
বলিউডের মূলধারার চলচ্চিত্র মানে নায়ক সর্বেসর্বা এবং গল্পের গাঁথুনি থাকবে নামমাত্র! এমন নয় যে মূলধারার চলচ্চিত্র থেকে নায়ক উঠে আসেনি কিংবা মন কাড়া অভিনয় উপহার দেয়নি। ৮০-৯০ দশক থেকে শুরু করে অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, সালমান খান, অক্ষয় কুমার, অনিল কাপুর, অজয় দেবগন, সাইফ আলী খান কিংবা হালের রণবীর কাপুর, শহীদ কাপুর কিংবা ভিকি কৌশলের মতো অভিনেতারা নিজেদের অভিনয় দক্ষতা গুণে মূলধারা হোক কিংবা আর্ট ফিল্ম সমানতালে দৃষ্টি নন্দন অভিনয় করে যাচ্ছেন। কিন্তু সবার মাঝখানে খানিকটা ব্যতিক্রম ছিলেন নানা পাটেকর।
নানা পাটেকরকে বলা হয় বলিউডের এক এক্সসেপশনাল বা ব্যতিক্রমী অভিনেতা। তার অভিনয় কিংবা তার বেছে নেওয়া গল্পে কখনো মেলোড্রামার ছোঁয়া দেখা যায় না। বরাবরই তিনি বহুমাত্রিক, আউট-অব-দ্য-বক্স চরিত্র আর গল্পকেই বেছে নিয়েছেন। যেখানে চরিত্রের গভীরতাই ছিল তার একমাত্র বিবেচ্য বিষয়, বাণিজ্যিক সমীকরণ নয়।
সিনেমার বক্স অফিস ফলাফল যেমনই হোক না কেন, নানা পাটেকর তার অভিনয় দিয়ে বরাবরই দর্শকদের সমানতালে মুগ্ধ করে এসেছেন। ইতিবাচক হোক বা নেতিবাচক- যে চরিত্রই তার হাতে এসে পড়েছে, তিনি সেটাকে পুরোপুরি নিজের করে নিয়েছেন, উপভোগ করেছেন প্রতিটি সংলাপ ও মুহূর্তকে।
তার চরিত্রগুলো বরাবরই গতানুগতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসেছে। রুক্ষ, জটিল আর গ্রে শেডের মানুষ, যারা সাদা-কালোর সহজ সংজ্ঞায় ধরা দেয় না। আহামরি নায়কোচিত সংলাপ কিংবা চকচকে লুক দিয়ে তিনি কখনো নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেননি, চাননিও তা। বরং তার এক্সসেপশনাল অভিনয়ক্ষমতা দিয়েই তিনি বারবার প্রতিটি চরিত্রের চ্যালেঞ্জ জয় করে গেছেন- প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের অভিনয়ের জন্য গ্ল্যামার নয়, প্রয়োজন হয় শুধু চরিত্রের প্রাণকে খুঁজে বের করার সাহস আর দক্ষতা।
বলিউডে বছর বছর নতুন মুখ আসে, কেউ কেউ তারকা হয়ে ওঠেন, আবার সময়ের স্রোতে অনেকেই হারিয়েও যান; কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করতেই পর্দার আবেগ যেন আরও গভীর হয়ে যায়- তাদের মধ্যে অন্যতম নানা পাটেকর। তার অভিনয়ে থাকে চাপা আগুন, থাকে তীব্রতা। আবার বাস্তব জীবনেও তার সংগ্রামের গল্পটা যেন কোনো সিনেমার চেয়ে কম নয়।
নানা পাটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। জন্ম ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের উপকূলীয় অঞ্চল মুরুদ-জঞ্জিরায়। তার বাবা ড্যাঙ্কর পাটেকর ছিলেন পেশাদার চিত্রশিল্পী। ঘরে-বাইরে সারা দিন রংতুলির সঙ্গে বড় হয়েছেন তিনি। শিশুকাল থেকেই তার হাতে তুলি মানাত, ছবি আঁকার ভেতর দিয়েই গড়ে ওঠে তার শিল্পবোধ। পরে তিনি ভর্তি হন মুম্বাইয়ের সুপরিচিত শিল্প শিক্ষার প্রতিষ্ঠান ‘শ্রী জে জে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড আর্টস’-এ। সেখানে পড়াশোনা করতে করতেই তার জীবনে যুক্ত হয় নাটকের জগৎ। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলা, চরিত্রের আবেগ ধারণ করা, দর্শকের প্রতিক্রিয়া অনুভব করা- এসব ধীরে ধীরে তার ভিত গড়ে দেয়। এখান থেকেই জন্ম নেয় সেই অভিনেতার, যাকে মানুষ ‘নানা পাটেকর’ নামে চেনেন। বৃহস্পতিবার যিনি যাত্রা করেছেন অনন্তলোকের পথে।
পাঁচ দশক ধরে বলিউড তার নানা ধরনের অভিনয় দেখে আসছে। কখনো তিনি তার অভিনয়ে মানুষকে হাসিয়েছেন, কখনো বা কাঁদিয়েছেন, কখনো বা ভাবতে বাধ্য করেছেন আমাদের দৈনন্দিনের অনেক অবহেলিত বিষয় নিয়ে। সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেও তিনি কখনো বদলে যাননি, বরং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মাটির মানুষ হিসেবেই বেঁচেছেন।
