ঈদে দর্শককে দুদণ্ড শান্তির প্রতিশ্রুতি! | চ্যানেল আই অনলাইন

ঈদে দর্শককে দুদণ্ড শান্তির প্রতিশ্রুতি! | চ্যানেল আই অনলাইন

ঈদের সিনেমা মানেই সাধারণত বাণিজ্যিক বিনোদনের হুল্লোড়! সিঙ্গেল স্ক্রিন হোক বা সিনেপ্লেক্স- সবখানেই অ্যাকশন, রোমান্স কিংবা ক্রাইম থ্রিলারে রমরমা! সেখানে আসন্ন ঈদ উল আজহা হতে যাচ্ছে একেবারে ব্যতিক্রম! অন্তত নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল যেন একেবারে ভিন্ন সুরে হাজির হচ্ছেন!

তার নতুন চলচ্চিত্র ‘বনলতা সেন’ যেন ব্যস্ত, ক্লান্ত, থতমত এই শহরের দর্শকদের জন্য দুদণ্ড শান্তির প্রতিশ্রুতি। প্রশ্ন হতে পারে, ঈদের কোলাহলে দর্শক কি সেই শান্তির কাছে নিজেকে সঁপে দেবে?

দ্রোহের ভিতরে ভালোবাসার কথা বলা নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল বরাবরই নিজস্ব এক ভাষা তৈরি করেছেন। নাটক, টেলিছবি, বিজ্ঞাপন কিংবা সংগীতে- সব জায়গাতেই তার কাজের মধ্যে থাকে বিষণ্ন সৌন্দর্য, ধুলোমাখা মানুষের গন্ধ, নিঃসঙ্গতার দীর্ঘশ্বাস। মেজবাউর রহমান সুমন ও শিবু কুমার শীলের সঙ্গে ‘মেঘদল’ গড়ে তোলার সময় থেকেই তিনি মূলধারার বাইরে দাঁড়িয়ে এক অন্যরকম শিল্পভাষা নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।

২০২০ সালে করোনা মহামারির মধ্যেই মুক্তি পেয়েছিল তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’। সিনেমাটি নিয়ে তখন নির্মাতা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেছিলেন, “আমি কনভেনশনাল ছবি বানাইনি, বা এটা কোনো টিপিক্যাল আর্ট ফর্মের ছবিও না। দিস ইজ সামথিং নিউ!”

প্রায় ছয় বছর পর দ্বিতীয় সিনেমা ‘বনলতা সেন’ নিয়েও তিনি যেন সেই একই কাব্যিক অথচ বিদ্রোহী অবস্থানেই দাঁড়িয়ে আছেন।

এরইমধ্যে ‘বনলতা সেন’-এর প্রকাশিত ফার্স্টলুক পোস্টার, ক্যারেক্টার পোস্টার, টিজার ও ট্রেলার দর্শকমহলে আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে। কেউ কেউ বলছেন, অনেকদিন পর বাংলা সিনেমার প্রচারণায় এমন নান্দনিকতা দেখা গেল। টিজার-ট্রেলারের প্রতিটি ফ্রেমে যেন ধীর, নিস্তব্ধ, কবিতার মতো এক আবহ! সেখানে বাণিজ্যিক সিনেমার চেনা চিৎকার নেই, আছে নিঃশব্দ বিষণ্নতা।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কবি জীবনানন্দ দাশের উপস্থিতি! বাংলার ‘নির্জনতম কবি’কে শুধু চরিত্র হিসেবে নয়, তার কাব্যচেতনা, তার নস্টালজিয়া, তার নিঃসঙ্গতার ভুবনকে সিনেমার শরীরে মিশিয়ে দিতে চেয়েছেন নির্মাতা। যে কবি লিখেছিলেন “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে”-সেই অন্তহীন পথচলার ক্লান্তি, বিষণ্নতা আর আশ্রয় খোঁজার আকুতি যেন সিনেমাটির ভেতরেও প্রতিধ্বনিত হতে যাচ্ছে। ট্রেলার দেখে এমন আন্দাজ অমূলক নয়।

জীবনানন্দ দাশের জীবন ছিল গ্লানি, বঞ্চনা, নিঃসঙ্গতা আর অপ্রাপ্তির দীর্ঘ উপাখ্যান। জীবদ্দশায় তিনি খুব বেশি স্বীকৃতি পাননি। চাকরি হারিয়েছেন, অবহেলা সহ্য করেছেন, নিজের অসামান্য সৃষ্টিগুলো কালো ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রেখেছেন। অথচ মৃত্যুর বহু বছর পর তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলা ভাষার অন্যতম জনপ্রিয় কবি। সেই জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ যিনি ক্লান্ত পথিককে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলেন- এবার যেন সিনেমার পর্দায়ও নতুন অর্থে ফিরে আসছে!

সিনেমাটিতে বনলতা সেন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ‘আয়নাবাজি’খ্যাত অভিনেত্রী মাসুমা রহমান নাবিলা। আর জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে দেখা যাবে খায়রুল বাসারকে। তার লুক ইতোমধ্যেই দর্শকদের চমকে দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, পর্দায় যেন সত্যিই ফিরে এসেছেন কবি! এছাড়া অভিনয় করেছেন সোহেল মণ্ডল, মায়মুনা মম, নাজিবা বাশার, শরীফ সিরাজ, প্রিয়ন্তি ঊর্বী ও গাজী রাকায়েত।

ছবিটির গল্প, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও সম্পাদনার দায়িত্বও নিজেই সামলেছেন মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। ফলে এটি যে পুরোপুরি তার নিজস্ব এক শিল্পভাষার বহিঃপ্রকাশ হতে যাচ্ছে, তা বলাই যায়।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়- ঈদের দর্শক কি ‘বনলতা সেন’-এর মতো ধীর, কাব্যিক, বিষণ্ন এক সিনেমার জন্য প্রস্তুত? যখন চারদিকে বাণিজ্যিক সিনেমার উচ্চকিত প্রচারণা, তখন ‘বনলতা সেন’ হয়তো ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে। কিন্তু সেই পথই হয়তো আলাদা করে টেনে নিতে পারে কিছু দর্শককে।

কারণ, এই শহরের ক্লান্ত মানুষদেরও তো কখনো কখনো দরকার হয় একটু নীরবতা। দরকার হয় এমন এক আশ্রয়, যেখানে কিছু সময়ের জন্য হলেও থেমে থাকা যায়। হয়তো সেই ফুরিয়ে যাওয়া ক্লান্তির মধ্যেই ঈদের দর্শকদের দুদণ্ড শান্তি দিতে আসছে মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের ‘বনলতা সেন’!