশিদের সাফল্যের গল্পও তাই কম নয়।
মনিকা ইসলাম, দিদারুল ইসলাম, নিলুফা ইসমিন, জামিল আহমেদ লিমন, নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি, মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, ইউসুফ রাজু এবং শাহেদ রানা মোহসিন। আটটি নাম। তাঁদের স্বপ্নের ধরন আলাদা ছিল। শুধু একটি জায়গায় এসে সেই স্বপ্নগুলো একই হয়ে গেছে, কোনোটিই আর তাঁদের নিজেদের হাতে পূর্ণ হলো না।
তথ্যসূত্র:
দেশে বিদেশে অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট মার্কিন সংবাদমাধ্যম
যুক্তরাষ্ট্রে গত ১৬ মাসে কতজন বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছেন?
২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য ও সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো মিলিয়ে অন্তত ৮ বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছেন বলে এই প্রতিবেদনে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নিহতদের সবাই কি কর্মস্থলে আক্রান্ত হয়েছিলেন?
না। তবে অন্তত পাঁচজন কাজের সময় বা কর্মস্থলে আক্রান্ত হন—যার মধ্যে দোকানকর্মী, পুলিশ কর্মকর্তা, ডেলিভারি কর্মী ও রেস্তোরাঁকর্মী রয়েছেন।
বাংলাদেশি পরিচয়ের কারণে তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল কি?
এমন দাবির পক্ষে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঘটনাগুলোর তদন্তে পারিবারিক বিরোধ, ডাকাতি, ব্যক্তিগত অপরাধ এবং অন্যান্য আলাদা কারণ সামনে এসেছে।
ইউসুফ রাজু হত্যার সন্দেহভাজন কি গ্রেপ্তার হয়েছেন?
হ্যাঁ। NYPD-এর তথ্য অনুযায়ী, জেসাস আকোস্তাকে ২৯ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয়। ৩ সেপ্টেম্বর গ্র্যান্ড জুরি তাঁকে অভিযুক্ত করে।
মাহফুজুল হক হত্যায় কি কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে?
হ্যাঁ। ১৫ বছর বয়সী Zakah Johnson-এর বিরুদ্ধে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে হত্যা, ডাকাতি, ষড়যন্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র-সংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কত?
Open Doors 2025 অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২০,১৫৬।

