অপ্রতিমের নির্মম মৃত্যুর পর যতই চিন্তা করছি, ততই ভয়, কষ্ট আর ক্ষোভ বাড়ছে। এটা শুধু অপ্রতিমের ঘটনা হলে হয়তো বিচ্ছিন্ন একটা হত্যাকাণ্ড বলা যেত। কিন্তু ঘটনা তো একটা নয়। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও শিশু নিখোঁজ হচ্ছে, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, ছেলেশিশু বলাৎকারের শিকার হচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে, খুন হচ্ছে। কোথাও আবার নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুর লাশ পাওয়া যাচ্ছে। নিজের সন্তান থাকলে এসব খবর এখন আর শুধু খবর মনে হয় না।
শুধু নিখোঁজের হিসাবটা দেখেন। Police Headquarters-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ১৫,৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার রিপোর্ট হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩,৬৭৯ জন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত ২,০৩৮ শিশুর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে ১,৯৭০ জনের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছর। ৬৮ জনের বয়স ১০ বছরের নিচে।
আগের বছরগুলোর সংখ্যাও ভয় ধরানোর মতো। ২০২৩ সালে ১৭,৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬,৪১৪টি এবং ২০২৫ সালে ২২,৫৫০টি শিশু নিখোঁজসংক্রান্ত GD হয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪৯০ শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯৫ শিশু মারা গেছে। ৫১ শিশু শারীরিক নির্যাতনের পর মারা গেছে। ৪০ শিশু পরিবারের ভেতরেই হত্যার শিকার হয়েছে। ২১ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে ১৯২ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৪ জন ছেলেশিশু। ১৯৫ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৫৯টিতে।
ছেলেশিশুদের বলাৎকার এবং যৌন নির্যাতনের খবরও একের পর এক আসছে। বিশেষ করে বিভিন্ন মাদ্রাসা এবং আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘটনা আমাকে বেশি ভাবায়। বাবা-মা সন্তানকে সেখানে রেখে আসেন পড়াশোনার জন্য, মানুষ হওয়ার জন্য। সেই জায়গায় সন্তান নিরাপদ আছে কি না, সেটাও যদি প্রতিদিন চিন্তা করতে হয়, তাহলে একজন বাবা-মা বিশ্বাস করবে কাকে?
স্কুলের ক্ষেত্রেও একই কথা। শিশু নির্যাতনকারী সব সময় রাস্তার অচেনা কোনো মানুষ নয়। শিক্ষক হতে পারে, হুজুর হতে পারে, আত্মীয় হতে পারে, প্রতিবেশী হতে পারে, খুব পরিচিত কেউও হতে পারে। UNICEF-ও এ বছর বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে নির্মম ও যৌন সহিংসতার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তারা স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র, এলাকা এবং শিশুদের থাকার জায়গায় নিরাপত্তা ও জবাবদিহি বাড়ানোর কথা বলেছে।
এই জায়গায় সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করা। একটা শিশু খুন হওয়ার পর আসামি ধরলাম, মামলা হলো, কয়েকদিন আলোচনা হলো, তারপর সবাই ভুলে গেল, এভাবে চলতে পারে না। এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে যেন অপরাধ করার আগে অপরাধী ভয় পায়।
আর শিশু নিখোঁজ হলে আমাদের বর্তমান ব্যবস্থাটাও বদলাতে হবে। বাংলাদেশে জরুরি ভিত্তিতে একটি National Child Emergency Alert System দরকার।
আমেরিকায় AMBER Alert আছে। কোনো শিশু অপহৃত হয়েছে এবং তার জীবন ঝুঁকিতে আছে বলে পুলিশ মনে করলে খুব দ্রুত শিশুটির তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। মানুষের মোবাইলে Emergency Alert যায়। TV, radio, highway sign এবং অন্যান্য মাধ্যমেও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত AMBER Alert-এর কারণে ১,৩১২ শিশু উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে ২৫২ শিশুর উদ্ধারে মোবাইলের Wireless Emergency Alert সরাসরি ভূমিকা রেখেছে।
নেদারল্যান্ডসে আবার ঝুঁকি বুঝে আলাদা Alert দেওয়া হয়। শিশুর জীবন সরাসরি ঝুঁকিতে থাকলে AMBER Alert। গুরুতর উদ্বেগ থাকলে Missing Child Alert। স্থানীয় পর্যায়ের ঘটনায় আশপাশের মানুষকেও খোঁজার কাজে যুক্ত করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার Queensland-এও শিশু অপহরণ বা সন্দেহজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় AMBER Alert ব্যবহার করা হয়। পুলিশ তখন TV, radio, online media, social media, transport system এবং electronic road signs ব্যবহার করে দ্রুত শিশুটির তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।
বাংলাদেশে কেন এমন ব্যবস্থা থাকবে না?
