অনিয়মে বন্ধ উন্নয়ন প্রকল্প, ভোগান্তিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা | বাংলাদেশ

অনিয়মে বন্ধ উন্নয়ন প্রকল্প, ভোগান্তিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা | বাংলাদেশ

<![CDATA[

তিন বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ আছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের তিনটি কাজ। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে ২০১৯ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কাজ বন্ধ করে দিলেও আজও তা চালু হয়নি। এতে আবাসন ও গবেষণা কাজে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। সমস্যার সমাধান করে দ্রুত কাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন তারা।

জানা যায়, ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়াল কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রকল্পের নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকল্পের নকশা ও পরামর্শক পরিবর্তন এবং নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে নতুন করে বরাদ্দের আবেদন জানালে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। 

 

তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলেও বন্ধ হয়ে যাওয়া কাজ চালু করতে বর্তমান প্রশাসনের তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। 

 

প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে দুর্নীতির চেষ্টা

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপাচার্য ড. একেএম নুর-উন নবীর সময়ে প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগোচ্ছিল। ১০ তলা শেখ হাসিনা হল, ড. ওয়াজেদ রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ভবন ও স্বাধীনতা স্মারকের কাজে গতি ছিল বেশ। 

 

তবে পরবর্তী উপাচার্য হিসেবে যোগ দিয়ে ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ নির্মাণাধীন দুটি ভবনের নকশা পরিবর্তন ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করে তিনগুণ পর্যন্ত বাড়তি বরাদ্দের আবেদন করেন।

 

ড. ওয়াজেদ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভবন নির্মাণ ব্যয় ২৬ কোটি ৮৭ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৬০ কোটি ৯৯ লাখ, শেখ হাসিনা হলের বরাদ্দ ৫১ কোটি ৩৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং স্বাধীনতা স্মারকের নির্মাণ ব্যয় এক কোটি ৩০ লাখ থেকে বাড়িয়ে চার কোটি ৩০ লাখ টাকা প্রস্তাব করেন ড. কলিমউল্লাহ।

 

আরও পড়ুন: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

 

এ ঘটনায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে ইউজিসিকে তদন্তের নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মণ্ডল বলেন, সাবেক উপাচার্য ড. কলিমউল্লাহ শেখ হাসিনা হল, ড. ওয়াজেদ রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের নকশা পরিবর্তন ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করেন। এছাড়া এ কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে তিনগুণ পর্যন্ত বাড়তি বরাদ্দ চান। এসব কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়।

 

নষ্ট হচ্ছে নির্মাণ সামগ্রী

এদিকে দীর্ঘ দিন ধরে নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকায় নষ্ট হচ্ছে অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে নানা উপকরণ। নির্মাণাধীন শেখ হাসিনা হল ও ড. ওয়াজেদ রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ভবন দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা প্রহরী রাসেল মিয়া ও হোসেন আলী জানান, নির্মাণাধীন ভবনের রড, বাঁশ, কাঠসহ অন্যান্য সামগ্রী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এগুলো পরবর্তীতে আর ব্যবহার করা যাবে না। যতদিন ধরে বন্ধ আছে, ততদিনে ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে যেতো বলে জানান তারা।

 

ব্যাহত হচ্ছে গবেষণা কাজ

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কাজে গতি আনতে সরকার ড. ওয়াজেদ রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের নির্মাণ কাজ শুরু করে। তবে নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। এতে ব্যাহত হচ্ছে গবেষণা কার্যক্রম।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী রবীন্দ্রনাথ রায় বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো গবেষণা। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সে গবেষণার জন্য ভবন না থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মৌলিক কাজে আগ্রহী হচ্ছেন না। 

 

আরও পড়ুন: বেগম রোকেয়া পদক পেলেন ৫ নারী

 

ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শুভ ইসলাম বলেন, নির্মাণাধীন গবেষণা ইনস্টিটিউট ভবন, স্বাধীনতা স্মারক ও হলের অর্ধনির্মিত কাজ পুনরায় চালু হওয়া দরকার। এগুলোর কাজ শেষ হলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবেন।

 

অনিয়মের বিচার দাবি 

প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পে দুর্নীতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে পিছিয়ে দেয়া হয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষকরা। বন্ধ কাজ দ্রুত চালু ও প্রকল্পের অনিয়মের ঘটনায় তৎকালীন উপাচার্যের বিচারের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক নেতারা।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন, ‘ড. নাজমুল আহসান করিমউল্লাহ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম করে যে ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন, সেজন্য তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার। যেন কোনো উপাচার্য এমন কাজ করার সাহস না পান।’

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বৃহৎ সংগঠন অধিকার সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. মতিউর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ থমকে থাকায় একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অন্যদিকে ভোগান্তিতে আছেন শিক্ষার্থীরা। তাই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যেন কাজগুলো দ্রুত চালু করা হয়।’

 

কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার অভিযোগ

অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষী ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়ে প্রকল্পের কাজ দ্রুত চালু করা যেতো বলে জানান শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতারা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার কারণে তা হয়নি বলে মনে করছেন তারা।

 

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া ও সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ শামীম জানান, সাবেক উপাচার্য প্রকল্পের কাজে দুর্নীতি করায় কাজগুলো বন্ধ আছে। তবে দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকা মোটেই কাম্য নয়। 

 

তারা আরও অভিযোগ করেন, বর্তমানে উপাচার্য কাজগুলো চালুর বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেননি। সরকারের এত বড় একটি প্রজেক্টে দুর্নীতি হওয়ার পরও কারো শাস্তি হয়নি, এটা লজ্জার বিষয়। আমাদের দাবি কাজগুলো যেন দ্রুত চালু হয়।

 

আরও পড়ুন: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ওপর হামলায় প্রতিবাদ

 

যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ

অগ্রাধিকার প্রকল্পের কাজ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা এবং তা চালু করতে কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশীদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

 

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী ও জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে শুরু করার চেষ্টা চলছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী শাহরিয়ার আকিফ বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কথা হয়েছে। খুব দ্রুত বন্ধ কাজগুলো চালু করা হবে বলে শিক্ষামন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন।’ 

 

জনসংযোগ দফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ চালুর জন্য বর্তমান প্রশাসন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে। আশা করছি খুব দ্রুত কাজগুলো চালু হবে।’

 

উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ হাসিনা হল ও ড. ওয়াজেদ রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের পাঁচ তলা পর্যন্ত নির্মাণ হয়েছে। অন্যদিকে ৯০ শতাংশ শেষ হওয়ার পর বন্ধ আছে স্বাধীনতা স্মারকের কাজ। 

]]>