জুলাই মামলায় গ্রেপ্তার মর্তুজা পলাশের বিরুদ্ধে মাদক-অস্ত্র ব্যবসার অভিযোগ

জুলাই মামলায় গ্রেপ্তার মর্তুজা পলাশের বিরুদ্ধে মাদক-অস্ত্র ব্যবসার অভিযোগ

সাইফুল ইসলাম : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলায় গ্রেপ্তার অভিনেতা মর্তুজা পলাশকে ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে মাদক, অস্ত্রের অবৈধ ব্যবসা ও নারী পাচারসহ নানা অভিযোগ। মানিকগঞ্জে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে তিনি এসব কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন—এমন দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

তবে মর্তুজা পলাশের পরিবারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, ব্যবসা ও অভিনয় থেকে অর্জিত অর্থেই তাঁর সম্পদ গড়ে উঠেছে এবং মাদক-অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পারভেজ ব্যাপারী হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে মর্তুজা পলাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, নেপাল থেকে দেশে ফেরার সময় ২৮ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সিআইডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে এক দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর রিমান্ড শেষে সিআইডি আদালতকে জানায়, হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং অন্য পলাতক আসামিদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ব্যবসার আড়ালে অপরাধের অভিযোগ
মর্তুজা পলাশের পৈতৃক বাড়ি মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার জমদুয়ারা (তেতুলিয়া) এলাকায়। বর্তমানে তিনি ঢাকার মিরপুরে বসবাস করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মানিকগঞ্জে ‘জেপি গ্রুপ’ ও ‘জেপি প্লাজা’সহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন পলাশ। একই সঙ্গে নিজেকে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ‘জেপি টিভি’ ও ‘জেপি নিউজ’ নামে প্ল্যাটফর্মও পরিচালনার উদ্যোগ নেন বলে জানা গেছে।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকায় অস্ত্র সরবরাহের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।

সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, কয়েক বছরের ব্যবধানে মর্তুজা পলাশের বিপুল সম্পদ গড়ে ওঠে। মানিকগঞ্জ শহরে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মার্কেট কেনা এবং সদর উপজেলার কেওরজানি-বার্তা এলাকায় কয়েক কোটি টাকা দিয়ে একটি বাংলোবাড়ি কেনার তথ্যও স্থানীয়ভাবে আলোচিত।

‘পলাশ বাড়ি’ নামে পরিচিত ওই বাড়িতে রাতভর পার্টি, মাদক সেবন এবং নারীদের উপস্থিতি দেখা যেত—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় এক বাসিন্দা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বাসিন্দা বলেন, “ঢাকা থেকে বিভিন্ন অতিথিকে নিয়ে প্রায়ই সেখানে রাতভর পার্টি হতো। মাদক সেবনসহ বিভিন্ন বয়সী নারীদেরও সেখানে দেখা যেত।”

পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্যে একাধিক অভিযোগ
মানিকগঞ্জ থেকে সম্প্রতি ঢাকায় বদলি হওয়া এক পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মর্তুজা পলাশের বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালান, অস্ত্র ভাড়া, ডাকাতির কাজে অস্ত্র সরবরাহ, মাদক ও নারী ব্যবসাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ছিল।

ওই কর্মকর্তার দাবি, ‘শিমুল’ নামে এক সহযোগীর মাধ্যমে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন পলাশ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এক ওসি তাতে বাধা দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।

প্রতিবেশিদের মনও সন্দেহ
আলী মুর্তজা পলাশের পৈতৃক নিবাস শিবালয়ের জমদুয়ারা এলাকার এক সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এক যুগ আগেও পলাশ পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটা সচ্ছল ছিল না। তাঁর বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক; পাশাপাশি পীর হিসেবে স্থানীয় কিছু ভক্ত-মুরিদও ছিল। পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস ছিল গ্রামের কৃষিজমি। তাঁর ভাষ্য, সেই সময়ের একটি মধ্যবিত্ত পরিবার কয়েক বছরের ব্যবধানে কীভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে উঠল, সেটিই তাঁর কাছে বড় প্রশ্ন। তবে এলাকায় পলাশ পরিবারকে সামাজিকভাবে ভালো মানুষ হিসেবেই পরিচিত বলে জানান তিনি। বিশেষ করে স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে দান-খয়রাত করার কারণে এলাকায় তাঁদের একটি ইতিবাচক সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

