‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’-এর দেড় দশক পর ‘দ্য সোশ্যাল রেকনিং’

ফেসবুকের উত্থান, মার্ক জাকারবার্গের সাফল্য আর প্রযুক্তি দুনিয়ার ক্ষমতার গল্প নিয়ে একসময় আলোড়ন তুলেছিল ‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’। সেই সিনেমার প্রায় দেড় দশক পর আবারও ফেসবুকের গল্প নিয়ে পর্দায় ফিরছেন নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার অ্যারন সরকিন।
তার নতুন সিনেমার নাম ‘দ্য সোশ্যাল রেকনিং’, আর এটি মুক্তি পাচ্ছে ৯ অক্টোবর। তবে এটি ‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’-এর সরাসরি সিক্যুয়েল নয় বলে নিশ্চিত করেছেন নির্মাতা।
বরং এটিকে ফেসবুকের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ২০২১ সালের ‘ফেসবুক ফাইলস’-কে কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমা বলা হচ্ছে। ফেসবুকের সাবেক কর্মী ও হুইসেলব্লোয়ার ফ্রান্সেস হগেনের ফাঁস করা হাজারো অভ্যন্তরীণ নথি এবং সেগুলো নিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর অনুসন্ধানই ছবির মূল ভিত্তি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ধারাবাহিক অনুসন্ধানে ফেসবুকের অ্যালগরিদম, কনটেন্ট মডারেশন, ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা এবং প্ল্যাটফর্মের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে।
হগেনের ফাঁস করা নথিতে বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ওপর ইনস্টাগ্রামের প্রভাব, উসকানিমূলক ও বিভাজনমূলক কনটেন্টের বিস্তার, বিভিন্ন ভাষায় দুর্বল কনটেন্ট মডারেশন, প্রভাবশালী কিছু অ্যাকাউন্টকে বিশেষ সুবিধা এবং ব্যবহারকারীদের এনগেজমেন্ট বাড়ানোর জন্য প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে আসে।
সিনেমায় হগেনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন মিকি ম্যাডিসন। আর তাকে নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করা সাংবাদিক জেফ হরভিটজের চরিত্রে দেখা যাবে জেরেমি অ্যালেন হোয়াইটকে।
‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’-এ মার্ক জাকারবার্গের চরিত্রে জেসি আইজেনবার্গের অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। তবে নতুন সিনেমায় সেই চরিত্রে এবার অভিনয় করেছেন জেরেমি স্ট্রং।
সোরকিন চেয়েছিলেন আইজেনবার্গই আবার জাকারবার্গের চরিত্রে ফিরুন। কয়েক দিন তাকে রাজি করানোর চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। তবে আইজেনবার্গ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর চরিত্রটির দায়িত্ব নেন স্ট্রং।
প্রথম দিকের প্রতিক্রিয়ায় বলা হচ্ছে, আইজেনবার্গের অভিনয় নকল করার পথে হাঁটেননি স্ট্রং। বরং জাকারবার্গকে আরও ঠান্ডা, কঠোর ও ক্ষমতাশালী এক চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। ফেসবুক যখন বিশ্বজুড়ে বিপুল প্রভাবশালী একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে, সেই সময়ের জাকারবার্গকেই কেন্দ্র করে তার অভিনয়।
তবে নতুন সিনেমাটিকেও ‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’-এর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। কিন্তু এই তুলনা কেন? যদিও অনেকেই বলছেন, তুলনাটা স্বাভাবিক। দুটি সিনেমারই চিত্রনাট্যকার অ্যারন সোরকিন এবং দুটিতেই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মার্ক জাকারবার্গ।
তবে দুই সিনেমার গল্পের সময়কাল ও দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। ‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’ দেখিয়েছিল ফেসবুকের জন্ম, দ্রুত বিস্তার এবং জাকারবার্গের উত্থানের গল্প। অন্যদিকে ‘দ্য সোশ্যাল রেকনিং’ দেখছে সেই প্ল্যাটফর্মের পরবর্তী সময়কে- যখন ফেসবুক ও তার অ্যালগরিদম কোটি কোটি মানুষের তথ্য, মতামত ও আচরণে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
ফলে নতুন সিনেমার কেন্দ্রে প্রযুক্তি উদ্যোক্তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে জবাবদিহি। ভুয়া তথ্য, রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ, কিশোরদের মানসিক সুস্থতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যবহারকারীদের সামনে কোন কনটেন্ট কীভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়- এসব প্রশ্নই উঠে এসেছে গল্পে।
ফ্রান্সেস হগেন ফেসবুকের ‘সিভিক ইন্টিগ্রিটি টিম’-এর সঙ্গে কাজ করতেন। পরে প্রতিষ্ঠানটি ওই টিম ভেঙে দেওয়ার পর তিনি সাংবাদিক জেফ হরভিটজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ধীরে ধীরে ফেসবুকের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন তথ্য তার কাছে তুলে ধরেন।
তবে সিনেমাটি হুবহু বাস্তব ঘটনা অনুসরণ করেনি। হরভিটজ নিজেই জানিয়েছেন, ছবিটি ঘটনাগুলো থেকে ‘অনুপ্রাণিত’, সরাসরি সেগুলোর ভিত্তিতে নির্মিত নয়। অর্থাৎ সিনেমাটির প্রয়োজনে কিছু ঘটনা, সময়কাল ও চরিত্রের উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এদিকে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা অতীতে ‘ফেসবুক ফাইলস’ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর তথ্য উপস্থাপনের ধরন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল এবং নথিগুলোকে বেছে বেছে ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছিল।
মুক্তির আগে যারা সিনেমাটি দেখেছেন, তাদের বড় অংশের প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক। অনেকেই এটিকে ধীরগতির কিন্তু টানটান উত্তেজনার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা-নির্ভর ড্রামা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশেষ প্রশংসা পেয়েছেন জেরেমি স্ট্রং, মিকি ম্যাডিসন ও জেরেমি অ্যালেন হোয়াইট। কেউ কেউ সিনেমাটিকে ‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’-এর সময়োপযোগী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আবার কয়েকজন সমালোচকের মতে, সিনেমাটি আকর্ষণীয় হলেও আগের ছবিটির মতো তীক্ষ্ণতা বা গতি ধরে রাখতে পারেনি।
পূর্ণাঙ্গ রিভিউ প্রকাশের পর ‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’-এর সঙ্গে তুলনাটা আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
‘দ্য সোশ্যাল রেকনিং’-এর গুরুত্ব শুধু ফ্রান্সেস হগেনের ঘটনা বা ফেসবুকের একটি বিতর্কে সীমাবদ্ধ নয়। সিনেমাটি এমন এক সময়ে মুক্তি পাচ্ছে, যখন মেটাসহ বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যালগরিদম, ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা এবং অনলাইনে ছড়ানো ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বাড়ছে।
ফলে সোরকিনের নতুন সিনেমা মূলত একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় দর্শককে- কোটি কোটি মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করা প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের তৈরি করা সিস্টেম এবং সেই সিস্টেমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কনটেন্টের জন্য কতটা দায়ী?
৯ অক্টোবর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর সেই প্রশ্নের উত্তর কতটা জোরালোভাবে দিতে পারে ‘দ্য সোশ্যাল রেকনিং’, সেটিই এখন দেখার বিষয়। ব্র্যান্ড সিনারিও
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…




