কে হতে যাচ্ছেন অন্টারিও লিবারেলদের নতুন নেতা? – DesheBideshe

কে হতে যাচ্ছেন অন্টারিও লিবারেলদের নতুন নেতা? – DesheBideshe


কে হতে যাচ্ছেন অন্টারিও লিবারেলদের নতুন নেতা? – DesheBideshe

ক্ষমতার রাজনীতিতে সব লড়াই ভোটের মাঠে হয় না। কিছু লড়াই শুরু হয় দলের ভেতরে, যেখানে ব্যালট বাক্সের আগে পরীক্ষা দিতে হয় নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা, সংগঠন ও গ্রহণযোগ্যতাকে। অনেক সময় সেই লড়াইয়ের ফলই নির্ধারণ করে আগামী নির্বাচনে কে হবেন সরকারপ্রধান, আর কে হয়ে উঠবেন সরকারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নির্বাচন কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; সেটি হয়ে ওঠে প্রদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ঠিক এমন এক সময়ে অন্টারিও লিবারেল পার্টির নেতৃত্বের দৌড়ে নতুন মোড় এসেছে। অ্যাজাক্সের এমপিপি রব সারজানেক তাঁর প্রচারণা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। পাঁচজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেমে এসেছে চারজনে। সংখ্যার এই পরিবর্তন শুধু একজন প্রার্থীর বিদায় নয়; এটি নতুন করে বদলে দিতে পারে সমর্থনের সমীকরণ, সাংগঠনিক ভারসাম্য এবং অন্টারিওর প্রধান বিরোধী দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের লড়াই। CityNews জানিয়েছে, সারজানেক কোনো নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করলেও পরিবার, সমর্থক ও সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি ২০২৫ সালে অ্যাজাক্স থেকে এমপিপি নির্বাচিত হন।

প্রশ্ন এখন একটাই। ডগ ফোর্ডের প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ সরকারের সামনে আগামী নির্বাচনে লিবারেলদের অধিনায়ক কে হবেন?

বর্তমানে নেতৃত্বের দৌড়ে রয়েছেন সাবেক ফেডারেল মন্ত্রী নভদীপ বেইন্স, ইটবিকো-লেকশোরের এমপিপি লি ফেয়ারক্লাফ, উদ্যোক্তা এরিক লোম্বার্ডি এবং সাবেক রাজনৈতিক স্টাফার ডিলান মারান্ডো। অন্টারিও লিবারেল পার্টির ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, সদস্যরা ৯ নভেম্বর থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে ranked ballot পদ্ধতিতে ভোট দেবেন এবং নতুন নেতার নাম ঘোষণা করা হবে ২১ নভেম্বর।

এই নির্বাচন শুধু একজন নতুন নেতা বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া নয়; এটি অন্টারিও লিবারেল পার্টির পুনর্গঠনের পরীক্ষা। দলটি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে। ডগ ফোর্ডের কনজারভেটিভরা প্রদেশের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে এনডিপি ও লিবারেলদের মধ্যে বিরোধী রাজনীতির প্রধান জায়গা দখলের লড়াইও চলছে। তাই লিবারেল সদস্যদের সামনে প্রশ্ন শুধু কে জনপ্রিয়, তা নয়; বরং কে দলকে আবার সরকার গঠনের বিশ্বাসযোগ্য জায়গায় নিতে পারবেন।

এই মুহূর্তে পরিচিতি, অভিজ্ঞতা ও সংগঠনের বিস্তৃতি বিবেচনায় নভদীপ বেইন্সকে নেতৃত্বের দৌড়ে শক্ত অবস্থানে দেখা হচ্ছে। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বিস্তৃত যোগাযোগ এবং দলীয় পরিসরে গ্রহণযোগ্যতা। তিনি ২০০৪ সালে প্রথম ফেডারেল এমপি নির্বাচিত হন, পরে জাস্টিন ট্রুডো সরকারের সময় Innovation, Science and Industry মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। iPolitics জানিয়েছে, বেইন্সের প্রার্থিতা ঘোষণার আগেই দলের ভেতরে তাঁকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল এবং সিনিয়র লিবারেলরা তাঁকে দৌড়ে নামতে উৎসাহিত করেছিলেন।

তহবিল সংগ্রহের দিক থেকেও বেইন্স এগিয়ে। Progress Canada-র ৩ জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, তিনি ১৮৭টি অনুদান থেকে ৩ লাখ ৯ হাজার ৭০২ ডলার তুলেছেন। দ্বিতীয় স্থানে লি ফেয়ারক্লাফ, যিনি ১৬০টি অনুদান থেকে ২ লাখ ১১ হাজার ৫৬৯ ডলার তুলেছেন। ডিলান মারান্ডো তুলেছেন ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৬৯ ডলার এবং এরিক লোম্বার্ডি তুলেছেন ১ লাখ ২০ হাজার ৭৫৮ ডলার। এই হিসাবের চিত্রটি যদিও সম্পূর্ণ নয়, তবু এটি নেতৃত্বের দৌড়ে শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।

