
ছবি: সংগৃহীত
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য বড় প্রকল্পকেন্দ্রিক পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ২০৩১ সালের মধ্যে নতুন এলএনজি টার্মিনাল, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আরও একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে পাইপলাইন নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কীভাবে দূর করা হবে, প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো হবে এবং এসব সংস্কারে সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা কী হবে, তা রোডম্যাপে স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করে কাঠামোগত সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
সরকারের কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্কে খুলনা ও বরিশালে দুটি নতুন এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে ৪০০ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ী ও পায়রায় দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আরও একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রকল্প ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নতুন প্রকল্পের আগে বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার অদক্ষতা এবং অতিরিক্ত সক্ষমতার সমস্যা সমাধান জরুরি।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিবছর ৬ শতাংশ হারে বাড়বে ধরে আগামী পাঁচ বছরে চাহিদা ২৫ হাজার ৭১৪ মেগাওয়াটে দাঁড়ানোর হিসাব করা হয়েছে। ১৫ শতাংশ রিজার্ভ মার্জিন ধরেও বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকবে। অথচ এর পরও নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বর্তমানে অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে প্রতি বছর প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার জন্য এ অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকার ৫২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে হলে প্রথমেই একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সংস্কার দরকার।’
তার মতে, বর্তমান সংকটের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি একই সময়ে সংস্কারের কাজও এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
দেশের গ্যাস চাহিদা পূরণে ইতোমধ্যে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। নতুন দুটি এফএসআরইউ নির্মাণ হলে এ নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বিদেশি প্রযুক্তি, অর্থায়ন, সরঞ্জাম ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা থাকবে।
জ্বালানি আমদানিতে দেশের বার্ষিক ব্যয় ইতোমধ্যে ১৩ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও আমদানি বাড়লে এ ব্যয় ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর সঙ্গে ভর্তুকি বাবদ আরও প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন টার্মিনাল নির্মাণের আগে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ভোলায় প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে এ গ্যাস যুক্ত করতে পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অর্থায়ন না পাওয়ায় প্রকল্পটি এগোয়নি।
অন্যদিকে ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে সেখানে নতুন ৪০০ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পাইপলাইনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তা ব্যবহার করা সম্ভব হতো। এতে বিদ্যমান বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাও কাজে লাগানো যেত।
রাশিয়ার অর্থায়নে দেশে নির্মিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। শুরুতে ২০২৪ সালে উৎপাদনে আসার কথা থাকলেও বিভিন্ন জটিলতায় এর উৎপাদন বারবার পিছিয়েছে। চলতি বছরেও কেন্দ্রটি উৎপাদনে আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এ অবস্থায় নতুন আরও একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আর্থিক সক্ষমতা, ঋণ পরিশোধ, পরিচালন ব্যয় ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো আগে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে ব্যয় বাড়ছে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো কীভাবে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা যায়, তা নিশ্চিত করা।
সরকার সৌরবিদ্যুৎ খাতে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এ লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুতে প্রণোদনা এবং নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকে বড় আকারে অগ্রাধিকার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়ানো এবং কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
তার মতে, বিপিডিবি, পিজিসিবি, বিইআরসি, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির মতো প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের জনবল ও ব্যবস্থাপনাকেও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে।
জ্বালানি খাত নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তার সমাধান হিসেবে আরও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ টেকসই পরিকল্পনা নয়।’
তার মতে, বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক মূলত আগামী পাঁচ বছরের অগ্রাধিকার নির্ধারণের একটি গাইডলাইন। তাই এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের বিস্তারিত পরিকল্পনা রাখা হয়নি।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে এ কৌশলগত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পৃথক অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতে হবে। বাস্তবায়নের সময় কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে।
ড. মনজুর হোসেন আরও বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। প্রয়োজন হলে এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও করা হবে।
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
