
গত কয়েক বছর ধরেই অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একটি নাম উচ্চারিত হচ্ছিল। অভিবাসী বাংলাদেশিদের আড্ডায়, ব্যবসায়ী মহলে এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের আলোচনায় তাঁর সাফল্যের কথা প্রায়ই উঠে আসত। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি AirTrunk প্রায় ২৪ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারে অধিগ্রহণের ঘোষণা আসে Blackstone এবং Canada Pension Plan Investment Board বা CPP Investments নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের কাছ থেকে। এই চুক্তির পর অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ধনীদের তালিকায় উঠে আসে সেই নাম।
রবিন খোদা। তাঁর পৈতৃক বাড়ি সিরাজগঞ্জের ছাতিয়ানতলী গ্রামে। তাঁর বাবা এস এম ওয়াজেদ আলী উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনার জন্য ঢাকায় আসেন এবং পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বাবার চাকরির সূত্রে রবিনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। তিনি পড়াশোনা করেন শেরেবাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে।
১৯৯৭ সালে এইচএসসি পাস করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য রবিন খোদা অস্ট্রেলিয়ায় যান। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৮ বছর। তিনি ভর্তি হন সিডনির University of Technology Sydney-তে। কিছুদিন পর তাঁর বাবা-মাও অস্ট্রেলিয়ায় চলে আসেন। পরিবারের উপস্থিতি তাঁর নতুন জীবনে বড় শক্তি হয়ে ওঠে। ২০০২ সালে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি যুক্তরাজ্যের Manchester Business School থেকে MBA করেন।
পেশাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি প্রযুক্তি ও টেলিকম খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কাজ করতে গিয়ে তিনি কাছ থেকে দেখেন, প্রযুক্তির জগৎ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ব্যবহারকারী বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে বিপুল তথ্য জমা রাখা, নিরাপদ রাখা এবং ব্যবহার করার প্রয়োজন। তখনই তাঁর মনে হয়, ভবিষ্যতে ডেটা সেন্টার হবে প্রযুক্তি দুনিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
এই ভাবনা থেকেই ২০১৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন AirTrunk। কিন্তু শুরুটা সহজ ছিল না। নিরাপদ কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে তিনি বড় ঝুঁকি নেন। কারণ ডেটা সেন্টার ব্যবসা সাধারণ কোনো উদ্যোগ নয়। এখানে জমি, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, গ্রাহকের আস্থা এবং বিপুল পুঁজির প্রয়োজন হয়।
AirTrunk শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই একটি বড় গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ডেটা সেন্টার প্রকল্পের কাজ হাতে আসে রবিন খোদার। কিন্তু কাজ হাতে এলেও পুঁজি ছিল না। নতুন কোম্পানি হওয়ায় ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীরা সহজে তাঁর ওপর আস্থা রাখতে চাননি। তিনি নিজের সঞ্চয় ও ব্যক্তিগত সম্পদ পর্যন্ত ঝুঁকিতে ফেলেন। এক পর্যায়ে প্রায় দেউলিয়া হওয়ার অবস্থায় পৌঁছে যান। তবু থেমে যাননি। তাঁর চোখে তখন শুধু একটি কোম্পানি ছিল না, ছিল ভবিষ্যতের ডিজিটাল অবকাঠামোর ছবি।
অবশেষে ২০১৭ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হয়। AirTrunk সিডনি ও মেলবোর্নে প্রথম বড় আকারের ডেটা সেন্টার গড়ে তোলে। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি অস্ট্রেলিয়ার প্রযুক্তি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে। পরে AirTrunk অস্ট্রেলিয়ার বাইরে সিঙ্গাপুর, হংকং, জাপান ও মালয়েশিয়ায় কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ১১টি ডেটা সেন্টার রয়েছে এবং ৪৫০ জনের বেশি পেশাজীবী সেখানে কাজ করেন।
অধিগ্রহণের পরও রবিন খোদা AirTrunk-এর CEO হিসেবে রয়েছেন। এই লেনদেন তাঁকে অস্ট্রেলিয়ার বিলিয়নিয়ারদের কাতারে নিয়ে যায় এবং ২০২৪ সালে Australian Financial Review তাঁকে Business Person of the Year সম্মাননায় ভূষিত করে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী Melea Walker ও দুই কন্যাকে নিয়ে সিডনিতে থাকেন।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি রবিন খোদা সামাজিক কাজেও যুক্ত হয়েছেন। ২০২০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Khuda Family Foundation। ২০২৫ সালে এই ফাউন্ডেশন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের অনুদান ঘোষণা করে। এটি University of Sydney এর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক দাতব্য অনুদান। এই অর্থ দিয়ে ২০ বছর মেয়াদি একটি কর্মসূচি চালু করা হবে, যার লক্ষ্য Western Sydney অঞ্চলের মেয়েদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত শিক্ষায় আগ্রহী করা এবং তাঁদের পেশাজীবনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করা।
রবিন খোদা বলেছেন, AirTrunk গড়ে তোলার সময় প্রযুক্তি খাতে অভিজ্ঞ নারী কর্মী খুঁজে পেতে তাঁকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছিল। অনেক নারী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত সেই পেশায় থাকেন না। এই বাস্তবতা তাঁকে ভাবিয়েছে। তাই তিনি শুধু অনুদান দেননি, মেয়েদের স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেখান থেকে পেশাজীবনে পৌঁছানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পথ তৈরি করতে চেয়েছেন।
রবিন খোদার পথচলা কয়েকটি কারণে আলাদা। তিনি অভিবাসী জীবনের সংগ্রাম পেরিয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন। নিজের অর্জনকে শুধু ব্যক্তিগত সম্পদে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর গড়া AirTrunk এখন অস্ট্রেলিয়ার বাইরে এশিয়ার বিভিন্ন বাজারেও কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে।
রবিন খোদার গল্প তাই শুধু একজন বিলিয়নিয়ারের গল্প নয়। এটি অভিবাসী জীবনের সংগ্রাম, দূরদর্শিতা, সাহস এবং সফলতার গল্প। বিশ্বের বাংলাদেশি অভিবাসীদের কাছে তাঁর গল্প তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, একই সঙ্গে অনুপ্রেরণার।
তথ্যসূত্র:
Reuters, 5 June 2026
The Australian, 5 June 2026
The Economic Times, 5 June 2026






