২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের এক বছরের মাথায় পরিচালিত হয় অপারেশন ক্লিনহার্ট

২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়। হত্যা, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে পড়েছিল বলে উল্লেখ করা হয় বিবিসি বাংলার ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। তবে ২০০২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। ওই সময় সরকারের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া স্বীকার করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, সন্ত্রাস নির্মূলে আরও সময় চেয়েছিলেন খালেদা জিয়া। একইসঙ্গে তিনি আগের আওয়ামী লীগ সরকারকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী করেন। ১১ অক্টোবর বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তার সরকার সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয় না।
এরপর ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর মধ্যরাতে, কার্যত ১৭ অক্টোবর থেকে সারাদেশে একযোগে অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী। মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বন্ধ করে অভিযান শুরু করা হয় এবং সেনা অভিযান শুরুর আগে পুলিশকে কিছু জানানো হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিডিআরের যৌথ অভিযান বলা হলেও বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, কার্যত পুরো অভিযান পরিচালনা করে সেনাবাহিনী। প্রথম দিনেই ব্যাপক ধরপাকড় চালানো হয়। বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বিবিসি জানায়, প্রথম দিনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মী।
অভিযানে ঢাকা সিটি করপোরেশনের তিনজন কমিশনার এবং চট্টগ্রামের দুজন ওয়ার্ড কমিশনারকেও আটক করা হয়। বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও গ্রেপ্তারের তালিকায় ছিলেন। বগুড়ায় এক বিএনপি নেতাকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধের সময় সেনাবাহিনীর গুলিতে একজন রিকশাচালক নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অভিযান নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও বিস্ময় তৈরি হয়েছিল। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযানের বিস্তারিত বিষয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ছাড়া অনেকেই জানতেন না। অভিযান শুরুর পর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা ঢাকায় এসে সিনিয়র নেতাদের কাছে সেনা সদস্যদের আচরণ নিয়ে অভিযোগ করেন।
অভিযানের আওতায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়। তৎকালীন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের কথা জানানো হয়। আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমু, আব্দুল জলিল, শাহ এ এম এস কিবরিয়া, আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ ও শেখ ফজলুল করিম সেলিমের বাসাতেও অভিযান চালানো হয়। শেখ সেলিমকে পরে গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অপারেশন ক্লিনহার্ট চলাকালে হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও সামনে আসে। বিভিন্ন সংবাদপত্রের খবরের ভিত্তিতে বিবিসি জানায়, অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৪০ জনের বেশি হেফাজতে মারা যান। তবে মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা নিয়ে নিশ্চিত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদের বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, হিসাবভেদে এ সংখ্যা ৪০ থেকে ৬৫ জন পর্যন্ত ছিল।
সেনাবাহিনী ৮৪ দিন অভিযান চালানোর পর ব্যারাকে ফিরে যায়। বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ সময় প্রায় ১২ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং ২ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র ও ৩০ হাজার রাউন্ড গুলি উদ্ধারের কথা জানানো হয়। অভিযানে প্রায় ২৪ হাজার সেনা সদস্য, নৌবাহিনীর প্রায় ৩৫০ সদস্য, প্রায় ১ হাজার বিডিআর সদস্য, প্রায় ৭০০ আনসার সদস্য ও পুলিশ নিয়োজিত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেছিল বিএনপি সরকার। তবে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকে। মওদুদ আহমদের বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি জানায়, বেশিরভাগ অপরাধী বিএনপির হওয়ায় দলের ভেতর থেকেও সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের জন্য চাপ তৈরি হয়েছিল।
অপারেশন ক্লিনহার্ট শেষ হওয়ার আগের দিন ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ২০০৩’ জারি করা হয়। এতে ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় করা কর্মকাণ্ড নিয়ে আদালতে মামলা করার সুযোগ বন্ধ করা হয়। হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের বিচার চাওয়ার পথও এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে বন্ধ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পরে এই দায়মুক্তি আইন নিয়ে সমালোচনা হয়। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল, বামপন্থী দলগুলো, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন এর বিরোধিতা করে।
২০১২ সালে মানবাধিকার আইনজীবী জেড আই পান্না ওই দায়মুক্তি আইনকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। তার যুক্তি ছিল, এ ধরনের দায়মুক্তি আইন বাংলাদেশের সংবিধানের পরিপন্থী। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট দায়মুক্তি আইনকে অবৈধ ঘোষণা করে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
