ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরও রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জনমনে এখনো রয়ে গেছে উদ্বেগ।
তবে তিন মাস শেষে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে এখনো রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি— পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক অভিযান চলছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন ও বিশ্লেষকরা বলছেন, কোথাও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিললেও, রাজনৈতিক প্রভাব, চাঁদাবাজি, থানাভিত্তিক দুর্নীতি এবং দলীয়করণের অভিযোগ এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
ফলে প্রশ্ন উঠছে— নির্বাচিত সরকারের ৯০ দিনে আইন-শৃঙ্খলা কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, আর সাধারণ মানুষ নিরাপত্তায় কতটা স্বস্তিতে আছে?
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিলে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং মব সন্ত্রাসের ঘটনায় উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে।
ফেব্রুয়ারিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ২টি। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হন ১৩ জন এবং মব সন্ত্রাসে প্রাণ হারান আরও ৯ জন।
মার্চ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা কমে ১টিতে নেমে এলেও রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ জনে। এ মাসে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় নিহত হন ২ জন। পাশাপাশি মব সন্ত্রাস ভয়াবহ আকার ধারণ করে; এ ধরনের ঘটনায় প্রাণ হারান ২০ জন।
এপ্রিলেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে। এ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ১টি। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হন ৭ জন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় প্রাণ হারান ১ জন এবং মব সন্ত্রাসে নিহত হন আরও ১৮ জন।
নবগঠিত সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে অধিকতর গুরুত্ব পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। সরকারের ৯০ দিন শেষে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন?
সম্প্রতি পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন আওয়ামী লীগের শাসনামলে ‘পেটোয়া বাহিনী’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া পুলিশ নিজস্ব ‘ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার’ করতে পেরেছে।
পাশাপাশি পুলিশে এখন শৃঙ্খলা ‘ফিরে এসেছে’ বলেও বিশ্বাস তার।
পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশ-এর একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কথিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পুনরায় সক্রিয়তা এবং পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার না হওয়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে ভূমিকা রাখছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কমিটির সভাপতি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কমিটি গঠনসংক্রান্ত বৈঠকে আগামী দুই মাসের মধ্যে পুলিশের লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর থেকেই এ বিষয়ে বিশেষ তৎপরতা শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে সহিংসতার হার সবচেয়ে বেশি ছিল।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্চ মাসে মোট ১৯০ জন নারী ও কন্যা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পরের মাস এপ্রিলে এ সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২২০ জনে।
একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল— এই তিন মাসে মোট ১৪৭ জন নারী ও কন্যা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ৩২ জন, মার্চে ৫৭ জন এবং এপ্রিলে ৫৮ জনের ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যায় বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব জাস্টিস বা সহিংসতার বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। নির্বাচিত সরকার আসার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তারা এখন আর ভঙ্গুর অবস্থায় নেই। মনোবল ফিরে পেয়েছে। এই সময়টাতে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুমের ঘটনা কমেছে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি সময়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী খুন, অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ নিতে সহিংসতা এসব সরকারকে ভাবাচ্ছে। নিশ্চয় এসব নির্মূলে তাদের পরিকল্পনা রয়েছে এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়।
রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ— সরকার পরিবর্তন হলেও “চাঁদাবাজির ধরন বদলেছে, কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হয়নি”।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন আলোচনায় অনেকেই দাবি করেছেন, স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের সমন্বয়ে আগের মতোই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে।
তিন মাসে রাজধানী ও বিভাগীয় শহরগুলোতে ছিনতাই, মাদক ব্যবসা এবং কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কয়েকটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। কিছু এলাকায় দৃশ্যমান টহল বাড়ানো হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এখনো গ্রামীণ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, জমি দখল ও রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ রয়ে গেছে। বিশেষ করে নির্বাচনের পর স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের কারণে কিছু এলাকায় সংঘর্ষ বেড়েছে।
সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি, মার্চে ৬৩টি ও এপ্রিলে ৬৬টি দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসেই বাড়ছে হামলা।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, পুলিশের মনোবল ভেঙে দেওয়া অপরাধীদের অন্যতম লক্ষ্য। তাই পুলিশকে আরও কার্যকর করতে র্যাব, এপিবিএন ও পিবিআইসহ বিশেষায়িত বাহিনীর যৌথ অভিযান বাড়ানো এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় কঠোর বার্তা ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
গত তিন মাসে সার্বিক আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদ পর্যাদার একজন কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আগের তুলনায় সার্বিক পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
তার ভাষায়, “গোয়েন্দা নজরদারি আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের তালিকা প্রস্তুত করে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেককে আটকও করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে টহল বৃদ্ধি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী তৎপরতা ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে।
এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেন, বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হলে বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তদন্ত, গুম ও নির্যাতনের অতীত অভিযোগ পর্যালোচনাসহ বাহিনীগুলোর ওপর সংসদীয় নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
তিন মাসে নির্বাচিত সরকার কিছু উদ্যোগের বার্তা দিলেও বাস্তব পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বাহিনীগুলোর পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী এক বছরই নির্ধারণ করবে—নতুন সরকার সত্যিই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সংস্কার করতে পারবে, নাকি পুরোনো সংস্কৃতিই নতুন নামে ফিরে আসবে।






