১৯০২ সালে যার কণ্ঠে শুরু হয়েছিল উপমহাদেশের গ্রামোফোন রেকর্ডের যুগ

কলকাতা, নভেম্বর ১৯০২। একটি অস্থায়ী রেকর্ডিং কক্ষ। সামনে বিশাল চোঙের মতো যন্ত্র। নেই মাইক্রোফোন, নেই আধুনিক স্টুডিও কিংবা শব্দ সম্পাদনার সুযোগ। সেই চোঙের সামনে বসে গান ধরলেন এক তরুণী। মাত্র কয়েক মিনিটের পরিবেশনা। গান শেষ হতেই নিজের পরিচয় ঘোষণা করলেন ইংরেজিতে: ‘মাই নেম ইজ গহরজান!’
সেই কণ্ঠস্বর শুধু একজন শিল্পীর পরিচয় বহন করেনি। হয়ে উঠেছিল ভারতীয় উপমহাদেশের বাণিজ্যিক গ্রামোফোন রেকর্ডের সূচনাপর্বের অন্যতম ঐতিহাসিক দলিল।
শিল্পীর নাম গহরজান। সংগীতের ইতিহাসে তিনি পরিচিত ‘গহরজান অব ক্যালকাটা’ নামে। ১৯০২ সালের নভেম্বরে তার কণ্ঠ ধারণের মধ্য দিয়ে কলকাতায় শুরু হয় ভারতীয় শিল্পীদের বাণিজ্যিক গ্রামোফোন ডিস্ক রেকর্ডিংয়ের এক নতুন যুগ।
এই ঐতিহাসিক রেকর্ডিংয়ের তারিখ হিসেবে ৫ নভেম্বরের উল্লেখ পাওয়া যায় বেশিরভাগ বিবরণে। তবে কিছু গবেষণা ও সংবাদসূত্রে ২, ৫ ও ১১ নভেম্বরের তথ্য রয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট দিনটি নিয়ে মতভিন্নতা থাকলেও ১৯০২ সালের নভেম্বর এবং গহরজানের অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে ঐতিহাসিক গুরুত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত।
কে ছিলেন গহরজান?
১৮৭৩ সালের ২৬ জুন উত্তর ভারতের আজমগড়ে জন্ম গহরজানের। জন্মের সময় তার নাম ছিল অ্যাঞ্জেলিনা ইয়োয়ার্ড। তার মা ভিক্টোরিয়া হেমিংস পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করে মলকাজান নাম নেন। অ্যাঞ্জেলিনার নাম হয় গহরজান।
মা মলকাজান ছিলেন সংগীত ও নৃত্যজগতের পরিচিত ব্যক্তিত্ব। মায়ের হাত ধরেই গহরজানের সংগীতজীবনের সূচনা।
শৈশব ও কৈশোরে বেনারসের সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তিনি। পরে মায়ের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন। উনিশ শতকের শেষভাগে কলকাতা ছিল উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এখানে ধ্রুপদি সংগীত, ঠুমরি, দাদরা, গজল ও নৃত্যচর্চার সমৃদ্ধ পরিমণ্ডলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন গহরজান।
পাতিয়ালার কালে খান, আলী বখশ জার্নাইলসহ বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞদের কাছে তালিম নেন তিনি। কথক নৃত্যেও প্রশিক্ষণ লাভ করেন।
ক্রমে কলকাতার সংগীতানুষ্ঠান, অভিজাত আসর এবং বিভিন্ন রাজদরবারে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তার কণ্ঠ, সংগীতের বৈচিত্র্য এবং মঞ্চে উপস্থিতি তাকে সেই সময়ের অন্যতম আলোচিত শিল্পীতে পরিণত করে।
কলকাতায় এলেন রেকর্ডিংয়ের পথিকৃৎ
উনিশ শতকের শেষদিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় শব্দ ধারণের প্রযুক্তি দ্রুত বিকশিত হচ্ছিল। কিন্তু ভারতীয় সংগীতের বিশাল জগৎ তখনো মূলত সরাসরি পরিবেশনার ওপর নির্ভরশীল।
এই পরিস্থিতি বদলাতে ১৯০২ সালে কলকাতায় আসেন ব্রিটিশ গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ডিং বিশেষজ্ঞ ফ্রেডরিক উইলিয়াম গাইসবার্গ।
তার লক্ষ্য ছিল ভারতীয় শিল্পীদের গান রেকর্ড করা এবং সেই রেকর্ড বাজারজাত করা।
তবে কাজটি সহজ ছিল না। আধুনিক রেকর্ডিং স্টুডিওর ব্যবস্থা তখন কলকাতায় ছিল না। শিল্পীদের অনেকেই নতুন প্রযুক্তির বিষয়ে অনিশ্চিত ছিলেন। আবার দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশিত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে কয়েক মিনিটের রেকর্ডে ধারণ করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
