দ্বিতীয় ধাপ, সংসর্গকে অপরাধ হিসেবে প্রমাণ করা। তুমি কার সঙ্গে ছিলে? তুমি কোথায় গিয়েছিলে? তুমি কার ফোন ধরেছিলে? কার সভায় বক্তৃতা করেছিলে? এসব প্রশ্ন কোনো প্রমাণের বিকল্প হয়ে যায়।
তৃতীয় ধাপ হলো, প্রকৃত অভিযোগকে লুকিয়ে রেখে পার্শ্ব–অভিযোগে বিচার করা। সক্রেটিসকে রাজনৈতিক দায়ে বিচার করতে পারেনি বলে ধর্মীয় দায়ে বিচার করা হয়েছিল। আজকের দুনিয়ায় রাজনৈতিক বিরোধীদের দুর্নীতির মামলায়, ট্যাক্স ফাঁকির মামলায়, নৈতিকতার মামলায় ধরা হয়। প্রকৃত কারণটি অলিখিত থাকে।
চতুর্থ ধাপ, জনমানসে ভয় ছড়িয়ে নীরবতা নিশ্চিত করা। যাঁরা এ বিচারকে অন্যায় মনে করেন, তাঁরা যদি চুপ থাকেন, তাহলে বিচারটি আরও সহজ হয়ে যায়। এথেন্সেও তা-ই হয়েছিল।
বাংলাদেশ: একটি পরিচিত প্লেবুকের স্থানীয় প্রয়োগ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্লেবুক এতটাই পরিচিত যে এর প্রতিটি ধাপই পরিচিত লাগে। এখানে শাসন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ‘দোসর’ শব্দটির ব্যবহার এবং প্রয়োগপদ্ধতি প্রায় নিখুঁতভাবে সক্রেটিসের বিচারের কাঠামো অনুসরণ করে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ‘রাজাকার’ শব্দটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অর্থ বহন করেছিল। যারা পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ছিল, গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল বা সহযোগিতা করেছিল, তারা ছিল প্রকৃত রাজাকার। কিন্তু পরবর্তী দশকগুলোয় শব্দটি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। যেকোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘রাজাকার’ বলার মাধ্যমে তাকে ৭১-এর বিরুদ্ধে দাঁড় করানো যায়, তাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শত্রু বানানো যায়, তার বিরুদ্ধে যেকোনো ব্যবস্থা নেওয়া বৈধ করা যায়। এটি ঠিক সেই প্রক্রিয়া যেখানে সক্রেটিসের সঙ্গে ক্রিটিয়াসের সম্পর্কটিকে ব্যবহার করা হয়েছিল।
আবার প্রতিটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন। বিগত সরকারের ‘দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত হন সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সমাজকর্মীরা। যাঁদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ কোনো অপরাধের প্রমাণ নেই, তাঁদের বিরুদ্ধে সংসর্গের প্রমাণ ব্যবহার করা হয়। তুমি অমুক মিছিলে ছিলে, তুমি অমুক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়েছিলে, তুমি অমুকের ফেসবুক পোস্টে লাইক দিয়েছিলে, এসব ‘প্রমাণ’ দিয়ে গড়ে তোলা হয় একটি মামলার কাঠামো।
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে শাসনের সদ্য পতন ঘটেছে, তার সত্যিকারের সহযোগীরা প্রায়ই নিরাপদ থাকেন। কারণ তাঁরা নমনীয়, তাঁরা আপস করতে জানেন, তাঁরা নতুন শক্তির সঙ্গে যোগ দিতে দেরি করেন না। যাঁদের নাম থাকে বিচারের তালিকায়, তাঁরা প্রায়ই সেই সব মানুষ, যাঁরা ক্ষমতার সামনে মাথা নোয়াননি, যাঁরা প্রশ্ন করেছিলেন, যাঁরা দলের বাইরে নিজস্ব কণ্ঠস্বর রেখেছিলেন। এটিও সক্রেটিসের পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে যায়। যাঁরা ত্রিশ স্বৈরশাসকের প্রকৃত সহযোগী ছিলেন, তাঁরা বেঁচে গেলেন, কিন্তু সেই মানুষ বিষ খেলেন, যিনি ক্রিটিয়াসের মুখের ওপর বলতে পেরেছিলেন, ‘তুমি যা করছ, তা ন্যায় নয়।’
উপসংহার: বয়ান ও বাস্তবতা
‘সক্রেটিস স্বৈরাচারের দোসর ছিলেন’, এ বয়ান একটি রাজনৈতিক নির্মাণ ছিল। এটি সত্য ছিল না, কিন্তু কার্যকর ছিল। এটি প্রমাণিত ছিল না, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য করা গিয়েছিল। এটি সরাসরি বলা হয়নি, কিন্তু সবার মনে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
এ প্রক্রিয়াই হলো সবচেয়ে ভয়ংকর। সরাসরি মিথ্যা বললে মানুষ প্রতিবাদ করে। কিন্তু অর্ধসত্য, ইঙ্গিত, সংসর্গের দোষ ইত্যাদি দিয়ে তৈরি বয়ানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন। কারণ, এ বয়ান একদিকে খণ্ডন করার মতো সুস্পষ্ট নয়, অন্যদিকে উড়িয়ে দেওয়ার মতো অবিশ্বাস্যও নয়।
আড়াই হাজার বছর পরে আমরা জানি যে সক্রেটিস স্বৈরাচারের দোসর ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রশ্নকারী। আর প্রশ্নকারীরা সব সময়ই বিপজ্জনক থাকেন, কারণ তাঁরা ক্ষমতার মুখের সামনে আয়না ধরেন। সেই আয়নায় ক্ষমতা নিজের কুৎসিত মুখ দেখতে চায় না।
সুতরাং ক্ষমতা আয়না ভাঙে না। সে আয়নাধারীকে ভাঙে এবং আয়নাধারীকে ভাঙার আগে তার ওপর একটি বয়ান চাপিয়ে দেয়, যাতে আয়না ভাঙার মুহূর্তে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষেরা ভাবে, হয়তো এই লোক সত্যিই কোনো না কোনো দোষ করেছিল।
এ বয়ান আজও বেঁচে আছে। এথেন্সে জন্ম নিয়েছিল, কিন্তু তার নাগরিকত্ব বিশ্বব্যাপী। প্রতিটি দেশে, প্রতিটি যুগে, প্রতিটি শাসন পরিবর্তনে, এ বয়ান নতুন পোশাক পরে হাজির হয়। শুধু নামগুলো বদলায়, ক্রিটিয়াস থেকে অন্য কোনো নাম, সক্রেটিস থেকে অন্য কোনো মানুষ। কিন্তু খেলাটা এক। আর খেলার নিয়মটাও এক।
এবং সেই নিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একমাত্র উপায় হলো সক্রেটিসের উপায়, প্রশ্ন করা। বয়ানটিকে প্রশ্ন করা, বিচারটিকে প্রশ্ন করা, নিজের নীরবতাকে প্রশ্ন করা। কারণ, যে সমাজে প্রশ্নকারীরা বিষ খান এবং তামাশাকারীরা বিচারক হন, সে সমাজ আসলে বিচার করে না, সে নিজেই বিচারের মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।
-
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, কলামিস্ট ও সম্পাদক




