কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে এবার লেক অন্টারিওর নাম বদলের হুমকি ট্রাম্পের – DesheBideshe

কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে এবার লেক অন্টারিওর নাম বদলের হুমকি ট্রাম্পের – DesheBideshe


টরন্টোর দক্ষিণে দিগন্তজোড়া যে জলরাশি শহরটির পরিচয়ের সঙ্গে মিশে আছে, সেই লেক অন্টারিও এবার কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধের নতুন মঞ্চ। শুল্ক, গাড়ি, ইস্পাত কিংবা বিদ্যুতের সীমা ছাড়িয়ে বিরোধ এবার পৌঁছে গেছে মানচিত্রেও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, লেক অন্টারিওর নাম বদলে ‘Lake America’ করার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ‘গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা’ করছে। কিন্তু যে হ্রদের মাঝখান দিয়েই চলে গেছে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সীমান্ত, তার নাম কি ওয়াশিংটন একাই বদলে দিতে পারে?

মঙ্গলবার সকালে Truth Social-এ ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে লেক আমেরিকা করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে, কারণ আমরা আর অন্টারিওর সঙ্গে খুব বেশি ব্যবসা করব বলে আশা করছি না।’

লেক অন্টারিও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অভ্যন্তরীণ হ্রদ নয়। ১৮ হাজার ৯৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের লেক অন্টারিওর মাঝখান দিয়েই আন্তর্জাতিক সীমান্ত চলে গেছে। উত্তর ও পশ্চিমে কানাডার অন্টারিও, দক্ষিণ ও পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য। টরন্টো, হ্যামিল্টন, কিংস্টন ও ওশাওয়া যেমন এর কানাডীয় তীরে, তেমনি রচেস্টার ও অসওয়েগোর মতো মার্কিন শহর রয়েছে অপর পারে।

ওয়াশিংটনের ক্ষমতার সীমাটাও এখানেই। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তার নিজস্ব ফেডারেল নথি ও মানচিত্রে অন্য নাম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু তাতে কানাডায় লেকটির সরকারি নাম বদলে যাবে না। Canadian Geographical Names Database-এ ‘Lake Ontario’ সরকারি নাম হিসেবেই নথিভুক্ত। ‘Ontario’ নামটিও আধুনিক রাজনৈতিক মানচিত্রের সৃষ্টি নয়। এর শিকড় Iroquois ভাষার ‘kanadario’ শব্দে, যার অর্থ ‘ঝলমলে জল’। ১৬৪১ সালেই ‘Ontario’ নামটির ব্যবহার পাওয়া যায়।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ভৌগোলিক নাম নিয়ে এমন ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ক্ষমতায় ফিরে তিনি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে মার্কিন ফেডারেল ব্যবহারে Gulf of Mexico-এর নাম ‘Gulf of America’ করেন। তবে লেক অন্টারিওর ক্ষেত্রে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। এর বুকের ওপর দিয়েই কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সীমান্ত চলে গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সিদ্ধান্তে সীমান্তের কানাডীয় পাশের সরকারি নাম বদলে যাওয়ার প্রশ্ন নেই।

অটোয়া এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের নাম পরিবর্তনের হুমকিকে পাল্টা কথার লড়াইয়ে পরিণত করেনি। কানাডার বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্ককে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, মার্কিন প্রশাসনের সামাজিকমাধ্যমের পোস্টে প্রতিক্রিয়া না দেওয়াই কানাডা সরকারের নীতি।

লেক অন্টারিওর নাম বদলের হুমকি অর্থনৈতিক কোনো পদক্ষেপের চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কানাডার সবচেয়ে জনবহুল ও শিল্পসমৃদ্ধ প্রদেশের নাম বহনকারী একটি আন্তর্জাতিক হ্রদকে ‘Lake America’ বলার কথা ট্রাম্প এমন সময়ে তুললেন, যখন বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে গেছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে। ফলে শুল্কের বিরোধ এবার শুধু পণ্যের বাজারে নয়, পৌঁছে গেছে একটি যৌথ জলরাশির নাম পর্যন্ত।

লেক অন্টারিও কয়েক শতাব্দীর রাজনৈতিক উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী। যুদ্ধ হয়েছে, সীমান্ত তৈরি হয়েছে, সরকার বদলেছে। কিন্তু হ্রদটি থেকে গেছে দুই প্রতিবেশীর মাঝখানে। আজও সীমান্তের দুই পাশের মানুষ একই জলরাশি ব্যবহার করেন পরিবহন, বাণিজ্য, পানীয় জল, বিনোদন ও জীবিকার জন্য।

ওয়াশিংটনের ফেডারেল মানচিত্রে একদিন হয়তো ‘Lake America’ লেখা হতে পারে। কিন্তু টরন্টোর তীর থেকে যে জলরাশি দেখা যায়, কানাডার সরকারি মানচিত্রে তার নাম লেক অন্টারিও। আর সেই নামের ইতিহাস শুরু হয়েছিল বহু আগে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র নামের রাষ্ট্রটির জন্মেরও আগে।

তথ্যসূত্র:
Reuters
The Associated Press