ওমর ফারুকের সঙ্গে সম্পর্ক
মর্তুজা পলাশের সঙ্গে ঘিওরের ওমর ফারুকের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও স্থানীয়ভাবে আলোচিত। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঘিওরের বৈন্যাপ্রসাদ এলাকা থেকে ওমর ফারুককে সেনাবাহিনী আটক করে। তাঁর কাছ থেকে একটি ৯ এমএম বিদেশি পিস্তল, ১৪ পিস ইয়াবা ও ২৫০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের কথা জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয় এবং অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা হয়।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, ওমর ফারুক মর্তুজা পলাশের বাল্যবন্ধু এবং তাঁর মাধ্যমে অস্ত্রের কারবার পরিচালিত হতো। তবে ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় মর্তুজা পলাশের সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো তথ্য প্রতিবেদকের হাতে থাকা প্রকাশিত নথিতে পাওয়া যায়নি।

গ্রেপ্তারের পর কারাগারে থাকাবস্থায় অস্ত্র কেনাবেচার একটি ডিল চূড়ান্ত করতে অসুস্থতার অজুহাত তৈরি করে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং সেখানে অবস্থানকালে আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করেন ওমর ফারুক। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি অপরিচিত কয়েকজন ব্যক্তিকেও তার সঙ্গে দেখা করতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের সঙ্গে অস্ত্র, অর্থ ও বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। সেসময় আশপাশের বেডে চিকিৎসাধীন কয়েকজন রোগী জানান, একপর্যায়ে ওই ব্যক্তিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেন ওমর ফারুক।

সিঙ্গাপুরে সম্পদের দাবিও
জেলার একজন রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি দাবি করেন, সিঙ্গাপুরেও মর্তুজা পলাশ বিপুল সম্পদ গড়েছিলেন। তাঁর দাবি, সেখানে বাড়ি ও ব্যাংকে অর্থ থাকার তথ্য ছিল এবং সম্পদের বৈধ উৎসের প্রমাণ দিতে না পারায় সেগুলো দেশটির কর্তৃপক্ষ বাজেয়াপ্ত করেছে।

পরিবারের দাবি—‘অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য’
মর্তুজা পলাশের ভাই হাসিবুল হাসান পলাশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষ থেকেই অর্থবিত্তের মালিক। আমার দাদা শিবালয়ের প্রথম হাজী। আমার বাবা স্কুলশিক্ষক ছিলেন এবং পীর ছিলেন। আগে থেকেই আমাদের জমিজমা ও সম্পদ ছিল। মুর্তজা পলাশ দীর্ঘদিন ধরে অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যবসা করছেন। ব্যবসার মাধ্যমেই তাঁর অর্থ-সম্পদ বেড়েছে।”

ওমর ফারুকের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, “ওমর ফারুক তাঁর বাল্যবন্ধু—এটা ঠিক। কিন্তু মাদক বা অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে পলাশ ভাইয়ের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যারা এসব কথা বলছে, তা সম্পূর্ণ অসত্য।”

সিঙ্গাপুরে সম্পদের অভিযোগও অস্বীকার করে হাসিবুল হাসান বলেন, “সিঙ্গাপুরে ভাইয়ের কোনো সম্পদ নেই।”

মর্তুজা পলাশ বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ের পারভেজ ব্যাপারী হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত মাদক, অস্ত্র, নারী পাচার, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অন্যান্য অভিযোগের সত্যতা এখন আইনগত তদন্ত ও প্রমাণের ওপর নির্ভর করছে।