জীবিকার প্রয়োজনে কখনো তিনি রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং এঁকেছেন, কখনো হাতের তুলিতে রং ছড়িয়ে সিনেমার পোস্টার এঁকেছেন। মাসের শেষে যেটুকু আয় হতো, তা ছিল মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ রুপি। সেই সামান্য টাকায় সংসার, জীবন, স্বপ্ন-সবকিছু গুছিয়ে রাখাই ছিল তার বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই কষ্টই হয়তো তাকে শিখিয়েছে সংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ আর বাস্তবতার শক্ত পাঠ।
শিল্পের ভেতরেই বেড়ে ওঠা সাদামাটা জীবন
যে মানুষটা এত বড় তারকা, তার জীবনযাপন কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে সাধারণ। আলোঝলমল বিলাসী জীবন, দামি গাড়ি কিংবা ব্র্যান্ড-অভ্যাস এসবের কোনো আকর্ষণ তার জীবনে নেই। তিনি বিশ্বাস করেন, যা প্রয়োজন নেই, তা জীবনে রাখারও মূল্য নেই। মুম্বাইয়ের একটি ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টেই ছিলো তার বসবাস। শোবার ঘরও ছিলো মাত্র একটি।
কৃষকের দুঃসময়ে
নানা পাটেকরের জীবনের একটি বড় অধ্যায় তার সামাজিক কাজ। পাঠক হয়তো জেনে অবাকই হবেন, ভারতের অগণিত আমজনতার পাশে তিনি রয়েছেন ৩০ বছর ধরে। বিগত ৩০ বছরে প্রতি মাসে নিজের উপার্জনের ৯০ শতাংশ মহারাষ্ট্রের গরিব মানুষদের দান করে চলেছেন নানা পাটেকর! মহারাষ্ট্র যে সময় খরার কবলে পড়ে, তখন ফসল যেমন নষ্ট হলো, তেমনি ভেঙে পড়ল অসংখ্য কৃষক পরিবারের স্বপ্নও এবং ঋণের চাপে অনেক কৃষক যখন জীবনের আশাই হারিয়ে ফেলছেন একের পর এক কৃষকের আত্মহত্যার খবর উঠে আসতে থাকে শিরোনামে, তখনো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন নানা পাটেকর।
মারাঠাওয়াড়ায় গিয়ে ১১২টি কৃষক পরিবারের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে প্রত্যেক পরিবারের হাতে তুলে দেন ১৫ হাজার টাকা। শুধু এখানে নয়, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে আরও ৭০০টি কৃষক পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন নানা। তাদের অর্থনৈতিক সংকট মেটাবার চেষ্টা করেন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী। যেসব কৃষক আত্মহত্যা করেছেন, তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের স্বনির্ভর করে তুলতে বিভিন্নভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন নানা। এসব কাজ দেখভালের জন্য তার একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও রয়েছে। এই সংস্থার মাধ্যমে এ যাবৎ কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেছেন কৃষকদের সাহায্যের জন্য।
কারগিলের উত্তাল সময়ে সীমান্তে
অনেকেই জানেন না, নানা পাটেকরের জীবনে রয়েছে সৈনিকের অধ্যায়ও। নব্বইয়ের দশকে ‘প্রহার’ ছবিতে সেনা অফিসারের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তিনি ‘মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি’ ইউনিটের সঙ্গে তিন বছর ধরে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এই প্রশিক্ষণ শুধু অভিনয়ের জন্যই নয়, তার ভেতরে জাগিয়ে তোলে দেশপ্রেমের গভীর অনুভূতি। ১৯৯৯ সালে যখন কারগিল যুদ্ধ শুরু হয়, তিনি নিজেই সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, দেশের হয়ে কাজ করার আকাঙ্ক্ষার কথা।
পরে তাকে ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মিতে সম্মানসূচক ক্যাপ্টেন পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ড্রাস, কুপওয়াড়া, বারামুলা, সোপোরের মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় তিনি সৈনিকদের পাশে ছিলেন। কখনো টহলের কাজে, কখনো সামরিক হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের সেবায়- তিনি ছিলেন নীরব সহযোদ্ধা। নিজের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন শ্রীনগরে যাওয়ার সময় তার ওজন ছিল ৭৬ কেজি, ফিরে এসেছিলেন ৫৬ কেজি হয়ে। যুদ্ধের সেই কঠিন দিনগুলো আজও তার জীবনের এক গর্বের অধ্যায়। পরবর্তী সময়ে তাকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদেও উন্নীত করা হয়, যা বলিউডের একজন অভিনেতার জীবনে বিরল সম্মান।
পর্দায় নানারূপে নানা
নানা পাটেকরের চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে। প্রথম দিকে তিনি অভিনয় করতেন পার্শ্বচরিত্রে, তবে খুব দ্রুতই তার অভিনয়ের শক্তি আলাদা হয়ে ওঠে। ‘পারিন্দা’তে তিনি যে তীব্র, ভয়ংকর ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, তা বলিউডের দর্শককে যেন নতুন এক অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করায়।
‘অঙ্গার’, ‘তিরঙ্গা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘ওয়াজুদ’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’- প্রতিটি ছবিতেই তিনি চরিত্রে ডুবে গেছেন পুরোটা দিয়ে। ‘ক্রান্তিবীর’-এ বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠা তার গর্জন আজও দর্শকের মনে থেকে গেছে। ২০০০-এর দশকে ‘অ্যাব তক ছাপ্পান’-এ তিনি হয়ে ওঠেন কঠোর; কিন্তু ভেতরে ভেতরে দ্বন্দ্বে জর্জরিত এক পুলিশ কর্মকর্তা।
চোখের দৃষ্টি, সংলাপের ভার ও চাপা শক্তি- সব মিলিয়ে এই চরিত্র হয়ে ওঠে তার অভিনয়জীবনের অন্যতম অর্জন। আবার তার কমেডি-টাইমিং দর্শককে চমকে দেয় ‘ওয়েলকাম’-এ। ডন চরিত্র হয়েও তিনি আনেন এমন হাস্যরস, যা ভয় আর মজাকে একসঙ্গে জুড়ে দেয়। তিনবার তিনি পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’। তার অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য- কখনো অতিরঞ্জন নেই, তবে তীব্রতা সব সময়ই স্পষ্ট। সংলাপ যেন তার মুখে এসে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
কঠোরের আড়ালে কোমল
‘অ্যাব তক ছাপ্পান’ ছবিতে যখন নানা পাটেকরকে দেখা যায় নির্ভীক, কঠোর স্বভাবের একজন পুলিশ কর্মকর্তা(সিনেমার ভাষা ‘এনকাউন্টার-অফিসার’) হিসেবে। তখন মনে হয়, মানুষটি যেন রাগ আর গম্ভীরতার জন্যই জন্মেছেন। পরিমিত, সংলাপে কোনো বাড়াবাড়ি না করে শুধু তার চাহনি, গলা আর দমিত উত্তেজনা যেন পর্দা ভেদ করে দর্শকের গায়ে এসে লাগে। এই তীব্রতা মেশানো কর্তৃত্বই তাকে আলাদা করে।
কিন্তু শুধু চরিত্রেই নয়, বাস্তব জীবনেও নানা পাটেকর অনেক সময় এমনই সোজাসাপটা, নির্মোহ ও কঠিন স্বভাবের বলে পরিচিত। নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অভিনয়ে না এলে হয়তো তার রাগী আর অস্থির স্বভাব তাকে অন্য পথে নিয়ে যেত। ছোটবেলায় তার ভেতরে ছিল প্রবল চঞ্চলতা, ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়া ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। অনেকেই তাকে ভয় পেতেন। তার নিজের ভাষায়- তিনি খুব বেশি কথা বলতেন না; বরং কাজ দিয়েই জবাব দিতেন।
তার বাস্তব জীবনটা আর সব তারকার তুলনায় আলাদা। পোশাক থেকে বাসস্থান- তার জীবনযাত্রায় বিলাসিতা নেই এতটুকু। যাকে বলে একেবারে নিপাট সাদামাটা জীবন কাটাতেই ভালোবাসেন নানা। মুম্বাইয়ের একটা সাধারণ ছোট অ্যাপার্টমেন্টে মায়ের সঙ্গে থাকতেন তিনি, যার বেডরুমের সংখ্যা মাত্র একটি।
নানা পাটেকরের এই এক্সসেপশনাল অভিনয়জীবনে দর্শক পেয়েছে অসংখ্য চমকপ্রদ পারফরম্যান্স। তার কালজয়ী সব চরিত্র যেমন আউট-অব-দ্য-বক্স হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, ঠিক তেমনি প্রমাণ করেছে- নানা পাটেকরের মতো একজন অভিনেতাকে পাওয়াটা বলিউড ইন্ডাস্ট্রির জন্য এক আশীর্বাদ ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
তবে এর সাথে জড়িয়ে আছে এক গভীর আক্ষেপও। তাকে দিয়ে আরও যে চমকপ্রদ, আরও যে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করানোর ইচ্ছে, আকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্ন থাকা উচিত ছিল, সেই সম্ভাবনাগুলো থেকে দর্শক হিসেবে আমরা কোথাও যেন বঞ্চিত থেকে গেছি। মনে হয়, তার প্রতিভার পুরোটা আমরা কখনো দেখতে পাইনি।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…