এই পরিস্থিতিতে গহরজান হয়ে ওঠেন গাইসবার্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী।
তিন মিনিটে সংগীতের নতুন ভাষা
সেই সময় গ্রামোফোনের এক পিঠে সাধারণত প্রায় তিন মিনিটের শব্দ ধারণ করা যেত। অথচ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি পরিবেশনা অনেক সময় দীর্ঘ সময় ধরে চলত।
গহরজান এই প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে গ্রহণ করে নিজের পরিবেশনার ধরন বদলে ফেলেন।
রাগের পরিচয়, সুরের বিস্তার, তান ও সংগীতের আবেগ; সবকিছু অল্প সময়ের মধ্যে তুলে ধরার দক্ষতা অর্জন করেন তিনি।
এর ফলে দীর্ঘ আসরনির্ভর সংগীত নতুন এক শ্রোতাসমাজের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়।
গহরজানের রেকর্ডে ঠুমরি, দাদরা, খেয়ালসহ নানা ধরনের সংগীত স্থান পায়। তার এই সংক্ষিপ্ত পরিবেশনার ধরন পরবর্তী সময়ে গ্রামোফোন রেকর্ডের জন্য সংগীত পরিবেশনার রীতিতেও প্রভাব ফেলে।
‘মাই নেম ইজ গহরজান!’
গহরজানের রেকর্ডিংয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত বৈশিষ্ট্য ছিল গান শেষে নিজের নাম ঘোষণা করা।
তখনকার রেকর্ডিং প্রযুক্তিতে গান ধারণের পর ডিস্ক তৈরি ও বাজারজাত করার বিভিন্ন পর্যায়ে শিল্পীর পরিচয় শনাক্ত করার প্রয়োজন হতো।
গহরজান গান শেষে উচ্চস্বরে বলতেন, ‘মাই নেম ইজ গহর জান!’
এই ঘোষণাই পরবর্তী সময়ে তার সংগীতজীবনের স্বতন্ত্র পরিচয় হয়ে ওঠে।
আজকের দিনে গান শুনতে গিয়ে শিল্পীর নাম দেখা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সেই যুগে একজন নারী শিল্পীর নিজের কণ্ঠে নিজের পরিচয় ঘোষণা ছিল সংগীত রেকর্ডিংয়ের ইতিহাসে স্মরণীয় ঘটনা।
রেকর্ডিং থেকে সংগীতের বাজার
গহরজানের প্রথম দিককার রেকর্ডগুলো ছিল সাত ইঞ্চি ব্যাসের এক পিঠে গান ধারণ করা ডিস্ক।
কলকাতায় রেকর্ডিং সম্পন্ন হওয়ার পর সেগুলোর মাস্টার ইউরোপে পাঠানো হতো। জার্মানির হ্যানোভারে ডিস্ক তৈরি করে আবার ভারতীয় বাজারে পাঠানো হতো বিক্রির জন্য।
১৯০৩ সাল থেকেই তার রেকর্ড বাণিজ্যিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে।
এর ফলে সংগীত শোনার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন আসে। আগে কোনো বিখ্যাত শিল্পীর গান শুনতে হলে সরাসরি তার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে হতো। গ্রামোফোন সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে দেয়।
এখন একটি ডিস্ক ঘরে এনে একই গান বারবার শোনার সুযোগ তৈরি হলো।
গহরজানের কণ্ঠ তাই কলকাতার সংগীতের আসর ছাড়িয়ে পৌঁছে যেতে থাকে বহু দূরের শ্রোতার কাছে।
ছয় শতাধিক গান, বহু ভাষায় বিস্ময়কর যাত্রা
গহরজানের সংগীতজীবনের বিস্তার ছিল অসাধারণ।
গবেষকদের হিসাবে, ১৯০২ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে তিনি প্রায় ৬০০টি গান রেকর্ড করেন। হিন্দুস্তানি, বাংলা, উর্দু, আরবি, সংস্কৃতসহ বহু ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি।
তার রেকর্ডে যেমন শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতা ছিল, তেমনি ছিল জনপ্রিয় সংগীতের আবেদন।
