জুলাইকে কলঙ্কিত করতেই ‘মব’ শব্দের আমদানি | চ্যানেল আই অনলাইন

জুলাইকে কলঙ্কিত করতেই ‘মব’ শব্দের আমদানি | চ্যানেল আই অনলাইন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ব্যর্থ প্রমাণের জন্য ‘সমন্বিত ন্যারেটিভ’ তৈরি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তার দাবি, জুলাই-পরবর্তী সময়ের নেতিবাচক ঘটনাগুলোকে সামনে এনে জুলাইয়ের অর্জন ও ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

রবিবার (৯ আগস্ট) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ লেখায় এসব কথা বলেন ফারুকী।

সেখানে জুলাই নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন,“কথা হচ্ছিলো এক তরুণ শিল্পীর সাথে। সে বললো, ভাই, জুলাই নিয়া ছবি বানাইতে চাই। কিন্তু সেটা বানাইতে গেলে তো মাজার ভাঙ্গার সিনসহ বানাইতে হবে। আমি তারে প্রশ্ন করলাম, মুক্তিযুদ্ধ নিয়া ছবি বানাইতে গেলে কি তুমি মুক্তিযুদ্ধের পর টানা তিন বছর নৈরাজ্যের কথা বলো? হাজার হাজার রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক হত‍্যা কিংবা বিহারী গণহত্যার উল্লেখ করো? ডজন ডজন ব‍্যাংক ডাকাতির কথা উল্লেখ করো? খাদ্যের অভাবে মানুষের আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করো? লুটপাটজনিত দুর্ভিক্ষের কথা বলো? কিংবা সিলেটের ঐ বীরাঙ্গনার কথাও বলো যে বীরাঙ্গনা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের হাতে নির্যাতিত আর যুদ্ধের পরে বাংলাদেশী মাস্তানের হাতে নির্যাতিত?
নাকি শুধু পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নির্যাতনের কথা বলো? তো জুলাই নিয়া ছবি বানাইতে গেলে তোমার জুলাইয়ের গণহত্যা এবং ফ‍্যাসিবাদের ১৬ বছরের লক্ষ লক্ষ ঘটনার কথা মাথায় না আইসা প্রথমেই জুলাইয়ের পরের কথা আসে কেনো?”

এরপর ফারুকী বলেন, “এসব প্রশ্ন আসে কারণ এই ন‍্যারেটিভ কেয়ারফুলি ফোকাস করা হইছে। আমি বলতেছিনা একই ছবিতে দুইটা বিষয় থাকতে পারবে না। আমি শুধু দুইটা মাইন্ডসেটের পার্থক্যটা বোঝার চেষ্টা করতেছি।”

জুলাইয়ের পর থেকেই একটি ‘কোঅরডিনেটেড ন্যারেটিভ’ বা সমন্বিত বয়ান সামনে আনা হয়েছে বলে মনে করেন ফারুকী। তিনি বলেন,“জুলাইয়ের পর থেকে দেখবেন একটা কোঅরডিনেটেড ন‍্যারেটিভ পুশ করা হয়েছে। এটা কারা করেছে, তাদের উদ্দেশ্য কী- এটা আপনারাই বুঝে নেন। তো সেই কোঅরডিনেটেড এফর্টটা ছিলো জুলাইকে পোস্ট জুলাই সময়ের ভালো দিকগুলা বাদ দিয়া ক্রিটিক্যাল দিকগুলার সাথে এটাচ করার প্রাণপণ চেষ্টা করা নানান প্রোপাগান্ডা ন্যারেটিভের মাধ্যমে।”

জুলাই-পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন ইতিবাচক দিক তুলে ধরে ফারুকী বলেন,“জুলাইয়ের পরে যে মানুষ কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে নিজেরাই পুলিশিং করেছে, বাজার মনিটর করেছে, হিন্দু মন্দিরে আক্রমণের ষড়যন্ত্র হচ্ছে অনুমান করে দলবদ্ধভাবে মন্দির পাহারা দিয়েছে, ব‍্যাংকিং খাত সংস্কার এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সফলভাবে কাজ করেছে, লালনের মতো উদার দার্শনিককে জাতীয় পর্যায়ে উদযাপন করা শুরু হয়েছে, গুম বন্ধ হয়েছে, ক্রসফায়ার বন্ধ হয়েছে, বহু আইনি সংস্কার হয়েছে, স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির সূচনা হয়েছে, সবচেয়ে বড় কথা সবগুলো রাজনৈতিক দল মিলে এক হয়ে আন্তরিক আলোচনা করে সংস্কারের পথরেখা ঠিক করার মতো ঐতিহাসিক কাজ করলো, একটা অসাধারণ নির্বাচন হলো- এগুলো নিয়া কোনো আওয়াজ দেখবেন না। এগুলো সব হাওয়া করে দেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা হচ্ছে। তাতে আসলে লাভ নাই। জাতির জীবনের বড় সত্য প্রোপাগান্ডায় হাওয়া হয় না।”

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী অস্থিরতা এবং পরবর্তী সময়ের নানা নেতিবাচক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে ফারুকী প্রশ্ন তোলেন,“মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সরকারী দলের ভয়াবহ নৈরাজ্যের জন্য কি মুক্তিযুদ্ধ ব্যর্থ হয়ে যায়? বা মুক্তিযুদ্ধের নামে ফ‍্যাসিবাদি ষোল বছরে হওয়া গুম, খুন, নৈরাজ্যের জন‍্য মুক্তিযুদ্ধ ব‍্যর্থ হয়? তাহলে জুলাই পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন‍্য জুলাই ব‍্যর্থ হয় কেমনে?”

জুলাই-পরবর্তী ‘মব’ প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন ফারুকী। তিনি বলেন, সব ধরনের মবই নিন্দনীয়- তা জুলাইয়ের আগে, পরে কিংবা ভবিষ্যতে যেকোনো সময়ই হোক। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ফারুকী তার লেখায় স্বাধীনতার পরের কয়েক বছর এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক সহিংসতা ও হামলার উদাহরণ তুলে ধরে প্রশ্ন করেন, সেসব ঘটনাকে কেন ‘মব’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। একইভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে হেলমেট বাহিনী ও হাতুড়ি বাহিনীর হামলা, বাউলদের ওপর নিপীড়ন এবং বিভিন্ন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে হেনস্তা ও হামলার ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি।

তার দাবি, জুলাই-পরবর্তী ঘটনাগুলোকে আলাদাভাবে ‘মব’ হিসেবে চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে জুলাইকে কলঙ্কিত করার একটি প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

তবে জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতার ব্যাখ্যায় ফারুকী বলেন,“ঐ সময় দেশে পুলিশ নাই, প্রশাসন নাই, এমনকি জাতীয় মসজিদের খতিব গেছে পালাইয়া। এই অবস্থায় দেশ চালানো যে কি কঠিন জিনিস ছিলো সেটা আমরা যারা ঐখানে ছিলাম আমরা টের পাইছি। এরকম ভঙ্গুর অবস্থায় বহু শক্তি সুযোগ নেয়। ওতে জুলাই ব‍্যর্থ হয় না, ছোট্ট সোনারা!”

সবশেষে বাংলাদেশের সামনে দীর্ঘ পুনর্গঠন বা ‘রিবিল্ডিং প্রসেস’-এর কথা তুলে ধরেন ফারুকী। তিনি বলেন, দেশকে সামনে উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগোতে হবে। কারা কোন কারণে জুলাইকে ব্যর্থ বলতে চায়, সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।