বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবায় আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ (ধাত্রী) প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ। এর ফলে পর্তুগালের লিসবনে চলমান বিশ্ব স্বাস্থ্য অঙ্গনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)।
রোববার (১৪ জুন) লিসবনে আয়োজিত আন্তর্জাতিক মিডওয়াইফ সংঘের (আইসিএম) ৩৪তম ত্রিবার্ষিক কংগ্রেস’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস.এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং ইউএনএফপিএ-এর বৈশ্বিক নির্বাহী পরিচালক ডিয়েন কেইটা যৌথভাবে বাংলাদেশের মিডওয়াইফ কর্মশক্তিতে এই বিশাল বিনিয়োগের অঙ্গীকারটি ব্যক্ত করেন।
ইউএনএফপিএ জানিয়েছে, ঘোষিত এই কর্মসূচির ফলে দেশে ২৫,০০০-এরও বেশি নতুন মিডওয়াইফ পদ তৈরি হবে, যা বাংলাদেশের মাতৃমৃত্যু হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রাকে সম্পূর্ণ নাগালের মধ্যে নিয়ে আসবে।
অনুষ্ঠানে ইইউ ও বিশ্ব প্রতিনিধিদের সামনে বাংলাদেশের প্রশংসা করে ইউএনএফপিএ-এর নির্বাহী পরিচালক ডিয়েন কেইটা পেশাদার মিডওয়াইফ বাহিনী গঠনে বাংলাদেশকে একটি ‘পথপ্রদর্শক’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক মিডওয়াইফারি অ্যাক্সিলারেটরে নেতৃত্বদানকারী হাতেগোনা কয়েকটি সেরা দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। লিসবনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মিস কেইটা আরও বলেন, “বাংলাদেশ আজ পুরো বিশ্বকে দেখাচ্ছে যে মিডওয়াইফদের পেছনে বিনিয়োগ করা মানেই মূলত মানুষের জীবন রক্ষায় বিনিয়োগ করা। এই যুগান্তকারী অঙ্গীকার একইসাথে বিশ্বের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা যে, মাতৃমৃত্যু কোনো অনিবার্য বিষয় নয়।”
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই একটি মাত্র প্রতিশ্রুতির সফল বাস্তবায়নে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার নারীর জীবন বাঁচানো সম্ভব, যারা বর্তমানে সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য কারণে সন্তান জন্মদানকালে মারা যান। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশে প্রতি ১ লাখ জীবিত শিশু জন্মদানকালে ৫৭৪ জন মা মারা যেতেন, তা বর্তমানে সফলভাবে কমিয়ে ১৩৬ জনে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে উন্নত স্বাস্থ্যসেবার চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান; কারণ দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ প্রসব এখনও বাড়িতেই হয়ে থাকে। এছাড়া দেশের ৬ হাজার ২১৫টি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বর্তমানে মাত্র ২ হাজার ৫৫৭ জন মিডওয়াইফ কর্মরত আছেন, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, অপরিহার্য যৌন, প্রজনন, মাতৃ, নবজাতক ও কিশোর-কিশোরী স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সেবা একা মিডওয়াইফরাই প্রদান করতে পারেন এবং দুই-তৃতীয়াংশ মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু প্রতিরোধ করতে সক্ষম। এর ফলে মিডওয়াইফ খাতে প্রতি ১ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় ১৬ মার্কিন ডলার পর্যন্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আসে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রতিনিধিদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. এস.এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার এই অঙ্গীকারকে বাংলাদেশের ‘প্রতিরোধ-কেন্দ্রিক’ আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি অংশ হিসেবে তুলে ধরেন, যা কোনো জটিলতা দেখা দেওয়ার আগেই মায়েদের চিকিৎসা সহায়তা দেবে এবং প্রতিটি শিশুর সুস্থ জীবন নিশ্চিত করবে।
এই স্বাস্থ্য রূপান্তরের মূল কেন্দ্রে মিডওয়াইফদের স্থান দিয়ে তিনি বলেন, “যখন আমরা মিডওয়াইফদের ক্ষমতায়ন করি, তখন আমরা নারীদের ক্ষমতায়ন করি। যখন আমরা নারীদের ক্ষমতায়ন করি, তখন আমরা পরিবারকে শক্তিশালী করি। আর যখন আমরা পরিবারকে শক্তিশালী করি, তখন আমরা সমগ্র জাতিকেও আরও শক্তিশালী করে তুলি।”
গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন এবং পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন পর্তুগালে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স লায়লা মুনতাজেরী দীনা এবং দূতালয় প্রধান এস এম গোলাম সরোয়ার।





