<![CDATA[
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সাড়াশি অভিযান শুরু করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এ সময় তারা হাজার হাজার নারীকে বন্দিশিবিরে ধরে নিয়ে যায় এবং মাসের পর মাস তাদের ওপর চালানো হয় বর্বর নির্যাতন। সেনা ক্যাম্পে সেসব নির্যাতন ও নিপীড়নের কাহিনী বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাধ্যমে কম-বেশি উঠে এসেছে।
মুক্তিযুদ্ধের ৫২ বছর পর মুখ খুলেছেন পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফেরা আরও দুই নারী। তাদের সেই রোমহর্ষক বর্ণনা উঠে এসেছে ব্রিটেনের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে।
নূর জাহান ও রাজিয়া বেগম নামে দুই নারীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছে। পাকিস্তানি সেনারা কীভাবে মেয়েদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করত তার হাড় হিম করা বর্ণনা দিয়েছেন নূর জাহান।
যুদ্ধ সময়ের অবস্থা তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক মাস আগেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুদ্ধের আঁচ এসে পড়েছে পদ্মা পাড়ের শহর রাজশাহীতেও, তখন গ্রীষ্মকাল। সেদিন ছোট বোনের সঙ্গে বাড়ির উঠানে খেলছিলেন ১৪ বছর বয়সী নূর জাহান। এমন সময় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি সামরিক ট্রাক তাদের খামারবাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ায়।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই কিশোরী মেয়েকে ধরে ট্রাকের পেছনে তোলে সশস্ত্র সেনারা। তারা দেখতে পান, সেখানে (ট্রাকে) আগে থেকেই হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আছেন আরও কয়েকজন নারী।
আরও পড়ুন: হারিয়ে যাওয়া বীরাঙ্গনার খোঁজে
বর্তমানে নূর জাহানের বয়স ৬৫। সেই মুহূর্তটি স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের নিচের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকতে বলল।’ নূর জাহান জানান, ট্রাকটি ছোট ছোট শহরের মধ্যদিয়ে চলতে থাকে। মাঝে মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য থামায়। নতুন করে আরও কয়েকজন নারী ও কিশোরী মেয়েকে ট্রাকে তোলে যেন গরু-ছাগল তুলছে। সবাই ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল। ভয়ে কেউ টু শব্দটিও করছিল না।
তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণাই ছিল না। আমি তাকিয়ে দেখলাম, আমাদের চিরচেনা রাস্তা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আমি বোনের হাতটি শক্ত করে ধরে ছিলাম আর পুরোটা সময় ভয়ে কাঁপছিলাম। আমরা আগেই বাংলার কসাই (বুচার অব বেঙ্গল) আর তার লোকদের কথা শুনেছিলাম।’
বুচার অব বেঙ্গল বলা হত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কমান্ডার জেনারেল টিক্কা খানকে। তার নির্দেশেই রাজধানী ঢাকায় ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চালানো হয়। যে কারণে ‘বাংলার কসাই’ নামে কুখ্যাত হয়ে ওঠেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসজুড়ে দেশজুড়ে যে গণহত্যা চলে তার শুরু হয় মূলত ওই অভিযানের মধ্যদিয়ে।
আরও পড়ুন: মিরপুরের বস্তিতে থাকছেন বীরাঙ্গনা ভানু বিবি!
