এআইয়ের লাগাম না টানলে ‘সবাই মারা যেতে পারি’

এআইয়ের লাগাম না টানলে ‘সবাই মারা যেতে পারি’

গবেষকদের মধ্যে। সম্ভাবনার পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত বিকাশের কারণে একসময় এ প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন এআই নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন এআই গবেষণাপ্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন। তার দাবি, এআই যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ব।

এআই যুগে টিকে থাকতে যা করবেন
২৭ বছর বয়সী কক্সন অ্যানথ্রোপিক থেকে পদত্যাগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে একটি বক্তব্য দেন। সেটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর বিবিসির সাথে কথা বলেন তিনি। সেখানে কক্সন সতর্ক করে বলেন, এআইয়ের অগ্রগতির গতি কমানো না হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে সবাই মারা যাওয়ার মতো বিপর্যয়ও ঘটতে পারে।

কক্সনের মতে, এআইয়ের কারণে মানবজাতির জন্য চরম বিপর্যয় কীভাবে ঘটতে পারে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে তিনি আশঙ্কা করছেন, বর্তমান গতিতে প্রযুক্তিটির বিকাশ চলতে থাকলে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই বড় ধরনের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

এদিকে অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইও এআইয়ের উন্নয়নের গতি কিছুটা কমিয়ে নিরাপত্তার বিষয়টিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও তার এই আহ্বানের উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। তবে ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্কও এআই উন্নয়নে আরও সতর্কতা, কঠোর নিয়মনীতি ও স্বাধীন তদারকির পক্ষে মত দিয়েছেন।

শনিবার প্রকাশিত এক নিবন্ধে আমোদেই বলেন, এআই প্রযুক্তির অগ্রগতি থামিয়ে দেওয়ার কোনো প্রশ্ন নেই। তবে এর সাথে যুক্ত ঝুঁকিগুলো অত্যন্ত গুরুতর। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ও এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতির জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এআই ব্যবস্থার নিজেকে নিজে উন্নত করার সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। একপর্যায়ে বিপুলসংখ্যক স্বয়ংক্রিয় এআই প্রোগ্রাম বা বট একসাথে কাজ করে অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে। এমনকি তারা পুরো ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

অ্যানথ্রোপিকে যোগ দেওয়ার আগে ওপেনএআইয়ে কাজ করা কক্সন এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বানকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তার মতে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আলোচনা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চীনকেও এ ধরনের উদ্যোগের সাথে যুক্ত করা প্রয়োজন।

অ্যানথ্রোপিকের এক মুখপাত্র বলেন, এআইয়ের বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি এর নজিরবিহীন ঝুঁকির বিষয়টিও প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই প্রকাশ্যে তুলে ধরেছে। এসব ঝুঁকি কমাতে প্রতিষ্ঠানটি শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুসরণ করে নতুন মডেল তৈরি করছে।

তিনি আরও বলেন, এআই মডেলগুলো কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য গবেষণার ক্ষেত্রেও অ্যানথ্রোপিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এআই যেন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় এবং স্বাধীনভাবে এর সক্ষমতা যাচাই করা যায়, সে জন্য মডেলগুলো কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়।

সম্প্রতি সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক অ্যানথ্রোপিক একটি ‘থ্রেট ইন্টেলিজেন্স’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বিভিন্ন অপশক্তি কীভাবে তাদের ক্লড এআই মডেল ব্যবহার করে অস্ত্র তৈরি, সাইবার হামলা, নজরদারি ও জালিয়াতির চেষ্টা করছে, তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

এআই এজেন্টগুলোর সক্ষমতা নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওপেনএআইয়ের কিছু নিয়ন্ত্রণহীন এআই এজেন্ট একটি জার্মান ওয়েবসাইট হাইজ্যাক করে সেটিকে অন্য এআই এজেন্টগুলোর ব্যবহারের জন্য একটি বুলেটিন বোর্ডে পরিণত করেছিল। এর আগে জুলাইয়ে উন্মুক্ত কোড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসেও একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।

প্রযুক্তিবিদদের আশঙ্কা, এআই মডেলের সক্ষমতা যত বাড়ছে, এর অপব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিও তত বাড়ছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে এআই নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন ও নীতিমালা তৈরির দাবি জোরালো হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও এআই নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে এ প্রযুক্তি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

এআইয়ের উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের প্রতি এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

স্যান্ডার্স বলেন, দারিও আমোদেই, স্যাম অল্টম্যান ও ইলন মাস্কের এআই উন্নয়নের গতি ধীর করার আহ্বান একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। তবে শুধু আহ্বান নয়, এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বিশ্বের বড় শক্তিগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।