
হিয়া চলে গেছে। তবু জাইমার আঁকা ছবিতে তারা এখনো পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
🎧অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন
কাগজের পাতাজুড়ে পেন্সিলের আঁচড়। সেখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুই ছোট্ট মেয়ে। দুজনের পরনে ফ্রক, মুখে মিষ্টি হাসি। মাঝখানে একটি বড় লাভচিহ্ন। মাথার ওপর একজনের নাম লেখা—‘হিয়া’, অন্যজনের—‘জাইমা’। আর দুজনের হাত শক্ত করে ধরা।
এটি নিছক কোনো শিশুর আঁকা ছবি নয়। এটি আট বছরের এক শিশুর হৃদয় থেকে উঠে আসা তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুর জন্য ভালোবাসার স্মৃতি।
ছবিটির নিচে কাঁপা কাঁপা শিশুহাতে লেখা— ‘ডিয়ার হিয়া আই লাভ ইউ আই উইল সি ইউ এগেইন’।
কয়েকটি সহজ শব্দ। কিন্তু সেই শব্দগুলোর ভেতরে যেন লুকিয়ে আছে গভীর এক শূন্যতা, বিচ্ছেদের কষ্ট আর আবার দেখা হওয়ার এক সরল বিশ্বাস।
হিয়া আর জাইমা—দুজনের বন্ধুত্ব ছিল ছোটবেলা থেকেই। একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, একসঙ্গে সময় কাটানো, ছবি আঁকা, উপহার দেওয়া—সবকিছুর মধ্যেই ছিল তাদের বন্ধুত্বের উষ্ণতা। পরে স্কুল বদলেছে, বাসা বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি তাদের সম্পর্ক।
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় হিয়া। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অবস্থার অবনতি হলে তাকে নেওয়া হয় আইসিইউতে। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি শিশুটিকে।
বন্ধুর মৃত্যুর খবর যখন জাইমার কাছে পৌঁছায়, তখনও সে বুঝতে পারেনি মৃত্যু মানে কী। স্কুলড্রেস পরেই বাবার হাত ধরে হাসপাতালে ছুটে যায় সে। সেখানে গিয়ে দেখে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু আর কথা বলছে না, হাসছে না, তাকে দেখে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না।
শিশুমনের কাছে মৃত্যু হয়তো তখনও একটি কঠিন অচেনা শব্দ। তাই জাইমা জানতে চেয়েছিল—‘এখন হিয়া কী করবে?’
খায়রাতুন হিয়া ও সুহায়লা জাইমা—দুজনেরই বয়স আট বছর। প্লে গ্রুপ থেকে কেজি পর্যন্ত একই স্কুলে পড়েছে তারা। তখন বাসাও ছিল পাশাপাশি। প্রথম শ্রেণিতে ওঠার পর বদলে যায় স্কুল, বদলে যায় বাসাও। হিয়া পড়ত মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে, আর জাইমা ওয়াইডব্লিউসিএতে।
কিন্তু দূরত্ব বাড়েনি বন্ধুত্বে।

দুই স্কুলে পড়লেও নিয়মিত ভিডিও কলে কথা বলত তারা। জন্মদিন কিংবা পারিবারিক কোনো আয়োজনেও দুই পরিবার একসঙ্গে থাকত। দেখা হলেই একজন আরেকজনের গাল টিপে দিত। কখনো ছবি আঁকত, কখনো উপহার দিত। ছোট্ট দুই শিশুর বন্ধুত্বে ছিল এমনই এক সরল টান।
হিয়ার বাবা মো. খোকন মিয়া বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রকৌশল বিভাগে সায়েন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। গত ২৫ আগস্ট ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হিয়ার মা শাহীনা আক্তার আগারগাঁওয়ের লায়ন্স আই অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে হিয়ার ডেঙ্গু শনাক্ত হলে ২৮ আগস্ট তাকেও একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অবস্থার অবনতি হলে ২৯ আগস্ট হিয়াকে ধানমণ্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। এরপর আর ফিরতে পারেনি আট বছরের শিশুটি।
