
🎧অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব কে পালন করবেন, এ নিয়ে তার সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর দলটির ভেতরে নতুন করে নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে এসেছে। শেখ সেলিমের নাম আলোচনায় আসার পর দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে। তবে দলটির নেতারা বলছেন, নেতৃত্ব নিয়ে কোনো সংকট নেই এবং গঠনতন্ত্রের বাইরে কোনো সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
শেখ হাসিনার মন্তব্যের পর নতুন আলোচনা
সরকারের নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দেন, তার অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠতম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
এরপর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে শেখ সেলিমকে ঘিরে আওয়ামী লীগের ভেতরে বিরোধ ও নেতৃত্বের সংকট তৈরি হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।
তবে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিম এসব তথ্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। কলকাতায় অবস্থানরত নাছিম এ বিষয়ে বিবিসি বাংলার কাছে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
যুক্তরাজ্য থেকে দলের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা সাবেক সংসদ সদস্য মো. হাবিবে মিল্লাতও নেতৃত্ব পরিবর্তনের কোনো আলোচনা হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
তার ভাষায়, শেখ হাসিনাই দলের সভাপতি এবং তিনি দেশে ফেরার কথা বলেছেন। তার অনুপস্থিতিতে অন্য কাউকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে দলীয় পর্যায়ে কোনো আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানেন না।
আওয়ামী লীগের দাবি, নেতৃত্বে সংকট নেই
আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাতও নেতৃত্ব নিয়ে কোনো বিরোধের কথা অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। শেখ হাসিনা দলের সভানেত্রী আছেন এবং থাকবেন। নেতৃত্বে কোনো পরিবর্তন আনতে হলে দলের কাউন্সিলই হবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র ফোরাম।
তার দাবি, শেখ হাসিনা উপস্থিত না থাকা কয়েকটি বৈঠকে সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে শেখ সেলিম সভাপতিত্ব করেছেন। এটিকে দলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের কোনো প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কলকাতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে পরিবর্তন
কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান নেওয়া দলটির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে শুরুতে পারস্পরিক যোগাযোগ সীমিত ছিল।
পরে শেখ হাসিনার উদ্যোগে কলকাতায় দলের একটি অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। পূর্ব কলকাতার টেংরা এলাকায় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার বাসায় নিয়মিত বৈঠক হতে থাকে।
এসব বৈঠকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ কলকাতায় অবস্থানরত নেতারা অংশ নিতেন। কখনো কখনো শেখ হাসিনাও ভার্চুয়ালি এসব বৈঠকে যুক্ত হয়েছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে, সভাপতিমণ্ডলীর সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম কলকাতার নিউটাউন এলাকায় অবস্থান করলেও দীর্ঘ সময় এসব কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন না বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। শেখ সেলিম দলের কয়েকটি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন। তার জ্যেষ্ঠতার কারণে এসব বৈঠকের কিছু তার নিউটাউনের বাসায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেও দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে।
এ নিয়েই দলের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন কলকাতায় থাকা কয়েকজন নেতা।

শেখ সেলিমকে ঘিরে আস্থার প্রশ্ন
কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, শেখ সেলিম প্রায় দুই বছর ধরে কলকাতায় থাকলেও দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন না। ক্ষমতায় থাকার সময়ও দীর্ঘদিন তিনি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে দূরে ছিলেন বলে ওই নেতা দাবি করেন।
এ ছাড়া তার কয়েকজন আত্মীয় বিএনপির নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় রয়েছেন এমন বিষয়ও দলের একটি অংশের মধ্যে তাকে নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি করেছে বলে ওই নেতা মন্তব্য করেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শেখ সেলিমের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শেখ সেলিমকে ঘিরে আলোচনা আরও বাড়ে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার একটি ফেসবুক পোস্টের পর।
বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের লেটারহেড ব্যবহার করে তার নাম ও জাল স্বাক্ষর দিয়ে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে।
তার ভাষায়, ওই বিজ্ঞপ্তিটি ‘মিথ্যা, বানোয়াট ও ষড়যন্ত্রমূলক’।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিজ্ঞপ্তিটিতে দাবি করা হয়, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার প্রস্তুতির মধ্যে শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অবশ্য এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা স্বীকার করা হয়নি।
আওয়ামী লীগে নেতৃত্বের বিরোধের ইতিহাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদ মনে করেন, আওয়ামী লীগের জন্য নেতৃত্বের বিরোধ নতুন কোনো ঘটনা নয়।
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ চরম রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বের বিরোধের জেরে ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে দলটি আওয়ামী লীগ (মিজান) ও আওয়ামী লীগ (মালেক) দুই ভাগে নির্বাচনে অংশ নেয়।
এরপর ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তখন তিনি বিদেশে নির্বাসনে ছিলেন। দল পুনর্গঠনের উদ্যোগের অংশ হিসেবেই তাকে নেতৃত্বে আনা হয়েছিল।
শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরও দলের ভেতরে বিভিন্ন পর্যায়ে বিরোধ ছিল। আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা আব্দুর রাজ্জাক তখন আলাদা রাজনৈতিক দল বাকশাল সক্রিয় রেখেছিলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি বাকশাল বিলুপ্ত করে আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় দল সংস্কারের প্রশ্নে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা সক্রিয় হন।
সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। বরং এর পর শেখ হাসিনার দলের ওপর কর্তৃত্ব আরও শক্তিশালী হয়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি।
এরপর ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত শেখ হাসিনাই ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রধান সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ও দলীয় কাঠামোর কেন্দ্রীয় নেতা।
এবার কি নতুন করে নেতৃত্বের সংকট?
অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদের মতে, দলের মূল নেতৃত্ব অনুপস্থিত থাকলে নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে আসা স্বাভাবিক। বিশেষ করে নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া যদি গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে দলীয় গ্রুপিং ও বিরোধ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ইতিহাসে নেতৃত্ব নিয়ে বিভক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নজির রয়েছে। সে কারণে শেখ সেলিমকে ঘিরে বর্তমান আলোচনা সত্য হলে ভবিষ্যতে তা দলীয় সংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতারা বলছেন, এমন কোনো সংকট নেই। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা এখনও দলের সভানেত্রী এবং নেতৃত্বে কোনো পরিবর্তন আনতে হলে সেটি দলের কাউন্সিলের মাধ্যমেই করতে হবে।
ফলে শেখ সেলিমকে ঘিরে সাম্প্রতিক তৎপরতা আপাতত নেতৃত্ব পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ, নাকি শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে দল পরিচালনার একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা সেটিই এখন আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
