সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। ভালো হয়েছে। জীবনযাত্রার খরচ বাড়লে বেতন সমন্বয় হওয়া স্বাভাবিক। আমি চাই তারা ভালো থাকুক। আরও ভালো বেতন পাক।
কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। একই বাজারে থাকা বাকি মানুষের কী হবে?
একজন গার্মেন্টস শ্রমিক দেশের রপ্তানি আয় তৈরি করছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ৩৮.৭ বিলিয়ন ডলার। মোট পণ্য রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি এসেছে এই খাত থেকে।
প্রবাসীরা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস। কৃষক খাবার উৎপাদন করেন। ছোট ব্যবসায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ কর্মী প্রতিদিন অর্থনীতিকে সচল রাখেন। রাষ্ট্রের জন্য তাদের অবদান কোনোভাবেই ছোট নয়।
অথচ বাস্তবতা খুব কঠিন। World Bank বলছে, FY26-এ মূল্যস্ফীতি ৮.৫ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। কম আয়ের মানুষের মজুরি সেই হারে বাড়েনি। ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ২০২৫ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১.৪ শতাংশ হয়েছে। শুধু এক বছরেই নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন।
আরও বড় চিন্তার বিষয় আছে। World Bank-এর ২০২৫ সালের Poverty and Equity Assessment বলছে, প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি এমন অবস্থায় আছেন, যেখানে অসুস্থতা, দুর্যোগ বা অন্য কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা তাদের আবার দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। একই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কর্মসংস্থান প্রায় ২০ লাখ কমেছে।
এই সংখ্যাগুলো শুধু অর্থনীতির রিপোর্ট নয়। এগুলো মানুষের রান্নাঘরের হিসাব।
চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ওষুধ, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত, বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের খরচ মেটানোর পর অনেক পরিবারের হাতে কিছুই থাকে না। একজন সরকারি কর্মচারী মূল্যস্ফীতির কষ্ট অনুভব করেন। একই কষ্ট একজন গার্মেন্টস শ্রমিকও অনুভব করেন। একই বাজার একজন কৃষক, রিকশাচালক কিংবা বেসরকারি চাকরিজীবীকেও মোকাবিলা করতে হয়।
পার্থক্য হচ্ছে, সবার আয় বাড়ানোর কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থা নেই।
ব্যবসার অবস্থাও ভালো নয়। World Bank বলছে, বাংলাদেশে private investment দুর্বল এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও চাপের মধ্যে। FY26-এর প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ব্যবসা যদি নিজেই টিকে থাকার লড়াই করে, তাহলে সেই ব্যবসা কর্মীদের বাজারদরের সঙ্গে মিলিয়ে বেতন বাড়াবে কীভাবে?
এখানেই রাষ্ট্রের বড় প্রশ্নটি আসে।
রাষ্ট্র কি শুধু তার নিজের কর্মচারীর ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করবে? নাকি পুরো অর্থনীতিতে এমন পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে শ্রমিকের মজুরি বাড়বে, ব্যবসার আয় বাড়বে, কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন এবং তরুণের চাকরি হবে?
সামাজিক বিজ্ঞানও এই সমস্যাকে শুধু টাকার সমস্যা হিসেবে দেখে না। OECD-এর গবেষণায় বিভিন্ন দেশে আয়ের বৈষম্য এবং মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসের মধ্যে শক্তিশালী নেতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বেশি বৈষম্যের সমাজে সাধারণত মানুষের একে অপরের প্রতি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বাস কম থাকে।
কারণ মানুষ শুধু নিজের আয় দেখে না। সে চারপাশও দেখে।
একজন মানুষ যখন প্রতিদিন দেখেন, তার আয় কমছে, সুযোগ কমছে, সন্তান চাকরি পাচ্ছে না, ব্যবসা টিকছে না, অথচ একটি ছোট অংশ ক্রমাগত নিরাপত্তা ও সুবিধা পাচ্ছে, তখন তার মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হওয়া খুব স্বাভাবিক।
এই অবস্থাটা দীর্ঘদিন চললে সমাজে শুধু দরিদ্রতা বাড়ে না। বিশ্বাস কমে। ক্ষোভ বাড়ে। মানুষ রাষ্ট্রকে নিজের প্রতিষ্ঠান মনে করা বন্ধ করতে শুরু করে।
দেশ কখনো সরকারি চাকরিজীবী এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের হাতে কুক্ষিগত থাকতে পারে না। তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। সরকারি কর্মচারীরা রাষ্ট্রের কাজ করবেন। কিন্তু রাষ্ট্রের মালিক তারা নন।
এই দেশের মালিক সেই শ্রমিকও, যার হাতে তৈরি পোশাক বিদেশে যায়। সেই কৃষকও, যিনি খাবার উৎপাদন করেন। সেই প্রবাসীও, যিনি বিদেশে নিজের জীবন কাটিয়ে টাকা পাঠান। সেই ছোট ব্যবসায়ীও, যিনি নিজের পুঁজি ঝুঁকিতে রেখে কয়েকজন মানুষের চাকরি তৈরি করেন।
তাই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ুক। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পাশেই আরও বড় একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
বাকি মানুষের আয় বাড়বে কীভাবে?