একটা শিশু সন্দেহজনকভাবে নিখোঁজ হলে প্রথম কয়েক ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তখন বাবা-মাকে থানায় বসিয়ে রাখা যাবে না। এক থানা থেকে আরেক থানায় পাঠানো যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে CCTV দেখতে হবে। প্রয়োজনীয় digital evidence সংগ্রহ করতে হবে। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, airport এবং border point-এ তথ্য পাঠাতে হবে।
ঝুঁকি বেশি হলে নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের মোবাইলে Emergency Alert যেতে হবে। শিশুর ছবি, বয়স, শেষ কোথায় দেখা গেছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সেখানে থাকবে। একই তথ্য TV, online news media, railway station, bus terminal, airport, border point এবং highway display-তে দিতে হবে। একটা শিশুকে তখন শুধু তার বাবা-মা আর পুলিশ খুঁজবে না, পুরো এলাকার মানুষ খুঁজবে।
স্কুল, মাদ্রাসা, orphanage, hostel এবং আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও কঠোর নিয়ম দরকার। নিয়মিত inspection করতে হবে। হঠাৎ করেও inspection করতে হবে। শিশুদের সঙ্গে যারা সরাসরি কাজ করবে, তাদের পরিচয় এবং আগের record যাচাই করতে হবে। কোনো শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানের সম্মান বাঁচানোর নামে ঘটনা চাপা দেওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না।
শিশুদেরও ছোটবেলা থেকে নিজের শরীরের নিরাপত্তা শেখাতে হবে। কোন স্পর্শ স্বাভাবিক, কোনটা নয়, কেউ খারাপভাবে স্পর্শ করলে কী করবে, কাকে বলবে, কোথায় সাহায্য চাইবে, এসব ছেলে-মেয়ে সবাইকে শেখাতে হবে।
আর একটা জায়গায় বাবা-মাকে খুব সতর্ক থাকতে হবে। সন্তান হঠাৎ চুপ হয়ে যাচ্ছে কেন, কোনো মানুষকে দেখলে ভয় পাচ্ছে কেন, স্কুল বা মাদ্রাসায় যেতে চাইছে না কেন, এসব জানতে হবে। শিশু যদি কোনো শিক্ষক, হুজুর, আত্মীয় বা পরিচিত মানুষের বিরুদ্ধে কিছু বলে, আগে তার কথা শুনতে হবে। পরিবারের সম্মান বা প্রতিষ্ঠানের সম্মানের জন্য শিশুকে চুপ করানো যাবে না।
আমাদের নিজেদের ঘরেও সমস্যা আছে। UNICEF-এর ২০২৫ সালের MICS অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৫.৭ শতাংশ শিশু আগের এক মাসে কোনো না কোনো ধরনের সহিংস শাসনের শিকার হয়েছে। আমরা এখনো অনেক সময় শিশুকে মারধর, ভয় দেখানো আর অপমান করাকে স্বাভাবিক শাসন মনে করি।
শিশু হত্যা, ধর্ষণ, বলাৎকার, অপহরণ এবং গুরুতর নির্যাতনের মামলার তদন্ত দ্রুত করতে হবে। এসব মামলার জন্য দক্ষ তদন্তকারী, forensic সুবিধা এবং শক্তিশালী Child Protection ব্যবস্থা দরকার। বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে অপরাধীর মধ্যে আইনের ভয় থাকবে না।
আমি আমার সন্তানকে ঘরে তালা দিয়ে রাখতে পারব না। তাকে স্কুলে যেতে হবে। মাঠে খেলতে হবে। বন্ধুদের সঙ্গে বের হতে হবে। স্বাভাবিকভাবে বড় হতে হবে।
একজন বাবা-মায়ের চাওয়া খুব বেশি নয়। সন্তান সকালে বের হলে সন্ধ্যায় জীবিত বাসায় ফিরবে। স্কুলে গেলে নিরাপদ থাকবে। মাদ্রাসায় দিলে তার নিরাপত্তা নিয়ে সারাক্ষণ ভয় পেতে হবে না। নিখোঁজ হলে রাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গে তাকে খুঁজতে নামবে।
এইটুকু নিরাপত্তা যদি রাষ্ট্র দিতে না পারে, তাহলে ভয়টা শুধু কোনো একটি পরিবারের মধ্যে থাকে না। সন্তান ঘর থেকে বের হওয়ার পর সে ফিরে না আসা পর্যন্ত বাবা-মায়ের মাথায় ভয়টা থেকেই যায়। এখন প্রতিদিন যেভাবে শিশুদের নিয়ে একটার পর একটা ঘটনা সামনে আসছে, তাতে এই ভয় আরও বাড়ছে।

