‘অভাব-অনটনের মধ্যে বড় হয়েছি। আমার বাবার ছোট্ট একটি চায়ের দোকান ছিল। ২০১৫ সালে বাবা মারা যান। তখন আমি প্রাক্-প্রাথমিকের শিক্ষার্থী। বাবাকে হারিয়ে ছোট বোন আর আমাকে নিয়ে মা একেবারে দিশাহারা হয়ে পড়েন। সেই থেকে অভাব কাকে বলে, তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে কেটেছে আমাদের দিন। পড়ার টেবিলের ছিল না। মামারা মাঝেমধ্যে সামান্য সহযোগিতা করেছেন। মামারাও কৃষিকাজ করেন। তাঁদের সামান্য সহযোগিতা আর মায়ের অদম্য চেষ্টায় কোনো রকমে চলেছে পড়াশোনা। তাই জিপিএ-৫ পাওয়াটা আমার জন্য অনেক বড় কিছু। এটা কেবল আমার নয়, আমার মায়েরও সাফল্য।’
আজ বুধবার সকালে লক্ষ্মীপুরে অনুষ্ঠিত শিখো-প্রথম আলো জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এভাবেই নিজের এ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দালাল বাজার ফাতেমা গার্লস হাইস্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী নুজহাতী নুর। সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আজ সকাল থেকেই লক্ষ্মীপুরের আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেঘ কেটে গিয়ে সূর্যের তাপ বেড়েছে। গরম আর প্রখর রোদ অবশ্য কৃতী শিক্ষার্থীদের দমাতে পারেনি। সকাল থেকেই তাদের পদচারণে মুখর হয় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন চত্বর। সকাল ৯টা বাজতেই শিক্ষার্থীদের হইহুল্লোড়, আনন্দ-উচ্ছ্বাসে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান উৎসবে রূপ নেয়। অনুষ্ঠানে জেলার সাড়ে চার শর মতো শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের সঙ্গে এসেছিলেন কয়েক শ অভিভাবকও।
সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু হয়। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি এ বি এম রিপন। তিনি প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
এরপর শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দিতে মঞ্চে আসেন, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাইন উদ্দিন পাঠান, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হাসিবুল ছিদ্দিক, লক্ষ্মীপুর কলেজিয়েট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা খোদেজা খাতুন, প্রথম আলোর হেড অব ফাস্ট রিপোর্টিং টিপু সুলতান। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর বন্ধুসভার সদস্য মোহাম্মদ সেলিম মুন্সি।
লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাইন উদ্দিন পাঠান বলেন, ‘আজকের এই মঞ্চ থেকে তোমাদের মুখের দিকে তাকালে আমাদের আশাবাদী হতে ইচ্ছা করে। তোমরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তোমাদের অর্জন শুধু তোমাদের পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, এটি পুরো জেলার জন্য গর্বের। তবে সাফল্যের পথে অনেক বাধা আসবে। মনে হবে পথটা কঠিন। সেই মুহূর্তে আজকের দিনটির কথা মনে করবে। মনে রাখবে, সীমাবদ্ধতা মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে; কিন্তু দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে সেটিকে অতিক্রম করা সম্ভব।’

অধ্যাপক হাসিবুল ছিদ্দিক বলেন, ‘আজকের এই অর্জন তোমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে মনে রেখো, জিপিএ-৫ তোমাদের গন্তব্য নয়, এটি কেবল সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি সিঁড়ি। তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যে সম্ভাবনা আছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ভালো মানুষ হতে হবে।’
শিক্ষার্থীদের বড় স্বপ্ন দেখার পরামর্শ দেন শিক্ষিকা খোদেজা খাতুন। তিনি বলেন, ‘আজ তোমাদের চোখে যে আনন্দ দেখছি, তার পেছনে রয়েছে তোমাদের মা-বাবার নির্ঘুম রাত, শিক্ষকদের পরিশ্রম এবং তোমাদের নিজেদের ত্যাগ। তোমাদের প্রত্যেককে বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। তবে সেই স্বপ্ন শুধু নিজের জন্য নয়; পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য এবং দেশের জন্যও হতে হবে। তোমাদের সাফল্যের গল্প যেন একদিন আরও অনেক শিশুকে স্বপ্ন দেখার সাহস দেয়।’

প্রথম আলোর হেড অব ফাস্ট রিপোর্টিং টিপু সুলতান শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে না বলার শপথবাক্য পাঠ করান। তিনি বলেন, ‘সামনে তোমাদের উচ্চমাধ্যমিক, নতুন পড়াশোনা, নতুন চ্যালেঞ্জ। আজকের সাফল্য তোমাদের সাহস জোগাবে। সেখানেও জিপিএ–৫ পেতে হবে। তবে কখনো প্রত্যাশামতো ফল না হলে ভেঙে পড়বে না। একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে জীবনের সব সম্ভাবনা মাপা যায় না। ভুল থেকে শিখে আবার চেষ্টা করার শক্তিটা ধরে রেখো। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও বই পড়তে হবে। সাহিত্য পড়বে, বিজ্ঞান জানবে, সংবাদপত্র পড়বে। প্রথম আলো, কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তা তোমাদের সঙ্গী হতে পারে।’
টিপু সুলতান আরও বলেন, ‘প্রশ্ন করবে, বুঝবে, শিখবে। কোনো তথ্য দেখলেই বিশ্বাস বা ছড়িয়ে দেওয়ার আগে যাচাই করবে। খেলাধুলা করবে, বন্ধুদের সঙ্গে মিশবে, মানুষের কথা শুনবে।’

অনুষ্ঠানে অভিভাবক গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘তোমরা এই সমাজের, এই দেশের গর্ব। সততা, নৈতিকতা আর মানবিকতা ধরে রাখলে একদিন তোমাদেরকেই এই দেশের নেতৃত্ব দিতে হবে। জীবনে ভালো কিছু করার জন্য স্বপ্ন দেখতে হবে তোমাদের। স্বপ্ন সফল করতে সব সময় চেষ্টা করতে হবে।’
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে চলে বন্ধুসভার সদস্য ও কৃতী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। পৌর শহীদ স্মৃতি একাডেমির সদস্য রোদসী তাসফিয়া রিজুক কবিতা আবৃত্তি করে মুগ্ধ করেন শিক্ষার্থীদের।
‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে অনুষ্ঠিত এই আয়োজন পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় আছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।



