বাংলাদেশের ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও এর সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটকে ‘গণতান্ত্রিক মাইলফলক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপ (সিওজি)। তবে গণতান্ত্রিক অগ্রগতি আরও সুসংহত করতে বেশ কিছু সংস্কারেরও সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে সিওজি উল্লেখ করেছে, প্রবাসী ভোটার এবং আইনগত হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য বৃহৎ পরিসরে ডাকযোগে ভোটদান (পোস্টাল ভোটিং) চালু করা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ঘানার সাবেক রাষ্ট্রপতি নানা আকুফো-আদ্দোর নেতৃত্বে গঠিত পর্যবেক্ষক দলে এশিয়া, আফ্রিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, ইউরোপ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আরও ১২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
নির্বাচনের আগে, ভোটগ্রহণের দিন এবং নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য পর্যবেক্ষকরা ৪ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করেন। এ সময় তারা বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় করে ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তৃত ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্ক এবং কিছু রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (বিইসি) স্বাধীনতা ও সক্ষমতা নিয়ে আগে উদ্বেগ থাকলেও, ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা এবং ফলাফল ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া পেশাদারিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেছেন।
চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জুলাই সনদ (জুলাই চার্টার) নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬১ দশমিক ৬৪ শতাংশ ভোটারের সমর্থনে প্রস্তাবটি পাস হয়। গণভোটটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা সীমিত ছিল বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে নির্বাচনী অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হওয়া এবং সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রার্থীদের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ ছিল মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ। সরাসরি নির্বাচিত নারী সদস্যের সংখ্যা ছিল মাত্র সাতজন।
অন্যদিকে, ৩৫ বছরের নিচের ভোটাররা মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশ হলেও তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিওজি আরও জানায়, নির্বাচনী প্রচারণাকালে গণমাধ্যমের পরিবেশ আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় বেশি উন্মুক্ত ছিল। তবে আইনি বিধিনিষেধ এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এখনো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াতে বিইসির প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও কার্যকর সক্ষমতা জোরদার করার সুপারিশ করেছে পর্যবেক্ষক দল। পাশাপাশি আইনের শাসন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় কমনওয়েলথের মহাসচিব শার্লি বচওয়ে বলেন, “বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নির্বাচন ও গণভোট নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের প্রমাণ। শান্তিপূর্ণভাবে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়াকে আমরা স্বাগত জানাই।”
তিনি আরও বলেন, এই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশটি সব নাগরিকের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে পারে। এ লক্ষ্যে চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধানে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সঙ্গত ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করার জন্য আমরা কর্তৃপক্ষকে উৎসাহিত করছি। কমনওয়েলথ সবসময় এ প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপের এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশ সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছে পাঠানো হয়েছে।





