গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ নয়, স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের আহ্বান | চ্যানেল আই অনলাইন

স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।

শনিবার (২৯ আগস্ট) যশোরে ‘গণমাধ্যম কমিশন: সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে বক্তারা এ আহ্বান জানান।

বক্তারা বলেন, কমিশন গঠনের আগে গণমাধ্যম মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি, আইন বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিকতা বিষয়ের শিক্ষক, গণমাধ্যম উন্নয়ন সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে কমিশনের স্বাধীনতা, কাঠামো, ক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন তারা।

যশোরের দৈনিক লোকসমাজ ও দৈনিক গ্রামের কাগজের যৌথ উদ্যোগে এবং মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) ও ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সাপোর্ট (আইএমএস), ডেনমার্কের সহযোগিতায় এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।

গণমাধ্যম সংস্কারে এমআরডিআইয়ের পাঁচ বছর মেয়াদি অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আয়োজিত সংলাপে বক্তারা বলেন, স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের কাজ গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পেশাগত মান ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই কমিশনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

সংলাপের শুরুতে এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, সরকার স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম কাঠামো গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক। তবে কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে শুরু থেকেই গণমাধ্যমের অংশীজন ও নাগরিকদের মতামত বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ২০২৩ সালে বিএনপির ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা কর্মপরিকল্পনা ও নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক ‘মিডিয়া রেগুলেটরি কাঠামো’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

খসড়া গণমাধ্যম কমিশন আইনে স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের মালিকানা, সার্কুলেশন সংখ্যা প্রকাশ ও অডিটে স্বচ্ছতা এবং সাংবাদিকদের জন্য কার্যকর কোড অব কনডাক্ট প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, জনস্বার্থে সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে এখনই সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তিনি সম্পাদকদের জন্য একটি জাতীয় সম্পাদকীয় গাইডলাইন তৈরির প্রস্তাব দেন।

কামাল আহমেদ বলেন, স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন সাংবাদিকদের পেশাদারিত্ব, সাংবাদিকতার মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে। গণমাধ্যম কমিশন-সংক্রান্ত সর্বশেষ খসড়া আইনকে ভিত্তি করে সরকার কাজ শুরু করতে পারে। এ নিয়ে আলোচনা অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে না যাওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, শুধু কমিশন গঠন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরো সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রতি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার প্রয়োজন।

দৈনিক লোকসমাজের প্রকাশক ও অনুষ্ঠানের সভাপতি শান্তনু ইসলাম সুমিত বলেন, গণমাধ্যম কমিশন গঠনের বিষয়ে তিনি আশাবাদী। তবে কমিশনকেও জবাবদিহির আওতায় রাখতে হবে। কমিশন যেন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের সুরক্ষা নিশ্চিত করে, এমন কাঠামো প্রয়োজন।

দৈনিক লোকসমাজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আনোয়ারুল কবির নান্টু বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের পেছনে সরকার ও গণমাধ্যম মালিক উভয়েরই দায় রয়েছে। ভালো সাংবাদিকতার জন্য সাংবাদিকদের উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, নিয়মিত বেতন-ভাতা, বিজ্ঞাপন নীতিমালায় পরিবর্তন এবং নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।

দৈনিক গ্রামের কাগজের সম্পাদক ও প্রকাশক মবিনুল ইসলাম মবিন বলেন, স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের বিষয়ে জনমত তৈরিতে এ ধরনের আলোচনা আরও হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের মতামত কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সংলাপে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য, কমিশনের কাঠামো ও ক্ষমতা, স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

সভায় যশোরের স্থানীয় পর্যায়ের সম্পাদক, সাংবাদিক, সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষক, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।