গহরজান ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম পরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তার ছবি ছাপা হতো পোস্টকার্ডে। সংগীতের পাশাপাশি তার পোশাক, জীবনযাপন ও সামাজিক উপস্থিতিও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল।
তবে এই সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘ সাধনা এবং এমন এক সমাজের বাস্তবতা, যেখানে পেশাদার নারী শিল্পীদের প্রতিভা স্বীকৃতি পেলেও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে নানা বৈষম্য ছিল।
একজন নারীর কণ্ঠে প্রযুক্তির ইতিহাস
গহরজানের রেকর্ডিংয়ের গুরুত্ব শুধু সংগীতের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়।
এটি নারী শিল্পীদের পেশাগত ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ।
উনিশ শতক ও বিশ শতকের গোড়ায় ভারতীয় উপমহাদেশে অনেক নারী শিল্পী সংগীত ও নৃত্যচর্চার প্রধান ধারক ছিলেন। অথচ তাদের অনেকের নামই পরবর্তী সময়ে সাংস্কৃতিক ইতিহাস থেকে আড়ালে চলে যায়।
গ্রামোফোন রেকর্ড সেই শিল্পীদের কণ্ঠ সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি করে।
গহরজানের রেকর্ডিং প্রমাণ করে, নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে একজন শিল্পী কীভাবে নিজের শিল্পকে বৃহত্তর শ্রোতাসমাজের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।
তার রেকর্ড আজও গবেষক, সংগীতশিল্পী ও সংগ্রাহকদের কাছে মূল্যবান ঐতিহাসিক সম্পদ।
শেষ জীবন এবং হারিয়ে না যাওয়া কণ্ঠ
দীর্ঘ সংগীতজীবনে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও গহরজানের শেষ জীবন ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা।
জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি মহীশূরের রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতা পান। ১৯৩০ সালের ১৭ জানুয়ারি মহীশূরে তার মৃত্যু হয়।
তত দিনে গ্রামোফোন রেকর্ড ভারতীয় সংগীতজগতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। কলকাতা থেকে শুরু হওয়া সেই বাণিজ্যিক রেকর্ডিংয়ের ধারা ছড়িয়ে পড়েছে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
পরবর্তী সময়ে বাংলা গান, নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, লোকসংগীত ও আধুনিক গানের বিকাশেও গ্রামোফোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১২৪ বছর পরও যে কণ্ঠ ইতিহাসের সাক্ষী
আজ গান শোনার মাধ্যম বদলে গেছে। গ্রামোফোন থেকে রেডিও, ক্যাসেট, সিডি হয়ে সংগীত পৌঁছেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে।
একটি মোবাইল ফোনেই এখন পৃথিবীর অসংখ্য গান শোনা যায়।
কিন্তু এই দীর্ঘ প্রযুক্তিগত যাত্রার শুরুর দিকে যে শিল্পীরা নিজেদের কণ্ঠ রেকর্ডে ধারণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে গহরজানের স্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১৯০২ সালের নভেম্বরের কলকাতায় মাত্র কয়েক মিনিটের একটি গান হয়ে উঠেছিল সংগীত সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিক প্রচারের নতুন ইতিহাসের অংশ।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে আজও সেই রেকর্ড আমাদের শোনায় শুধু সংগীত নয়, একটি যুগের কণ্ঠস্বর।
আর গান শেষে উচ্চারিত সেই পরিচয়: ‘মাই নেম ইজ গহর জান!’ আজও মনে করিয়ে দেয় ভারতীয় উপমহাদেশের রেকর্ডসংগীতের এক অগ্রদূতকে।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…




