স্পেনে আগুনে থেমে গেল আলিফের স্বপ্ন

স্পেনে আগুনে থেমে গেল আলিফের স্বপ্ন

অনেক স্বপ্ন নিয়ে মাত্র দুই মাস আগে স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইউসুফ হাসান আলিফ (২৫)। নতুন দেশে ভবিষ্যৎ গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর মাত্র দুই দিন আগে পেয়েছিলেন কাজের অনুমতিও। কিন্তু, সেই নতুন জীবনের শুরুতেই ঘটে গেল মর্মান্তিক পরিণতি। মাদ্রিদের একটি সাইকেল গ্যারেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো আলিফের কফিনবন্দি মরদেহ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে ফিরেছে গাজীপুরের কালীগঞ্জের নিজ গ্রামে।

আইনি প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ১০ সেপ্টেম্বর মাদ্রিদের স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের টিকে-১৩৬০ ফ্লাইটে আলিফের মরদেহ ইস্তাম্বুলের উদ্দেশে রওনা হয়। ইস্তাম্বুল থেকে টিকে-৭৪২ ফ্লাইটে করে শুরু হয় বাংলাদেশের পথে শেষ যাত্রা।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুক্রবার সকাল ৬টা ৫৭ মিনিটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আলিফের মরদেহবাহী বিমান অবতরণ করে। বিমানবন্দরে মরদেহ বুঝে নেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কফিনবন্দি মরদেহ পৌঁছায় কালীগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরগাঁওয়ে গ্রামের বাড়িতে।

আলিফের মৃত্যুর পর তার সহকর্মীদের সঙ্গে থাকা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের একটি বার্তা এখন পরিবারের কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি হয়ে আছে। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে আটকা পড়ে তিনি লিখেছিলেন, “আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে।”এর পর আর কোনো বার্তা আসেনি। থেমে যায় ২৫ বছরের তরুণের জীবন।

গত ৩০ আগস্ট স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটে মাদ্রিদের আরগানসুয়েলা এলাকার পালোস দে লা ফ্রন্তেরা এলাকার কাইয়ে কানারিয়াস সড়কের একটি সাইকেল গ্যারেজে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ওই সময় গ্যারেজের ভেতরে আটকা পড়েন আলিফ। বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট এবং শ্বাসনালিতে মারাত্মক ক্ষতের কারণে তিনি গুরুতর আহত হন।

খবর পেয়ে মাদ্রিদ সিটি কাউন্সিলের ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। দীর্ঘ চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গ্যারেজে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস অপসারণ করা হয়। আগুন পুনরায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সেখানে থাকা অন্যান্য ইলেকট্রিক বাইসাইকেলও বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ঘটনাস্থলেই চিকিৎসকরা আলিফকে মৃত ঘোষণা করেন।

আলিফের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্পেনপ্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। ৪ সেপ্টেম্বর মাদ্রিদের বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে তার জানাজা হয়। সেদিন স্বদেশি প্রবাসীরা কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন আলিফের নিথর দেহ; চোখের জলে জানিয়েছিলেন শেষ বিদায়। এর পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে তার মরদেহ পাঠানো হয় বাংলাদেশে।

শুক্রবার দেশে পৌঁছানোর পর কালীগঞ্জের উত্তরগাঁও উত্তরপাড়া জামে মসজিদে বাদ জুমা আলিফের দ্বিতীয় জানাজা হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

নিহত ইউসুফ হাসান আলিফ কালীগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরগাঁও এলাকার আব্দুল মোতালিব ও রহিমা খাতুন দম্পতির ছেলে। জীবিকার প্রয়োজনে স্পেনে গিয়ে তিনি ফুড ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ করছিলেন।

স্বপ্ন ছিল প্রবাসের আয় দিয়ে নিজের ও পরিবারের ভাগ্য বদলানোর। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে মাত্র দুই মাস এগোতেই জীবন থেমে গেল মাদ্রিদের আগুনে।

শুক্রবার আলিফের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর উত্তরগাঁও এলাকায় তৈরী হয় শোকাবহ পরিবেশ। যে তরুণকে কিছুদিন আগেও হাসিমুখে বিদেশের পথে বিদায় জানিয়েছিলেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা, সেই আলিফই ফিরলেন কফিনবন্দি হয়ে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

প্রতিবেশী ও স্বজনদের অনেকের চোখে এখনও ভাসছে বিদেশ যাওয়ার আগে আলিফের সেই চেনা মুখ। কারও কণ্ঠে আক্ষেপ—আরেকটু সময় পেলেই হয়তো বদলে যেত গল্পটা।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন জানিয়েছেন, শুক্রবার সকালে প্রবাসী বাংলাদেশি ইউসুফ হাসান আলিফের মরদেহ বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। জানাজার পর তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।