বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যুক্ত হলো নতুন এক মাইলফলক। পরিচালক ও প্রযোজক রুবাইয়াত হোসেনের চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজোন্তি প্রতিযোগিতা বিভাগে। এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ভেনিসের আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। ঐতিহাসিক এই অর্জন, চলচ্চিত্রটির নির্মাণযাত্রা, আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনা, নারী নেতৃত্বে নির্মাণ এবং বাংলাদেশি সিনেমার বৈশ্বিক সম্ভাবনা নিয়ে গণমাধ্যমে পাঠানো নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের কথোপকথনটি থাকলো এখানে-
ভেনিসে ৮৩তম আসরে স্থান করে নিলো ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’, সিনেমাটি নিয়ে কিছু বলুন…
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ একটি সুপারন্যাচারাল চলচ্চিত্র। গল্পটি আবর্তিত হয়েছে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মেফেয়ার বিউটি পার্লারকে ঘিরে। বহু বছর ধরে প্রচলিত একটি আরবান মিথ থেকে ছবিটির অনুপ্রেরণা এসেছে—কথিত আছে, এক সময় সেখানে একজন কনে রহস্যজনকভাবে মারা গিয়েছিলেন। আমাদের ছবিতে আরেকজন কনে সেই পার্লারে সাজতে এসে একের পর এক অদ্ভুত ও অতিপ্রাকৃত ঘটনার মুখোমুখি হয়। রহস্য, মনস্তত্ত্ব এবং সুপারন্যাচারাল উপাদানের মধ্য দিয়ে গল্পটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়।
এই গল্পের অনুপ্রেরণা কোথা থেকে এসেছে?
আমি যখন ছয়-সাত বছরের শিশু, তখন মা আমাকে নিয়ে নিয়মিত মেফেয়ার বিউটি পার্লারে চুল কাটাতে যেতেন। সেখানেই প্রথম এই গল্পটি শুনি। এটি ঢাকার বহু নারীর কাছে পরিচিত একটি আরবান মিথ, বিশেষ করে আমাদের প্রজন্মের অনেকেই এই গল্পটি শুনে বড় হয়েছেন। ছোটবেলায় শোনা সেই গল্পটি আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝতে পারি, এটি শুধু একটি ভূতের গল্প নয়; এটি নারী, সৌন্দর্য, বিয়ে এবং সামাজিক প্রত্যাশাকে ঘিরে আমাদের সংস্কৃতির কথাও বলে। সেই ভাবনা থেকেই বহু বছর ধরে লিখতে লিখতে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ তৈরি হয়েছে।
ছবিটি নির্মাণে কত সময় ও কী ধরনের প্রস্তুতি লেগেছে?
এই ছবির চিত্রনাট্য নিয়ে আমি প্রায় বিশ বছর কাজ করেছি। কিন্তু শুটিং হয়েছে মাত্র ২৬ দিনে। দীর্ঘ প্রস্তুতি, অসংখ্য খসড়া, সূক্ষ্ম পরিকল্পনা এবং অসাধারণ একটি আন্তর্জাতিক নির্মাণদলের কারণে এত অল্প সময়ে ছবিটি নির্মাণ সম্ভব হয়েছে।
এই ছবির অভিনয়শিল্পীদের সম্পর্কে বলুন…
এই ছবিতে বাংলাদেশের তিনজন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী, আজমেরী হক বাঁধন, সুনেরাহ বিনতে কামাল এবং রিকিতা নন্দিনী শিমু অভিনয় করেছেন। তাঁদের প্রত্যেকেই অসাধারণ অভিনয় করেছেন। একই সঙ্গে ছবিটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনীন করিম। এটি তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র, কিন্তু তিনি অবিশ্বাস্য রকমের নিষ্ঠা, সাহস এবং সংবেদনশীলতা নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে এই চরিত্রের কাছে সমর্পণ করেছিলেন। শুটিংয়ের প্রতিটি মুহূর্তে তিনি নিজের সমস্ত মনোযোগ, শ্রম এবং আবেগ এই চলচ্চিত্রের জন্য দিয়েছেন। আমি তাঁর অভিনয় নিয়ে ভীষণ গর্বিত।

নির্মাণের শুরু থেকেই ‘নারীপ্রধান’ চলচ্চিত্র হিসেবে সিনেমাটির নাম আসছে। এই ছবির নির্মাণে নারীদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
এই ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বহু নারী শিল্পী ও প্রযুক্তিবিদ কাজ করেছেন। অভিনয়শিল্পী থেকে শুরু করে সিনেমাটোগ্রাফি, সম্পাদনা, শব্দ নির্দেশনা, প্রযোজনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন সৃজনশীল বিভাগে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। এই সহযোগিতামূলক পরিবেশ ছবিটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
আপনার চলচ্চিত্রে বিভিন্ন শ্রেণির নারীদের জীবন উঠে আসে। এ বিষয়ে কিছু বলবেন?
আমার চলচ্চিত্রে আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন শ্রেণির নারীদের জীবনকে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করি। ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’-এ মধ্যবিত্ত নারীর জীবন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’-এ শ্রমজীবী নারীর জীবন এবং ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এ বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত নারীদের জগৎ, তাদের সম্পর্ক, এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে অনুসন্ধান করেছি। প্রতিটি চলচ্চিত্র ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতা থেকে এসেছে, কিন্তু সবগুলোই বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সমাজকে তুলে ধরার চেষ্টা করে।
আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনায় কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
এটি বাংলাদেশ, ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে ও পর্তুগালের যৌথ প্রযোজনা। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ফলে আমরা বিভিন্ন দেশের শিল্পী ও কারিগরি দক্ষতাকে একত্র করতে পেরেছি। কিন্তু গল্প, ভাষা, চরিত্র, সংস্কৃতি এবং আবেগ—সবকিছুই গভীরভাবে বাংলাদেশের।
দর্শক এই ছবি থেকে কী ধরনের অভিজ্ঞতা পাবেন?
আমি চাই দর্শক ছবিটিকে একটি রহস্যময়, আবহময় এবং গভীরভাবে অনুভূতিশীল সুপারন্যাচারাল অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করুন। এটি এমন একটি চলচ্চিত্র, যা শুধু দেখার সময় নয়, শেষ হওয়ার পরও দর্শকের মনে থেকে যাবে—তাদের ভাবাবে, প্রশ্ন করবে এবং হয়তো নিজেদের কিছু ভয় ও স্মৃতির মুখোমুখি দাঁড় করাবে।






