বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ কেবল রাজস্ব ঘাটতি বা প্রবৃদ্ধির ধীরগতিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা। তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কর প্রশাসনের জটিলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি অর্থনীতির প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শনিবার (৬ জুন) রাজধানীতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘চরচা ডটকম’ আয়োজিত ‘সংকট মুহূর্তের বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব মতামত উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ বা বড় বাজেট প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সুশাসন, নীতি-স্থিতিশীলতা ও কার্যকর সংস্কার। গোলটেবিলে বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
আলোচনায় কর প্রশাসনের বর্তমান পদ্ধতিরও সমালোচনা করা হয়। বিকেএমইএ নেতা মোহাম্মদ হাতেম এনবিআরের কর আদায়ের বর্তমান পদ্ধতিকে ‘ট্যাক্স টেররিজম’ বা কর নিপীড়ন বলে মন্তব্য করেন। তিনি অভিযোগ করেন, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং উৎসে করের টাকা সময়মতো ফেরত না দিয়ে ব্যবসায়ীদের কর্মক্ষম মূলধন আটকে রাখা হচ্ছে।
নাসিম মঞ্জুর অডিট ব্যবস্থার নামে সনাতন হয়রানির সমালোচনা করে ঝুঁকিভিত্তিক ডিজিটাল অডিট প্রবর্তনের দাবি জানান।
কর ব্যবস্থার এই জটিলতা নিরসনে সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী বলেন, করদাতাদের হয়রানি কমাতে কর প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ‘ফেসলেস’ বা ডিজিটাল করতে হবে, যা বৈশ্বিকভাবে প্রমাণিত একটি সফল মডেল।
ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত ভঙ্গুরতার তীব্র সমালোচনা করে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, দেশের আর্থিক খাত ক্রমেই একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতাবান বড় ঋণগ্রহীতারা অন্যায্য সুবিধা পাচ্ছেন, আর প্রকৃত উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তারা অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ব্যাংকিং খাতকে একটি ‘দুষ্টু চক্র’ আখ্যা দিয়ে তিনি আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর তাগিদ দেন।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা ও অপচয়ের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। আইসিএমএবি সভাপতি কাউসার আলম বলেন, বাজেটের আকার নয়, এর গুণগত বাস্তবায়নই আসল। প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে “কোয়ালিটি ড্রাইভ কোয়ান্টিটি” নীতিতে এগোতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে কৃষির আধুনিকায়ন, যান্ত্রিকীকরণ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে যুবসমাজকে কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তুলতে কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আলোচকরা আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা বর্তমানে অর্থনীতিকে ত্রিমুখী সংকটের মুখে ফেলেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
গোলটেবিলের উপসংহারে বক্তারা বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শুধু প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, কর সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের জবাবদিহিতা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।





