ডায়াবেটিসকে অনেকেই শুধু রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের একটি রোগ হিসেবে ভাবেন। নিয়মিত গ্লুকোজ পরীক্ষা, ওষুধ গ্রহণ, খাদ্যাভ্যাসে সতর্কতা এবং এইচবিএ১সি পর্যবেক্ষণ—এসবই ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এটি শরীরের প্রায় সব অঙ্গের পাশাপাশি মস্তিষ্কেরও মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
বিশেষ করে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে স্ট্রোক, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মনোযোগের ঘাটতি এবং চিন্তাশক্তি কমে যাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই এসব ক্ষতি নীরবে ঘটে এবং উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কেন বাড়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি?
বেঙ্গালুরুর কেআইএমএস হাসপাতালের স্নায়ুরোগ বিভাগের পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ডা. সুজিত কুমারের মতে, দীর্ঘদিন রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ থাকলে রক্তনালির ভেতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে রক্তনালি সংকুচিত ও শক্ত হয়ে যায় এবং সেখানে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি তৈরি হয়।
মস্তিষ্কে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত সরবরাহ কয়েক মিনিটের জন্যও বন্ধ হয়ে গেলে মস্তিষ্কের কোষ মারা যেতে শুরু করে। তাই স্ট্রোক একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি। ডায়াবেটিসের পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা ও হৃদ্রোগ থাকলে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তির ওপরও পড়ে প্রভাব
ডায়াবেটিস শুধু স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় না, দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র রক্তনালিগুলোরও ক্ষতি করে। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের কারণে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
এর ফলে ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা কমে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ভাসকুলার ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বেশি। তবে ডায়াবেটিস ও আলঝেইমারের সরাসরি সম্পর্ক এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
রক্তে শর্করা কমে গেলেও ঝুঁকি
শুধু উচ্চ রক্তে শর্করাই নয়, অতিরিক্ত কমে যাওয়া বা হাইপোগ্লাইসেমিয়াও মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর।
তীব্র হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় বিভ্রান্তি, মাথা ঘোরা, খিঁচুনি, অচেতন হয়ে যাওয়া এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা হ্রাসের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপদ মাত্রায় রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা।
কীভাবে ঝুঁকি কমানো সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রোক ও মস্তিষ্কের জটিলতা এড়াতে—
* নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।
* নির্দিষ্ট সময় পরপর রক্তে শর্করা পরীক্ষা করতে হবে।
* রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
* ধূমপান পরিহার এবং মদ্যপান সীমিত করতে হবে।
* স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে হবে।
* নিয়মিত শরীরচর্চা ও পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে যা করবেন
নিচের যেকোনো উপসর্গ হঠাৎ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে—
* শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া।
* কথা বলতে বা অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া।
* হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা বা কমে যাওয়া।
* ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা বা হাঁটতে সমস্যা হওয়া।
* কোনো কারণ ছাড়াই তীব্র মাথাব্যথা শুরু হওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রোকের উপসর্গ শুরু হওয়ার পর যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, তত বেশি মস্তিষ্ককে স্থায়ী ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। আদর্শভাবে প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চিকিৎসা শুরু হলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
শুধু রক্তে শর্করা নয়, পুরো শরীরের যত্ন জরুরি
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করার রোগ নয়। এটি রক্তনালি, হৃদ্যন্ত্র এবং মস্তিষ্কসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই শুধু গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং অন্যান্য ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ করাই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।




