নীলফামারীর ডিমলায় লালন-পালন করে বড় করা দত্তকপুত্রের বিরুদ্ধে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা মূল্যের সম্পত্তি কৌশলে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন এক বৃদ্ধ। সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর তাকে ঠিকমতো খাবার ও চিকিৎসা না দেওয়া এবং খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার গয়াবাড়ি ইউনিয়নের কলেজপাড়া গ্রামে। এ ঘটনায় ডিমলা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী মো. আমিনুর রহমান (৭০)। অভিযোগে রাকিবুল ইসলাম রাজু (৪২), তার স্ত্রী মোছা. শিউলি বেগম (৩২) এবং শিউলির বাবা মো. দবির উদ্দিনের (৫৫) নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আমিনুর রহমান জানান, তার কোনো সন্তান না থাকায় প্রায় ১৪ বছর আগে রাকিবুল ইসলাম রাজুকে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপর নিজের সন্তানের মতো করে তাকে লালন-পালন করে বড় করেন। পরে তার স্ত্রীর ছোট বোনের মেয়ে শিউলি বেগমের সঙ্গে রাকিবুলের বিয়ে দেন।
আমিনুরের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই রাকিবুল ও শিউলি তাকে সংসার থেকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করতে থাকেন। প্রায় ১২ বছর আগে তারা পরস্পর পরামর্শ করে তাকে অচেতন করার ওষুধ খাওয়ান। এরপর কৌশলে তার সব সম্পত্তি রাকিবুলের নামে লিখে নেওয়া হয়। অভিযোগপত্রে ওই সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
আমিনুর রহমান বলেন, সম্পত্তি লিখে নেওয়ার বিষয়টি জানার পর তাকে ভরণপোষণ ও দেখাশোনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। বরং তাকে বিভিন্নভাবে মানসিক চাপ ও অশালীন আচরণের শিকার হতে হচ্ছে।
অভিযোগকারী আরও জানান, তাকে নিয়মিত ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না। প্রয়োজনীয় ওষুধও কিনে দেওয়া হয় না। ফলে বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি চরম দুর্ভোগে রয়েছেন।
আমিনুর রহমান পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকরি করেছেন। ২০১৬ সালে অবসরে যান তিনি। চাকরি শেষে পাওয়া অবসরকালীন অর্থ পারিবারিক কাজে ও সংসারের প্রয়োজনে ব্যয় করেছেন বলে জানান। বর্তমানে তার হাতে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। সামান্য মাসিক অর্থ দিয়ে সংসার ও চিকিৎসার খরচ চালাতে হচ্ছে।
আমিনুর রহমান বলেন, ‘আমার উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছি। স্ট্রোকজনিত কারণে নিয়মিত থেরাপি নিতে হয়। প্রতি মাসে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়। কিন্তু হাতে টাকা-পয়সা না থাকায় চিকিৎসার খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। বয়স ও স্ট্রোকজনিত কারণে ঠিকমতো হাঁটাচলাও করতে পারি না।’
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, গত ৩ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে রাকিবুল ইসলাম তার স্ত্রী শিউলি বেগমকে আমিনুর রহমানের জন্য রাখা খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে টেবিলে রাখার কথা বলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই খাবার খেলে আমিনুর রহমানের মৃত্যু হতে পারে। বিষয়টি জানতে পেরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন আমিনুর। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি জানান তিনি।
আমিনুর রহমানের দাবি, নিজের সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর তিনি আর্থিকভাবে অসহায় হয়ে পড়েছেন। একদিকে অর্থের সংকট, অন্যদিকে নিয়মিত ওষুধ ও থেরাপির খরচ। এর মধ্যে খাবারে বিষ মেশানোর অভিযোগে নিজের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন তিনি।
আবেগাপ্লুত আমিনুর রহমান বলেন, ‘যাকে নিজের সন্তানের মতো করে লালন-পালন করে বড় করেছি, জীবনের শেষ সময়ে এসে তার কাছ থেকেই এমন আচরণের শিকার হতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। এখন আমার নিজের বলতে কিছুই নেই। চিকিৎসার খরচ চালাতেও কষ্ট হয়। এই বয়সে আমি নিরাপদে বাঁচতে চাই। একটু সুস্থতা চাই।’
ঘটনার পর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পরামর্শে ডিমলা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন আমিনুর রহমান। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন ডিমলা থানার এএসআই শফিউল আলম। তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষের কথা শুনেছি। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গেও কথা বলেছি এবং বিষয়টি ওসি মহোদয়কে জানিয়েছি।’
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের প্রকৃত ঘটনা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