মা শাহীনা আক্তার বলেন, নিজের চিকিৎসা পুরোপুরি শেষ না করেই মেয়ের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। মেয়ের কথা বলতে গিয়ে ভারী হয়ে আসে তাঁর কণ্ঠ।
তিনি বলেন, ‘আমাদের একমাত্র মেয়ে। চিকিৎসায় তো কোনো গাফিলতি করিনি। মেয়েটা বমি করত। পানিও খেতে পারত না। খিঁচুনি হলো। তারপর সব শেষ।’
হিয়ার বাবা-মায়ের এখন একটাই চাওয়া—আর কোনো পরিবারকে যেন এমন শোকের মধ্য দিয়ে যেতে না হয়। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
জসীম উদ্দীন-মোশফেকা রহমান দম্পতির মেয়ে সুহায়লা জাইমা। হিয়ার মৃত্যুর খবর জাইমা পেয়েছিল স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতির সময়। সেদিন স্কুলে যাওয়ার আগে বন্ধুকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল তার। স্কুলড্রেস পরে তৈরি হচ্ছিল সে। এর মধ্যেই খবর আসে—হিয়া আর নেই।
স্কুলড্রেস পরা অবস্থাতেই বাবা জসীম উদ্দীনের হাত ধরে হাসপাতালে ছুটে যায় জাইমা।
হাসপাতালে বন্ধুকে দেখে বারবার জানতে চাইছিল, এখন হিয়া কী করবে। নিজের ব্যাগে করে নিয়ে যাওয়া প্যাডের কাগজ বের করে সেখানেই পেনসিল দিয়ে আঁকতে শুরু করে সে। আঁকে দুজনের ছবি—হিয়া ও জাইমা। দুজনের হাত ধরা।
ছবির নিচে লেখে, ‘ডিয়ার হিয়া, আই লাভ ইউ সো মাচ। আই উইল সি ইউ এগেইন।’

জাইমার বাবা সাংবাদিক জসীম উদ্দীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ছবি শেষ করে সেটি হিয়াকে দিতে চেয়েছিল জাইমা। পরে অ্যাম্বুলেন্সে কফিনের একটি রশির সঙ্গে ছবিসহ চিরকুটটি বেঁধে দেওয়া হয়।
এর আগে বন্ধুর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া পা দুটি ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল জাইমা।
তিনি বলেন, কাছের কোনো মানুষের মরদেহ দেখার অভিজ্ঞতা জাইমার এটাই প্রথম। হাসপাতালে বন্ধুকে দেখে সে বারবার জানতে চাইছিল, এখন সে কী করবে। হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পরও জাইমার কান্না থামেনি। আমরা নানা উপায়ে তার মন অন্যদিকে ফেরানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু বারবার ফিরে আসছে হিয়ার কথা।
জাইমা জানে না মৃত বন্ধুকে কীভাবে বিদায় বলতে হয়। জানত না কীভাবে শেষবারের মতো বন্ধুকে ভালোবাসার কথা বলতে হয়। তাই নিজের মতো করে আঁকল দুজনকে—হিয়া ও জাইমা। পাশাপাশি দাঁড় করাল। মাঝখানে আঁকল একটি হৃদয়। তারপর বন্ধুর উদ্দেশে লিখল তার মনের কথাগুলো। ভালোবাসি লিখে বিদায় দেওয়ার বদলে লিখল আই উইল সি ইউ এগেইন।
শিশু জাইমার কাছে এটি হয়তো চিরবিদায় নয়। বরং আবার দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি।
একটি ছোট্ট কাগজ, কয়েকটি পেনসিলের দাগ আর কিছু শিশুসুলভ শব্দ—কিন্তু এর মধ্যেই রয়ে গেল দুই বন্ধুর গল্প।
স্কুল আলাদা হয়েছে, বাসা বদলেছে, তবু দুই বন্ধুর সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়নি। শুধু এবার জাইমার আঁকা ছবিটি আর হিয়ার হাতে পৌঁছাল না।
তবু আট বছরের ছোট্ট জাইমা তার বন্ধুর জন্য রেখে গেছে এক অসমাপ্ত বন্ধুত্বের সবচেয়ে নির্মল প্রতিশ্রুতি—‘আই উইল সি ইউ এগেইন।’
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
