লাল-হলুদ কার্ডের কাহিনীতে জড়িয়ে আন্তোনিও রাতিন, ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা বৈরিতার শুরু যেখানে | চ্যানেল আই অনলাইন

লাল-হলুদ কার্ডের কাহিনীতে জড়িয়ে আন্তোনিও রাতিন, ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা বৈরিতার শুরু যেখানে | চ্যানেল আই অনলাইন

ফুটবল মাঠে রেফারি পকেট থেকে লাল বা হলুদ কার্ড বের করলেই এখন খেলোয়াড়রা অবলীলায় মাঠ ছেড়ে যান বা সতর্ক হন। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই নিয়মের পেছনে জড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনার এক কিংবদন্তি অধিনায়কের নাম- আন্তোনিও রাতিন। বিশ্বকাপের ইতিহাসচর্চায় যার নাম অবধারিতভাবেই চলে আসে।

গত ১১ জুলাই, ২০২৬ তারিখে ৮৯ বছর বয়সে মারা গেছেন ১৯৬২ ও ১৯৬৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দেওয়া এই ফুটবলার। চলতি বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে আলবিসেলেস্তেরা তার স্মরণে কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নেমেছিল। আজ যখন কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দীর্ঘ ২৪ বছর পর ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তখন আবারও ফুটবল মহলে ফিরে আসছে রাতিনের সেই বিখ্যাত প্রতিবাদের গল্প।

১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে একটি ফাউলের প্রতিবাদ করেছিলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক রাতিন। কিন্তু ম্যাচ পরিচালনায় থাকা জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলেইন মনে করেছিলেন রাতিন তাকে গালি দিচ্ছেন।

আসলে রেফারি স্প্যানিশ ভাষা জানতেন না, আর রাতিন জানতেন না জার্মান বা ইংরেজি। ভাষার এই দূরত্বের কারণে রেফারি মুখে বলে রাতিনকে মাঠ থেকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কারণ সে সময় ফুটবলে লাল বা হলুদ কার্ডের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

মাঠ ছাড়তে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান রাতিন। প্রায় ১০ মিনিট ধরে তিনি মাঠে দাঁড়িয়ে দোভাষী দাবি করতে থাকেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত মাঠে পুলিশ ডাকতে হয়েছিল।

পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে সেই নাটকীয় মুহূর্তের স্মৃতিচারণা করে রাতিন নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি যখন মাঠের কোনায় পৌঁছালাম, তখন ইংল্যান্ডের পতাকাটি মুচড়ে দিই। এরপর রানী এলিজাবেথ যে লাল গালিচা দিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতেন, সেটির ওপর গিয়ে প্রায় ৫ মিনিট বসে থাকি। লালগালিচাটি সত্যিই খুব সুন্দর ছিল।’

ওয়েম্বলিতে রাতিনের এই প্রতিবাদের পর টনক নড়ে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার। বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড় ও রেফারিদের মধ্যে ভাষার এই যোগাযোগ সমস্যা দূর করতে উদ্যোগী হয় তারা।

তৎকালীন ফিফার রেফারি কমিটির প্রধান কেনেথ জর্জ অ্যাস্টন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ট্রাফিক লাইট দেখে অনুপ্রাণিত হন। ট্রাফিক লাইটের হলুদ ও লাল সংকেত দেখে ১৯৬৭ সালে তিনি ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ডের ধারণা নিয়ে আসেন। এর ঠিক তিন বছর পর, ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্ড ব্যবস্থার প্রচলন ঘটানো হয়।

১৯৬৬ সালের ওয়েম্বলিতে রাতিনের সেই প্রতিবাদী ঘটনাই মূলত ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ঐতিহাসিক ফুটবলীয় শত্রুতার জন্ম দিয়েছিল। যা পরবর্তীতে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র মাধ্যমে চিরস্থায়ী রূপ নেয়। রাতিনের প্রস্থানের পর আরও একটি সেমিফাইনালে যখন দুই দল মুখোমুখি, তখন ইতিহাস যেন নতুন করে স্মৃতিচারণ করছে।