“আয়হায়! ক্যান্সার হলে পরীক্ষা কিভাবে দেব?”— যখন ২৩ বছর বয়সী একজন তরুণের কানে তার মৃত্যুপরোয়ানা এসে পৌঁছায়, তখন তার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল এটি। যে বয়সে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা, জীবনকে ‘টেক-ওভার’ করার কথা, সেই বয়সে তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়— ‘কর্কট-উপাখ্যান’। আজ সেই উপাখ্যানের যবনিকাপাত ঘটল। বুয়েটের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (IPE) বিভাগের ২১ ব্যাচের মেধাবী ছাত্র আসিফ আসমত নিবিড় আর নেই। মেটাস্ট্যাটিক অ্যাডিনোকার্সিনোমা (Metastatic Adenocarcinoma) নামক মরণব্যাধির সাথে অসম লড়াই শেষে আজ তিনি পাড়ি জমিয়েছেন এক অনন্ত লোকে।
নিজের অসুস্থতা ও ক্যানসার ধরা পড়ার মুহূর্তটিকে নিবিড়ভাবে তুলনা করেছিলেন ফ্রাঞ্জ কাফকার বিখ্যাত গল্প ‘মেটামরফোসিস’-এর সাথে। গল্পের চরিত্র গ্রেগর সামসা সকালে উঠে নিজেকে একটি বিশালাকার পোকায় রূপান্তরিত হতে দেখে আঁতকে ওঠার বদলে দুশ্চিন্তা করছিল তার অফিসের ট্রেইন মিস করা নিয়ে। নিবিড়ের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। বুয়েটের ৩-১ সেমিস্টারের টার্ম ফাইনালের চাপে তিনি নিজের শরীরের মরণব্যাধিকেও দেখেছিলেন স্রেফ একটি ‘উটকো সমস্যা’ হিসেবে। তিনি লিখেছিলেন:
”পড়াশুনা ও চাকরির দুশ্চিন্তা আমাদেরকে মাঝে মাঝে এমনভাবে ডিহিউম্যানাইজ করে ফেলে যে পোকায় পরিণত হওয়া বা ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া যেন ছোট এক উটকো সমস্যা মনে হয়।”
এটি কেবল নিবিড়ের কথা নয়, এটি আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার এক করুণ চিত্র, যেখানে জীবনের চেয়ে জিপিএ আর ক্যারিয়ার বড় হয়ে দাঁড়ায়।
জীবনের ‘টেমপ্লেট’ এবং এক নিঃসঙ্গ লড়াই
আমাদের সমাজ জীবনের জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘টেমপ্লেট’ ঠিক করে রেখেছে—পড়াশোনা শেষ করা, ভালো চাকরি নিয়ে পরিবারের হাল ধরা, বিয়ে করা, সন্তান লালন-পালন এবং বার্ধক্যে গিয়ে মৃত্যু। নিবিড়ের মনে এই গণ্ডিবদ্ধ জীবন নিয়ে ছিল প্রবল অনিহা। তিনি একে পশুর জীবনের সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই, আছে শুধু টিকে থাকার লড়াই।
তার ভাষায়:
”অধিকাংশ মানুষ জন্মায়, পড়াশোনা করে, জীবিকা নির্বাহ করে, বিয়ে শাদি করে, বাচ্চা পয়দা করে, এক সময় বুড়ো হয়ে রিটায়ার করে। এরপর বিভিন্ন রোগ শোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। লাইফের এই টেমপ্লেটটা আমার বেশ অপছন্দ। স্রেফ নিজে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকা—পশুর জীবনের সাথে তেমন কোনো তফাত নেই।”
তিনি চেয়েছিলেন এক ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশ হতে, পৃথিবীর বুকে নিজের অস্তিত্বের কোনো অর্থপূর্ণ ছাপ রেখে যেতে। কিন্তু ক্যারিয়ারের এই ইঁদুর দৌড়ে নিজেকে এক ‘ক্লান্ত ইঁদুর’ হিসেবে আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। এই নিঃসঙ্গতা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেত, কিন্তু ক্যানসার যেন তাকে সেই ইঁদুর দৌড় থেকে এক অদ্ভুত মুক্তি দিয়েছিল।
নিবিড়ের জীবনদর্শনে একটি অদ্ভুত দিক ছিল তার বার্ধক্যভীতি। অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে, অশীতিপর বৃদ্ধ হয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকার চেয়ে যৌবনেই প্রস্থান করাকে তিনি কিছুটা ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, “যৌবনে কোনো মারণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া হয়ত তেমন খারাপ কিছু না।” তবে এই চিন্তার মাঝে তিনি নিজের প্রিয়জনদের কষ্টের কথাও ভুলে যাননি।
মায়ের ভালোবাসা ও শেষ বার্তা
মৃত্যুর আগে নিবিড়ের শেষ ফেসবুক স্ট্যাটাসটি ছিল পাঠকদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করার মতো। সেখানে তিনি তিনজন নারীর দোয়া ও আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করেছেন। তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তার মা। নিবিড়ের শেষ শব্দগুলো ছিল:
”৩য় এক নারী তার সব আয়ু আর নেকির বিনিময়ে আমার সুস্থতার দোয়া করেছেন; ৩য় জন আমার মা! রাব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি সাগীরা!”
এছাড়া তার চার বছর বয়সী ভাগ্নের কথা বলতে গিয়ে নিবিড়ের মতো কঠোর হৃদয়ের মানুষের চোখও ভিজে উঠত। ছোট্ট সেই শিশুটি তার মামার সুস্থতার জন্য প্রতিদিন দোয়া করত, যা নিবিড়কে অশ্রুসিক্ত করে তুলত বারবার।
মৃত্যু যখন সবার জন্যই অবধারিত
চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতাল থেকে ঢাকার কেমোথেরাপি বেড—এক দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক পথ পাড়ি দিয়ে নিবিড় আজ ক্লান্ত ইঁদুরের দৌড় থেকে মুক্তি পেয়েছেন। নিজের জীবনের শেষ সময়টুকুতে তিনি হুমায়ূন আহমেদের অনকোলজিস্ট ডাক্তার ভেচ-এর সেই কালজয়ী উক্তিকে আঁকড়ে ধরেছিলেন:
”তুমি একা তো মারা যাচ্ছ না। আমরা সবাই মারা যাচ্ছি। দ্য কাউন্টডাউন ইজ অন।”
৩১ ডিসেম্বর যখন তিনি তার এই উপাখ্যানটি লিখেছিলেন, তখন শেষ করেছিলেন এই বলে— “শেষ পর্যন্ত কি হবে? উই ইউল ফাইন্ড আউট টুগেদার।” আজ সেই উত্তর পাওয়া গেল। নিবিড় হয়তো তার জীবনের ‘গোল’গুলো প্রচলিত অর্থে পূরণ করতে পারেননি, কিন্তু তার এই সাহসী লেখনী আর জীবনদর্শন কোটি মানুষের হৃদয়ে এক গভীর ছাপ রেখে গেল।
নিবিড়ের এই প্রস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন আসলে কতটা ছোট, আর আমাদের ইঁদুর দৌড়গুলো কতটা অর্থহীন। ভালো থেকো নিবিড়, ওপারের শান্তিময় ভুবনে।






