ইরান যুদ্ধের উদ্ধার অভিযান নিয়ে ‘সিক্সটি মিনিটস’-এ দুই সেনাকে আনতে চাপ পেন্টাগনের – DesheBideshe

ইরান যুদ্ধের উদ্ধার অভিযান নিয়ে ‘সিক্সটি মিনিটস’-এ দুই সেনাকে আনতে চাপ পেন্টাগনের – DesheBideshe


ইরান যুদ্ধ

ওয়াশিংটন, ১৩ সেপ্টেম্বর- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তীব্র সামরিক সংঘাতের উত্তাপের মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং পেন্টাগনের রাজনৈতিকভাবে নিযুক্ত কর্মকর্তারা নজিরবিহীন এক প্রচার অভিযানে নেমেছেন। গত এপ্রিল মাসে ইরানের আকাশসীমায় মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর দুই ক্রু সদস্যকে একটি রোমাঞ্চকর অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার করা হয়। বিখ্যাত টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘সিক্সটি মিনিটস’-এর রবিবারের পর্বে সেই উদ্ধার অভিযানের নাটকীয় বিবরণ প্রচারের জন্য এই দুই সেনাকে ক্যামেরার সামনে হাজির করতে শীর্ষ পর্যায় থেকে ব্যাপক চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে পেন্টাগন ও সম্প্রচারমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

শুরু থেকেই পুরো বিষয়টি নিয়ে ওই দুই উদ্ধারপ্রাপ্ত সেনার মধ্যে তীব্র দ্বিধা ও অনিচ্ছা ছিল। এমনকি সামরিক আদেশ দিয়ে তাদের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাধ্য করা হতে পারে বলেও এক সেনা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। অন্যদিকে, যুদ্ধ চলমান থাকায় উদ্ধার অভিযানের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও শ্রেণিবদ্ধ (ক্লাসিফাইড) সামরিক তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েও মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তা সত্ত্বেও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের দফতরের রাজনৈতিকভাবে নিযুক্ত শীর্ষ কর্মকর্তারা শুরু থেকেই দুই ক্রু সদস্যকেই সিবিএসের ক্যামেরার সামনে বসাতে নাছোড়বান্দা ছিলেন।

সেনাসদস্যদের আপত্তির পর পরিস্থিতি সামাল দিতে হেগসেথ নিজে তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সেখানে বাধ্যতামূলক আদেশ দেওয়ার পরিবর্তে তাদের নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এই আলোচনার পর ‘ব্রাভো’ ছদ্মনামের এক পাইলট ক্যামেরার সামনে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হলেও ‘আলফা’ ছদ্মনামের অপর ক্রু সদস্য পুরো প্রতিবেদন থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে এই দুই সেনার পরিচয় প্রকাশ করেনি এবং বার্তা সংস্থা সিএনএনও স্বাধীনভাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।

এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, দিন দিন অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা ইরান যুদ্ধকে ঘিরে হেগসেথ কীভাবে নিজের জয়গাথা তুলে ধরতে এবং জনমত গঠনে নজিরবিহীনভাবে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন।

তবে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল সিএনএনের এই প্রতিবেদনের তীব্র প্রতিবাদ করে পুরো দাবিকে ভিত্তিহীন বলেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই গল্পের মূল চরিত্র ওই দুই সেনাসদস্য এবং সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি তাদের নিজেদের ছিল। তিনি আরও বলেন, পেন্টাগন এই কার্যক্রমের নিরাপত্তা, তথ্যের উৎস এবং কৌশল রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে। এর বিপরীতে যেকোনো দাবি পুরো সামরিক বাহিনীর অবদানকে খাটো করে দেখার শামিল।

গত এপ্রিলে অভিযানের পরপরই সিএনএনসহ বিশ্বের বড় বড় গণমাধ্যম ওই ক্রু সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিতে প্রতিযোগিতায় নামে। সিবিএস নিউজের ২৫ বছরের অভিজ্ঞ প্রযোজক কিথ শারম্যান উদ্ধারের দিন থেকেই তার সামরিক পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। সিবিএস নিউজের প্রধান সম্পাদক বারী ওয়েইস তার নিউজরুমকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, এই ক্রু সদস্যদের সাক্ষাৎকার নেওয়াই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এই এক্সক্লুসিভ অ্যাক্সেস পেতে বারী ওয়েইস নিজে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কয়েক মাসের টানাপোড়েন এবং সিবিএসের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক রদবদলের পর মে মাসে প্রস্তাবিত পর্বটি শেষ পর্যন্ত নতুন মৌসুমের প্রথম পর্ব হিসেবে চূড়ান্ত হয়। এ বিষয়ে সিবিএস আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

পেন্টাগনের ইতিহাস অনুযায়ী, বিভিন্ন সাহসিকতার গল্প নিয়ে হলিউড বা গণমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করার জন্য আলাদা একটি দফতর রয়েছে। তবে চলমান যুদ্ধের মধ্যে এত বিস্তারিতভাবে ঘটনা প্রকাশের বিষয়টি সামরিক বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করেছে। রবিবারের বিশেষ পর্বে ইরানে চালানো উদ্ধার অভিযানের প্রতিটি মুহূর্ত তুলে ধরার কথা রয়েছে। বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পরপরই পাইলটকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ওয়েপন সিস্টেম অফিসার বা অপর ক্রু সদস্যকে ইরানি বাহিনীর চোখ এড়িয়ে এক দিনের বেশি সময় পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছিল। মাত্র একটি পিস্তল, যোগাযোগ যন্ত্র এবং ট্র্যাকিং বিকন নিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭ হাজার ফুট উঁচু দুর্গম পাহাড়ে ওঠার পর মার্কিন কমান্ডো দল বোমাবর্ষণ করে এলাকাটি শত্রুমুক্ত করে তাকে উদ্ধার করে।

সামরিক বাহিনীর একাংশের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে যে হেগসেথ তার দফতরের রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণে সেনাসদস্যদের অসীম সাহসিকতাকে ব্যবহার করছেন। সামরিক কৌশল শত্রুপক্ষের কাছে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন শেষ পর্যন্ত এই পর্বে অংশ নিতে সম্মতি দেন। তবে তার মুখপাত্র জোসেফ হোলস্টেড কোনো নামহীন সূত্রের বক্তব্যের জবাব না দিয়ে স্পষ্টভাবে বলেন, মার্কিন যৌথ বাহিনী তার কোনো সদস্যকে শত্রুর মুখে ফেলে আসবে না—এটাই এই খবরের মূল সত্য।

পুরো সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়াটি সফল করতে পেন্টাগনের ভেতরে হেগসেথের সাবেক ফক্স নিউজের প্রযোজক এবং বর্তমানে প্রতিরক্ষা দফতরের সিনিয়র উপদেষ্টা টামি রাডাবফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সিবিএসের প্রকাশিত প্রথম প্রচার ক্লিপে দেখা যায়, উপস্থাপিকা নোরা ও’ডনেল নীরব হয়ে বসে থাকা সেনা ‘ব্রাভো’কে জিজ্ঞেস করছেন, ‘আপনার কি কখনো মনে সন্দেহ জেগেছিল যে মার্কিন সামরিক বাহিনী আপনাকে উদ্ধার করতে আসবে না?’ এরপরই ভয়েসওভারে রবিবারের ‘সিক্সটি মিনিটস’-এর নতুন মৌসুমের গ্র্যান্ড প্রিমিয়ারের বার্তা ভেসে ওঠে।

এস এম/ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