আইএইএর পরমাণু প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের অবস্থান অপরিবর্তনীয় বলল উত্তর কোরিয়া – DesheBideshe

আইএইএর পরমাণু প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের অবস্থান অপরিবর্তনীয় বলল উত্তর কোরিয়া – DesheBideshe


উত্তর কোরিয়া

পিয়ংইয়ং,১৯ সেপ্টেম্বর- আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) গৃহীত একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে উত্তর কোরিয়া। ওই প্রস্তাবে দেশটির পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির সমালোচনা করা হয়েছে। তবে পিয়ংইয়ং বলেছে, পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে তাদের অবস্থান ‘অপরিবর্তনীয়’ এবং নিজেদের পরমাণু প্রতিরোধ সক্ষমতার মাধ্যমে তারা এই অবস্থান সুরক্ষিত রেখেছে।

শনিবার উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ অবস্থান জানিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) বিবৃতিটি প্রকাশ করেছে।

উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্যোগে তৈরি আইএইএর এই ‘প্রস্তাব’ উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থানে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

উত্তর কোরিয়ার সরকারি নাম ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া (ডিপিআরকে) উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শত্রুভাবাপন্ন শক্তিগুলো’ চলতি সপ্তাহে আইএইএর সাধারণ সম্মেলনকে ব্যবহার করে পিয়ংইয়ংয়ের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করার চেষ্টা করছে।

আইএইএর বিরুদ্ধে ‘দ্বৈত নীতি’র অভিযোগ

আলাদা এক বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জংও আইএইএর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থাটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেছেন।

কিম ইয়ো জং বলেন, আইএইএর ‘পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও দ্বৈত নীতি’ আন্তর্জাতিক পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ ব্যবস্থার সংকটের অন্যতম মৌলিক কারণ।

তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রকাশ্য পরমাণু বিস্তার কার্যক্রম’ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ‘পরমাণু-চালিত সাবমেরিন চালুর পরিকল্পনা’ নিয়ে আইএইএ চোখ বন্ধ করে আছে। অথচ উত্তর কোরিয়ার ভাষায়, আত্মরক্ষামূলক ও বৈধ পরমাণু কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংস্থাটি জোরপূর্বক একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।

উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের দাবির বিরোধিতা করে আসছে। পিয়ংইয়ংয়ের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক হুমকি মোকাবিলায় পরমাণু অস্ত্র তাদের আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজন।

অস্ত্র কারখানা পরিদর্শনে কিম

এদিকে কেসিএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহে কিম জং উন টানা তিন দিন উত্তর কোরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অস্ত্র ও গোলাবারুদ কারখানা পরিদর্শন করেছেন। এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে দেশটির সামরিক উৎপাদন সক্ষমতার ওপর পিয়ংইয়ংয়ের গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর রুশ সহায়তায় উত্তর কোরিয়া তাদের সামরিক সক্ষমতার আধুনিকায়ন ও পুনর্গঠনে জোর দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে মোতায়েন করা উত্তর কোরিয়ার সেনারা সেখানে যে যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, সেটিও পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক সংস্কারে ভূমিকা রাখছে বলে তারা মনে করেন।

উত্তর কোরিয়া অবশ্য রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনার মুখে রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সেনা মোতায়েন এবং অস্ত্র সহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

প্রচারযুদ্ধে নতুন কৌশলের নির্দেশ

সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি আদর্শিক ও প্রচার কার্যক্রমেও নতুন কৌশলের ওপর জোর দিয়েছেন কিম জং উন।

শুক্রবার পিয়ংইয়ংয়ে প্রচারকর্মীদের একটি প্রশিক্ষণ অধিবেশনে বক্তব্য দেন উত্তর কোরিয়ার নেতা। কেসিএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়, আধুনিক ‘আদর্শিক যুদ্ধ’ পরিচালনায় পুরোনো পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি না করে নতুন, সৃজনশীল ও আক্রমণাত্মক কৌশল নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় প্রচার ও আদর্শিক প্রচারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশটির নেতৃত্ব নিয়মিতভাবে জনগণকে সরকারের নীতি ও সামরিক সক্ষমতার প্রতি সমর্থন জোগাতে প্রচারকর্মীদের নির্দেশ দিয়ে থাকে।

একই সময়ে ওয়াশিংটন-সিউলের সংলাপের আগ্রহ

আইএইএর প্রস্তাব নিয়ে পিয়ংইয়ংয়ের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং সম্ভাব্য সংলাপের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।

শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপ চান। সম্ভাব্য আলোচনার পথ তৈরি করতে সিউল কাজ করবে বলেও জানান তিনি।

প্রথম মেয়াদে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে নজিরবিহীন সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ তৈরি করেছিলেন ট্রাম্প। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুই নেতার মধ্যে তিন দফা বৈঠক হলেও পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নে কোনো স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

এখন দ্বিতীয় মেয়াদে সেই যোগাযোগ আবারও সক্রিয় করার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। গত মাসে তিনি জানান, চলতি বছরের শেষের দিকে কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

ট্রাম্প আরও বলেন, কিমের সঙ্গে ‘ভালো সম্পর্ক রাখা’ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, উত্তর কোরিয়ার কাছে বর্তমানে ৫৭টি ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ পরমাণু অস্ত্র রয়েছে।

তবে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। দেশটি তার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করে না। ফলে ট্রাম্পের উল্লেখ করা সংখ্যাটিও প্রকাশ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো হিসাব নয়।

এদিকে একদিকে উত্তর কোরিয়া তাদের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া সম্ভাব্য সংলাপের কথা বলছে। ফলে পিয়ংইয়ংয়ের পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে চাপ ও কূটনৈতিক যোগাযোগ—দুই ধারাই একই সঙ্গে এগিয়ে চলেছে।

এস এম/ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