
সানা, ০৬ নভেম্বর – দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটাতে সৌদি আরবের সামনে নজিরবিহীন ও কঠিন শর্ত তুলে ধরেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। বছরের পর বছর চলা সামরিক অভিযানের ক্ষতিপূরণ হিসেবে সৌদি আরবের কাছে ৫১ বিলিয়ন (৫ হাজার ১০০ কোটি) ডলার দাবি করেছে তারা। একই সঙ্গে ইয়েমেনের ‘বৈধ শাসক’ হিসেবে নিজেদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির দাবিও জানিয়েছে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (WSJ)-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
বিলিয়ন ডলারের দরকষাকষি ও রাজনৈতিক সমীকরণ
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সৌদি জোটের বিমান হামলা ও দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরোধে ইয়েমেনে যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ দিতেই এই বিশাল অঙ্কের দাবি জানানো হয়েছে।
অর্থনৈতিক সমঝোতা: যদিও হুথিরা ৫১ বিলিয়ন ডলার চাইছে, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, আলোচনার টেবিলে সমঝোতা হলে চূড়ান্ত অংকটি কয়েক হাজার কোটি ডলারে নেমে আসতে পারে।
ক্ষমতার ভারসাম্যে ধাক্কা: টাকার পাশাপাশি হুথিদের অন্যতম মূল শর্ত হলো রিয়াদকে তাদের ইয়েমেনের একমাত্র বৈধ শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এটি ঘটলে সৌদি সমর্থিত বর্তমান ইয়েমেন সরকার পুরোপুরি ক্ষমতা হারাতে পারে এবং সৌদি সীমানার ঠিক দক্ষিণেই ইরানঘনিষ্ঠ শক্তির একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাবে।
সংঘাতের নতুন কেন্দ্র: মদিনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও লোহিত সাগরে আতঙ্ক
কূটনৈতিক আলোচনার টানাপোড়েনের মধ্যেই সামরিক মাঠে চাপ বাড়াচ্ছে হুথিরা।
ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয়: সম্প্রতি হুথিদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র মদিনা অঞ্চলের দিকে ধেয়ে গেলে তা আকাশে প্রতিহত ও ধ্বংস করার দাবি করেছে সৌদি জোট।
তেল কেন্দ্রে উচ্চ সতর্কতা: হামলার ঝুঁকিতে পড়ে সৌদি আরব তাদের প্রধান লোহিত সাগরীয় তেল রপ্তানি কেন্দ্র ‘ইয়ানবু’তে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। রাইস ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিয়ান কোয়েটস উলরিখসেন মনে করেন, তেল স্থাপনায় আঘাত এলে সৌদি অর্থনীতি ও বিদেশি বিনিয়োগ মারাত্মক ধাক্কা খাবে।
অ্যাডেনের কাছে হুথি বাহিনী ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ঝুঁকি
২০১৫ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ২০২২ সালে কিছুটা বিরতি এলেও সম্প্রতি পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাজেদ আল মাধাজি জানান, হুথিরা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের কেন্দ্রবিন্দু বন্দরনগরী এডেনের মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে চলে এসেছে। পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত রুট ‘বাব আল মান্দাব’ প্রণালির কৌশলগত অবস্থানও তাদের দখলে। এই সামরিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়েই তারা সৌদির ওপর সর্বাধিক চাপ সৃষ্টি করছে।
]চরম চাপের মুখে সৌদি আরব
পরিস্থিতি সামাল দিতে মিশরের সামরিক সহায়তা নিশ্চিতের পাশাপাশি তুরস্কের উদ্যোগে পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্ক ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে। তবে বাস্তবে রিয়াদের সমীকরণ খুব একটা সহজ নয়:
১. পাকিস্তানের অনীহা: সামরিক চুক্তিতে রাজি থাকলেও ইয়েমেনের ভূমিতে সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নিতে রাজি নয় ইসলামাবাদ।
২. যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব: ওয়াশিংটনও এই মুহূর্তে ইয়েমেনে নতুন কোনো সরাসরি সামরিক অভিযানে জড়াতে চাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে সামরিক ময়দানে ব্যাকফুটে থাকা এবং কূটনৈতিক টেবিলে মোটা অঙ্কের ক্ষতির দাবির মুখে সৌদি আরব এখন এক বড় ভূরাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি।
এনএন/ ০৬ নভেম্বর ২০২৬