লি ফেয়ারক্লাফকে তবে অবমূল্যায়ন করা যাবে না। তিনি স্বাস্থ্য প্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং কোভিড সময়কালে St. Mary’s General Hospital-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। স্বাস্থ্যসেবা অন্টারিওর সবচেয়ে সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর একটি। ফলে ফেয়ারক্লাফ নিজেকে এমন এক প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে পারেন, যিনি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও জনসেবার বাস্তবতা দুটোই বোঝেন। Waterloo Region-এ তাঁর কাজের অভিজ্ঞতাও তাঁকে আঞ্চলিকভাবে বাড়তি পরিচিতি দিয়েছে।

এরিক লোম্বার্ডি তুলনামূলকভাবে নতুন মুখ। তবে রাজনীতিতে নতুন মুখ সবসময় দুর্বলতা নয়। আবাসন সংকট, নগরনীতি ও তরুণ প্রজন্মের উদ্বেগকে সামনে রেখে তিনি নিজেকে পরিবর্তনের প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছেন। তাঁর চ্যালেঞ্জ হলো সংগঠন। নেতৃত্বের নির্বাচন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা দিয়ে জেতা যায় না; রাইডিংভিত্তিক সদস্য সংগঠিত করা, ফোন করা, ভোটার ধরে রাখা এবং ranked ballot-এ দ্বিতীয় পছন্দের ভোট পাওয়াও বড় বিষয়।

ডিলান মারান্ডোর শক্তি তাঁর নীতিনির্ধারণী অভিজ্ঞতা। তিনি ফেডারেল ও প্রাদেশিক পর্যায়ে রাজনৈতিক স্টাফার হিসেবে কাজ করেছেন। তবে তাঁর প্রধান দুর্বলতা জনপরিচিতি। নেতৃত্বের নির্বাচনে নীতিগত দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভোটারদের মন জিততে ব্যক্তিত্ব, গল্প, সংগঠন ও দৃশ্যমান শক্তিও প্রয়োজন।

রব সারজানেকের সরে দাঁড়ানো লড়াইকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। সারজানেকের সিদ্ধান্তের পর তাঁর কিছু সমর্থক আবার স্টেফানি বোম্যানকে দৌড়ে নামার জন্য উৎসাহিত করছেন। প্রার্থিতা জমা দেওয়ার শেষ সময় ৩১ জুলাই। অর্থাৎ, লড়াই চারজনে নেমে এলেও প্রার্থীর সংখ্যা শেষ পর্যন্ত আবার বদলাতে পারে।

তবে নেতৃত্বের নির্বাচন সাধারণ নির্বাচনের মতো নয়। এখানে জনমত জরিপের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলীয় সদস্য, সংগঠন, অঞ্চলভিত্তিক ভোট, endorsement, তহবিল, প্রচারণার শৃঙ্খলা এবং ranked ballot-এ দ্বিতীয় বা তৃতীয় পছন্দের ভোট। তাই বেইন্স এগিয়ে থাকলেও ফল নিশ্চিত বলা যাবে না।

অন্টারিও লিবারেলদের সামনে এখন আসল প্রশ্ন হলো, তারা কি অভিজ্ঞ ও পরিচিত মুখকে বেছে নেবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক ভাষা খুঁজবে? তারা কি ডগ ফোর্ডকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম একজন প্রিমিয়ার-ইন-ওয়েটিং চাইবে, নাকি সংগঠন পুনর্গঠনের জন্য তুলনামূলকভাবে মাটির কাছাকাছি নেতৃত্ব খুঁজবে?

২১ নভেম্বর সেই প্রশ্নের আনুষ্ঠানিক উত্তর দেবে। তবে তার আগেই অন্টারিওর লিবারেল রাজনীতির ভেতরে শুরু হয়ে গেছে অদৃশ্য দাবার চাল। কে কাকে সমর্থন দেবেন, কার তহবিল কত বাড়বে, কোন অঞ্চলে কার সংগঠন শক্তিশালী হবে, আর সারজানেকের সমর্থকরা শেষ পর্যন্ত কোন শিবিরে যাবেন, এসবই আগামী কয়েক মাসে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। শেষ পর্যন্ত অন্টারিও লিবারেলদের নতুন নেতা কে হবেন, সেই উত্তর এখনো রয়ে গেছে দলীয় সদস্যদের ব্যালটেই।

তথ্যসূত্র: CityNews, iPolitics, Ontario Liberal Party