ঢাকা,২২ অক্টোবর- সব ধরনের শঙ্কা ও ভয় উপেক্ষা করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর বিদায়ের করুণ সুরের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের এ প্রধান ধর্মীয় উৎসব। বুধবার সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মর্ত্যলোক থেকে বিদায় নেন দেবী দুর্গা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের বাসনা, ক্রোধ, হিংসা ও লালসার মতো আসুরিক প্রবৃত্তি বিসর্জন দেওয়াই বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এসব প্রবৃত্তি ত্যাগ করে একে অপরের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য। গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে চণ্ডীপাঠ, বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে ‘আনন্দময়ীর’ আগমনে শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হয়। এরপর টানা পাঁচ দিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে পূজা-অর্চনার মাধ্যমে ভক্তরা দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দশমী তিথিতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এ উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।
এবারের দুর্গাপূজা আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি উৎসবমুখর ছিল। পুরো পূজায় ছোটখাটো কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া পরিবেশ ছিল আনন্দময় ও ভয়মুক্ত। সরকার এবার পূজা উদযাপন উপলক্ষে প্রথমবারের মতো পাঁচ দিনের ছুটি ঘোষণা করে। পূজা উপলক্ষে অনুদানের পরিমাণও বাড়ানো হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকারপ্রধান ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় গিয়ে সরেজমিনে দুর্গাপূজা পরিদর্শন করেন। এতে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দেয়। তাঁরা মনে করেন, সরকার তাঁদের পাশে রয়েছে।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরের দুর্গাপূজায় আতঙ্ক ও উদ্বেগের পরিবেশ ছিল। বিশেষ করে গত দুই বছরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এ ধর্মীয় উৎসব ঘিরে নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। তাই এবার যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, সে জন্য তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে। দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ছয় হাজার এসআরবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া সাড়ে ৫০০ পিকআপ ও সাড়ে ৪০০ মোটরসাইকেল নিয়ে দৃশ্যমান টহল দেওয়া হয়। পূজার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপ ও স্থানে এসআরবির ডগ স্কোয়াড এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট দিয়ে প্রয়োজনীয় তল্লাশি চালানো হয়। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্পেশাল ফোর্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয়সংখ্যক সদস্যকে রিজার্ভ রাখা হয়েছিল। এসব সতর্কতামূলক ব্যবস্থার কারণে এবার পূজায় কোনো ধরনের ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত পূজামণ্ডপ ঘিরে ৪৬টি ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ১৭টি মামলা করা হয় এবং ২১টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পূজামণ্ডপ ঘিরে ৪৭টি ঘটনার মধ্যে ৩০টি ছিল ভাঙচুরের ঘটনা, চারটি চুরি, তিনটি অগ্নিসংযোগ এবং বাকি ১০টি ছিল অন্যান্য ঘটনা। এসব ঘটনায় মোট ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গত বছরও দুর্গাপূজার আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আতঙ্কিত হয়ে অনেকে পূজামণ্ডপ বন্ধ করে দেন। গুজব ছড়িয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। এবারও দুর্গাপূজায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র ছিল। একাধিক স্বার্থান্বেষী মহল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা করেছিল।
প্রতি বছর দুর্গাপূজার আগে বাংলাদেশে একাধিক প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায় এবারও সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তাঁরা আদৌ নিরাপদে দুর্গোৎসব পালন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। এ প্রশ্নও সামনে এসেছিল, দেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও কি মৌলবাদীদের দাপট থাকবে? এসব শঙ্কা নিয়েই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন।
এ ধরনের পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বিভিন্ন জেলার পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের উদ্যোগ নেন। শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপ দেখতে তিনি রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সফর করেন।
সম্প্রীতির বার্তা দিতে পূজার শেষ দিন অর্থাৎ নবমীতে দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত মঙ্গলবার তিনি উত্তরাঞ্চলের একাধিক জেলার দুর্গামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় রংপুরের রাধাগোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরও ঘুরে দেখেন তিনি। মণ্ডপে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান এবং ভক্তদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
এ সময় উপস্থিত দর্শনার্থী ও ভক্তদের অনুরোধে হাসিমুখে তাঁদের সঙ্গে সেলফিও তোলেন প্রধানমন্ত্রী। রংপুরের পর তিনি রাজশাহীর ধর্মসভা মন্দিরের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। সেখানে পূজারিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানান। রংপুর ও রাজশাহীর দুটি মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে মঙ্গলবার রাত ৮টা ২০ মিনিটে জে এম সেন হলে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর শাখা গত ৪০ বছর ধরে জে এম সেন হলে দুর্গাপূজার আয়োজন করে আসছে। পরিষদের নেতারা জানান, এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী জে এম সেন হলে দুর্গাপূজা দেখতে এলেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনে পূজামণ্ডপের উৎসবের আনন্দ আরও বেড়ে যায়। সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে উলুধ্বনি দিয়ে তাঁকে মণ্ডপে স্বাগত জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর যেমন ঐতিহাসিক ছিল, তেমনি এসব এলাকায় পূজা উপলক্ষে দেওয়া তাঁর বক্তব্যও ছিল যুগান্তকারী। বক্তব্যে তিনি বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রূপকল্প তুলে ধরেন। তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে দেশকে বদলে দেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তিন জেলায় দেওয়া তাঁর বক্তব্যে তার প্রতিফলন দেখা যায়। বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিভিন্ন ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে দেশকে স্বাধীন করার জন্য লড়াই করেছিল। পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও সব ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমেছিল।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই আন্দোলনেও দল, মত, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিল।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। ভবিষ্যতেও যাতে সবাই শান্তিতে বসবাস করতে পারে, সে পরিবেশ বজায় রাখার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, আগামী দিনে আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, তাহলে সব ধর্ম ও মতের মানুষকে একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। এভাবেই আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তারেক রহমান বলেন, জনগণ দেশে স্থিতিশীলতা চায় এবং শান্তিতে ও নিরাপদে থাকতে চায়। সরকারও সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।
এই বক্তব্যকে তারেক রহমানের প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি যে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন, এখন তা বাস্তবায়নের কাজ করছেন। সরেজমিনে এবারের দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রমাণ করেছেন, তিনি সবার জন্য বাংলাদেশ গড়ার কারিগর।
এস এম/ ২২ অক্টোবর ২০২৬




