নরসিংদী পাসপোর্ট অফিসে তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাসে ৭০ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

নরসিংদী পাসপোর্ট অফিসে তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাসে ৭০ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে আবেদনকারীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দালাল সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং ভুয়া তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট তৈরিসহ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিন কর্মকর্তা প্রতি মাসে ৭০ লাখ টাকার বেশি আয় করেন বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সহকারী পরিচালক মো. রাসেল আহমেদ শাহিন, উপসহকারী পরিচালক মো. শাহাদাত হোসেন এবং সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ আবুল হোসেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে।

নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০টি আবেদন জমা পড়ে। মাসে এই সংখ্যা ছয় থেকে সাত হাজার। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ আবেদনই নির্দিষ্ট দালাল চক্রের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়। প্রতিটি আবেদনের জন্য সরকারি ফির বাইরে সর্বনিম্ন এক হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়।

আবেদনকারীদের অভিযোগ, নির্ধারিত চ্যানেলের বাইরে পাসপোর্ট করতে গেলে নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। পাসপোর্ট পেতে বিলম্ব, অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং প্রতিবাদ করলে হয়রানির মুখে পড়তে হয়। এমনকি ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে পাসপোর্ট তৈরির অভিযোগও রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনায় মূল ভূমিকা পালন করেন সহকারী পরিচালক রাসেল আহমেদ শাহিন, উপসহকারী পরিচালক শাহাদাত হোসেন এবং সুপারিনটেনডেন্ট আবুল হোসেন। তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাসে ৭০ লাখ টাকার বেশি অবৈধ আয়ের অভিযোগ উঠলেও এর পূর্ণাঙ্গ আর্থিক হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

সহকারী পরিচালক মো. রাসেল আহমেদ শাহিনের বিরুদ্ধে অল্প সময়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর চাকরির বয়স মাত্র দুই বছর। প্রকাশিত অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, এই সময়ে বেতন ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা মিলিয়ে তাঁর মোট আয় ১০ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। অথচ নিজ গ্রাম ভৈরব এবং ঢাকায় তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সরেজমিনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তথ্য দিতে রাজি হননি। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেননি বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।

একপর্যায়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা কি মাস্তানি করতে এসেছেন?’ পরে সাংবাদিকদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

একই অফিসের উপসহকারী পরিচালক মো. শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধেও আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, নিজের পাশাপাশি স্ত্রী রিনা আক্তারের নামে ঢাকা ও কুমিল্লায় জমি এবং একাধিক প্লট রয়েছে তাঁর।

অভিযোগে এসব সম্পত্তির দলিল নম্বর হিসেবে ১০৭০৭, ৫১৩০, ৫১৩১ ও ৪৪৯৫ উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সম্পত্তি কেনার অর্থের উৎস এবং প্রকৃত মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট দলিল ও আর্থিক তথ্যের পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের ফল প্রকাশ করা হয়নি।

শাহাদাত হোসেনের বক্তব্য জানতে গেলে তিনি ক্যামেরা দেখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে। তবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নরসিংদী পাসপোর্ট অফিসের কথিত সিন্ডিকেটের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ আবুল হোসেনের নাম উঠে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতেও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত থাকার সময়ও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া আলোচিত রোহিঙ্গা পাসপোর্ট কেলেঙ্কারির অভিযোগে বিভাগীয় মামলায় তিনি দণ্ডিত হয়েছিলেন বলে প্রকাশিত অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।

৯ হাজার ২০০ টাকা বেতন স্কেলে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরি শুরু করা আবুল হোসেন বর্তমানে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদের মালিক বলে অভিযোগ উঠেছে।

তাঁর নিজের ও স্ত্রীর নামে ঢাকা, গাজীপুর এবং খুলনায় সাড়ে নয় একরের বেশি জমি থাকার দাবি করা হয়েছে। এসব সম্পত্তির মালিকানা সম্পর্কিত একাধিক খতিয়ান নম্বরও অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকার দক্ষিণখান মৌজায় খতিয়ান নম্বর ২০২৫-১০০২৩৩, বাউনিয়া মৌজায় ৩১৭৮৮ এবং গাজীপুরের চতর মৌজায় ২৬ নম্বর খতিয়ানের সম্পত্তির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

এ ছাড়া খুলনার বারাকপুর মৌজায় ৪৪০, ৪৩৯, ২৭০৪, ২৬৩২, ২৬৮২, ২৬৮০, ২৪৬৫, ২৪৮১, ৯০৩, ১৯৪২ ও ১৪০৬ নম্বর খতিয়ানের জমির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

খুলনার দিঘলিয়ার আরাজি বারাকপুর মৌজায় ৩০৪ ও ৩০৭, যোগীপোল মৌজায় ৮০৮ ও ১০৫২, মহেশ্বরপাশা মৌজায় ৪০৪ এবং গিলাতলা মৌজায় ৫১ ও ৪৪ নম্বর খতিয়ানের সম্পত্তির কথাও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

তবে এসব খতিয়ানে উল্লেখিত জমির সম্পূর্ণ মালিকানা, ক্রয়ের সময়, অর্থের উৎস এবং বর্তমান বাজারমূল্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

সম্পদের বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল হোসেন দাবি করেন, এসব সম্পত্তি তাঁর পৈতৃক।

তিনি বলেন, ‘এসব সম্পত্তি আমার বাবার সম্পত্তি। ভাইদের ট্যাক্সও আমিই দিই।’

নিজের ভাইদের শিক্ষাগত অবস্থার প্রসঙ্গ তুলে তাঁদের সম্পত্তিসংক্রান্ত করও তিনি পরিশোধ করেন বলে জানান। তবে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, পৈতৃক সম্পত্তির পাশাপাশি ঢাকা, গাজীপুর ও খুলনায় নিজের এবং অন্যদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট কিনেছেন তিনি।

আবুল হোসেনের বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সম্পদ অর্জনের অভিযোগের পার্থক্য নির্ধারণে জমির দলিল, খতিয়ান, আয়কর নথি এবং সম্পদ বিবরণী যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীদের দাবি, পাসপোর্ট অফিসের নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সরকারি ফি পরিশোধের পরও অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে অনেককে। যারা এই ব্যবস্থার বাইরে সেবা নিতে চান, তাঁদের ফাইল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।

তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নিয়োগ-পরবর্তী সময়ে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন, পাসপোর্ট আবেদন নিষ্পত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দালালদের মাধ্যমে সেবা নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার।

এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও আবুল হোসেন ছাড়া অন্য দুই কর্মকর্তার কাছ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে পাসপোর্ট আবেদন ও নিষ্পত্তির রেকর্ড, কথিত অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের তথ্য, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী এবং জমির মালিকানা সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

পাসপোর্ট সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ এবং কথিত অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।