দ্বিতীয় স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গাজী নজরুলের চার দিনের ও মাকছুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে।
এর আগে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ করা ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে রোববার গভীর রাতে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম (৭৫), তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম (৬৫) এবং মধ্যস্থতাকারী মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। এজাহার দায়েরের পর পুলিশ ন্যাম ভবন থেকে সাবেক এই জামায়াত নেতা ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে।
পরের দিন সোমবার ২টা ২০ মিনিটের দিকে একটি গাড়িতে করে আসামিদের নিম্ন আদালত প্রাঙ্গণে আনে পুলিশ। পরে তাঁদের আদালত তোলা হয়। পরে, এই দুই আসামির সাত দিন করে রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে পুলিশ। আবেদনটি করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুজ্জোহা সরকার। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এহসানুল ইসলাম শুনানি শেষে আদেশ দেন।
পুলিশ ও ঘটনার এজাহার সূত্রে জানা যায়, রোববার সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না প্যাঁচানো নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। ওই ফ্ল্যাটেই গাজী নজরুল তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে যৌথভাবে বসবাস করতেন।
ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় পুলিশ, সিআইডি, পিবিআই এবং ডিবির একটি যৌথ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে কক্ষের দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠায়। উদ্ধার অভিযানের সময় পুলিশ বিছানার ওপর থেকে একটি ‘সুসাইড নোট’ উদ্ধার করেছে। অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. ফজলুল করিম জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে চিরকুটটি মরিয়মের লেখা বলে মনে হলেও ফরেনসিক পরীক্ষার পরই হস্তাক্ষর নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
মরিয়মের বাবা পেশায় মুদিদোকানদার এস এম মাসুম বিল্লাহর অভিযোগ অনুযায়ী, গত জুন মাসে ৭৫ বছর বয়সী গাজী নজরুলের সঙ্গে তাঁর ১৯ বছর বয়সী মেয়ে মরিয়মের বিয়ে হয়। এই বিয়েতে মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।
বিয়ের পর থেকেই ন্যাম ভবনের ওই বাসায় স্বামী গাজী নজরুল এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম যৌথভাবে তরুণী মরিয়মের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। মরিয়ম নিয়মিত ফোনে পরিবারের কাছে তাঁর ওপর চালানো নিগ্রহের কথা জানিয়ে কাঁদতেন।
রোববার বিকেলে গাজী নজরুল ফোনে মরিয়মের বাবাকে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন। স্বজনেরা সেখানে পৌঁছে অনেক মানুষের ভিড় দেখেন এবং পরবর্তীতে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশের সহায়তায় ভেতরের ঘরের দরজা ভেঙে ফ্যানের সঙ্গে মরিয়মকে ঝুলন্ত অবস্থায় পান।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে বিজয়ী হলেও গাজী নজরুলের সাম্প্রতিক সময়টা বেশ বিতর্কিত ছিল। গত জুলাই মাসে সামাজিক মাধ্যমে তাঁর একটি আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাঁকে এক তরুণীর সঙ্গে দেখা যায়।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
বিতর্ক চরম রূপ নিলে গাজী নজরুল দাবি করেছিলেন যে তরুণীটি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম। এই ঘটনার পরপরই গত ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী তাকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার করে এবং তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি প্রদান করে। এই ঘটনার পর তাঁর বাসায় গৃহবধূ মরিয়মের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং প্ররোচনা মামলায় সংসদ সদস্যের গ্রেপ্তার হওয়া ঘিরে সারাদেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