তবে পাকিস্তানি বাহিনীর আরেক নৃশংস কৌশলের শিকার হতে হয় নূর জাহানদের। হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি বাঙালি নারী ও কিশোরী মেয়েদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো অপরাধ শুরু করে পাক সেনারা। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, টিক্কা খানের সরাসরি নির্দেশেই এই নীতি গ্রহণ করা হয়।
অবশেষে যখন ট্রাক থামল, মেয়েরা দেখল, তাদেরকে একটি সেনা ছাউনিতে আনা হয়েছে। যেখানে তাদের জন্য পরবর্তী কয়েকটা মাস ছিল জাহান্নামের মতো। নূর জাহান বলেন, ‘অন্ধকার একটা ঘরে আমাদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল।’
তার কথায়, ‘সেখানে ২০ অথবা ৩০ জনের মতো ছিলাম আমরা। সেখানে আমরা মরার মতো পড়ে থাকতাম। একবারই মাত্র আমরা আলো দেখতে পেতাম, যখন দরজা একটু খোলা, সেনারা আসত। এরপর শুরু হত ধর্ষণ।’
নূর জাহানদের যে ক্যাম্প বা বন্দিশিবিরে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশজুড়ে এমন বহু বন্দিশিবির স্থাপন করা হয়েছিল। এসব শিবিরে নারী ও অল্প বয়সী মেয়েদের ধরে এনে মাসের পর মাস ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হত।
আরও পড়ুন: আরও ১৬ বীরাঙ্গনা পেলেন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি
সরকারি ও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই থেকে চার লাখ নারী পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার বিপুলসংখ্যক নারীর সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকার তাদের বীরাঙ্গনা বা সাহসী নারী উপাধি দেয়।
বীরাঙ্গনা হিসেবে সম্মানিত হওয়ার পরেও বেশিরভাগ নির্যাতিত নারী তাদের পরিবারে পরিত্যক্ত হয়েছিলেন। এমনকি তাদেরকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। ফলে সামাজিক চাপে অনেকেই তাদের নিপীড়নের কথা চেপে যান। তবে সেসব নারীরাও মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
তেমনই একজন নারী বর্তমান ঢাকার তেজাগাঁও এলাকার রাজিয়া বেগম। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাস। রাজিয়া বেগম তার স্বামী আবু সরকারকে খুঁজতে বের হয়েছিলেন। কয়েকদিন ধরে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই স্বামীর খোঁজে তেজতুরি বাজারের পরিত্যক্ত রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তিনি।
ওই রাস্তায় ফল বিক্রি করতেন আবু সরকার। একদিন ওই রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে পাক সেনাদের সামনে পড়ে যান রাজিয়া বেগম। দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার আগেই তার মাথায় পড়ে রাইফেলের আঘাত। সেদিনের সেই রাইফেলের আঘাতের দাগ আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।
আরও পড়ুন: রংপুরে ৫০ বীরাঙ্গনাকে সংবর্ধনা জানাল ‘ফিরে দেখা’
২৬ বছর বয়সী গৃহবধূ রাজিয়া বেগমকে কাছেই একটি জঙ্গলে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে আটকে রেখে কয়েক সপ্তাহ ধরে ধর্ষণ করা হয়। সেনারা কাছাকাছি অবস্থান করত এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে ফিরে আসত।
বর্তমানে ৭৮ বছর বয়সী রাজিয়া বেগম ৫২ বছর আগের সেই ভয়াল অভিজ্ঞতা স্মরণ করে বলেন, ‘তারা আমাকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখত এবং একের পর এক পালাক্রমে ধর্ষণ করত।’ এভাবে ধর্ষণ শেষে একদিন তাকে মৃত ভেবে একটি অগভীর খাদে ফেলে দেয়া হয়।
এক পথচারী তাকে খুঁজে পায় এবং একটি অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরে নিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধকালে এ ধরনের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রায় প্রতিটি জেলাতেই স্থাপন করা হয়েছিল। রাজিয়া বেগম জানান, তার স্বামী তাকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করতে শুরু করেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেও খোঁজ করেন। চারটা আশ্রয়কেন্দ্র খোঁজার পর অবশেষে তাকে খুঁজে পান ও বাড়ি নিয়ে যান।
রাজিয়া বেগম স্বামী ও সংসার ফিরে পেলেও তার সঙ্গে যা ঘটেছিল, তার আর সারাজীবনে ভুলতে পারেননি। যেমনটা তার কথায় উঠে এসেছে।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে যা হয়েছে তা নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে না। কিন্তু এত বছর পরও সেসব দিনের কথা ভুলে যাওয়া আমার পক্ষে কঠিন। আমি এখনও মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখি।’
]]>



