বিশেষ প্রতিনিধি: ৫ আগস্টের পর যাত্রা শুরু করা এশিয়া পোস্টের অর্থায়ন এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ফাউন্ডার মাসুদ আলমের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাধিক ফেসবুক পেজে ছড়িয়ে পড়া একই ধরনের পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটিকে শুরুতে বিএনপি, জামায়াত ও জুলাইপন্থীদের ঘনিষ্ঠ মিডিয়া হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এর মূল অর্থায়নের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
পোস্টগুলোতে বলা হয়েছে, ৫ আগস্টের পর নতুন মিডিয়ার অর্থায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। সেখানে অভিযোগ করা হয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কয়েকটি মিডিয়ায় অর্থায়ন করেছেন। বিষয়টিকে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এশিয়া পোস্টও ৫ আগস্টের পর এসেছে উল্লেখ করে পোস্টগুলোতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এটিকে বিএনপি-জামায়াত তথা জুলাইপন্থীদের মিডিয়া হাউস হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল। সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এর উদ্বোধন ও র্যালির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে পরে প্রতিষ্ঠানটির অর্থায়ন নিয়ে ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে বলে পোস্টগুলোতে উল্লেখ করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়েছে, এশিয়া পোস্টের অনলাইন ও প্রিন্ট দৈনিকের অর্থায়ন মূলত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ফাউন্ডার মাসুদ আলমকে সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
মাসুদ আলমের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়েও পোস্টগুলোতে অভিযোগ তোলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংয়ের মাধ্যমে যুব উন্নয়ন থেকে তিনি শত শত কোটি টাকা আয় করেছেন।
তার রাজনৈতিক অবস্থান বোঝাতে একটি পুরোনো বক্তব্যের কথাও পোস্টগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং এতে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন বলে মাসুদ আলম নিজেই একটি টকশোতে বলেছিলেন।
পোস্টগুলোতে আরও দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ থেকে যুব কাউন্সিলের নির্বাচন করে জাহিদ আহসান রাসেলের প্রভাবে তিনি সভাপতি হন। যুব কাউন্সিলের সভাপতি হওয়ার পরও তিনি শত শত কোটি টাকা আয় করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
শরীয়তপুর থেকে আওয়ামী লীগের ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও পোস্টগুলোতে দাবি রয়েছে। দলীয় সুযোগ না পাওয়ার পর তিনি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করেন। সেই নির্বাচনেও নাহিম রাজ্জাক এবং আওয়ামী লীগের প্রভাব দেখানোর অভিযোগ করা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচনে পরাজিত হন বলে পোস্টে উল্লেখ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরের একটি ঘটনাও এসব পোস্টে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়, জাহিদ আহসান রাসেলের লোকজনকে বস্তাভর্তি টাকা দিতে গিয়ে ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দুই দিন পর, উত্তরায় ছাত্র-জনতার হাতে গাড়িসহ আটক হয়েছিলেন মাসুদ আলম। উত্তরাকে ওই পোস্টগুলোতে জুলাইয়ের অন্যতম হট-স্পট হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
পোস্টে আরও দাবি করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তার অ্যাকাউন্ট জব্দ হয়েছিল এবং দুদকের আবেদনে তার স্ত্রীর বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। নানা অভিযোগের পরও অর্থের প্রভাবে তিনি পার পেয়ে যান বলেও সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে।
বর্তমান সরকারের সময়ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে তার প্রভাব রয়েছে বলে পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়েছে। সর্বশেষ একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ২১ কোটি টাকার কাজ মাসুদ আলম পেয়েছেন বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে।
যুব উন্নয়নসহ বিভিন্ন দপ্তরে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি বর্তমান সরকারের দুই প্রতিমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করেন বলেও পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়। তাদের মধ্যে একজনকে তিনি নিজের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ওই দুই প্রতিমন্ত্রীর নাম পোস্টে প্রকাশ করা হয়নি।
এসব অভিযোগের সঙ্গে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যদি এখনও কোটি কোটি টাকার কাজ পান, তাহলে জুলাই আন্দোলনে এত মানুষের প্রাণ দেওয়ার প্রয়োজন কী ছিল। শহীদদের সঙ্গে বেইমানি করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রী যেই হোন, তা মেনে নেওয়া হবে না বলেও পোস্টগুলোতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের যেসব ব্যক্তির জেলে থাকার কথা ছিল, তাদের অনেকে এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
পোস্টগুলোতে ‘গুপ্ত আওয়ামী লীগ’ প্রসঙ্গও আনা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ পরিচয় গোপন রেখে কেউ কেউ ‘সিক্রেট এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করছেন। তাদের বয়কট এবং ব্যবস্থা নিয়ে থামানো না গেলে ভবিষ্যতে তারা বাংলাদেশবিরোধী সিক্রেট এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের প্রসঙ্গ টেনে পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়েছে, তার হত্যাকারীরাও পরিচয় গোপন করে জুলাইপন্থীর বেশে মিশে তাদের ‘মিশন’ সফল করেছিল। এ কারণে জুলাইপক্ষকে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পোস্টগুলোর শেষ বক্তব্যে বলা হয়েছে, ‘আওয়ামী লীগের টাকায় গড়া কোনো মিডিয়া কখনোই জুলাইয়ের হবে না।’
এর আগেও মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক তার সম্পদের তথ্য চেয়ে BFIU, বিভিন্ন ব্যাংক, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেয় এবং ২৫ জুন দুদকের আবেদনে আদালত মাসুদ আলম ও তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন। একই অভিযোগে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ২৯৭ কোটি টাকার ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রকল্পের দরপত্র ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের জন্য সাজানোর কথাও বলা হয়েছিল।

