নিখোঁজদের পরিবারের আবেগকে পুঁজি করছে ‘মায়ের ডাক’ | বাংলাদেশ

নিখোঁজদের পরিবারের আবেগকে পুঁজি করছে ‘মায়ের ডাক’ | বাংলাদেশ

<![CDATA[

গুম-খুনের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি সহানুভূতিকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে উৎখাতে সহায়তা করাই ‘মায়ের ডাক’-এর মূল লক্ষ্য। সম্প্রতি ইন্ডিয়া টুডের একটি প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি পরিবারের বরাত দিয়ে এমনটাই জানানো হয়েছে।

পরিবারগুলোর অভিযোগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির পক্ষে পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন যোগাতে নিখোঁজদের স্বজনদের আবেগকে পুঁজি করছে ‘মায়ের ডাক’।

 

জানা যায়, মায়ের ডাক আর্জেন্টিনার মাদারস অব দ্য মায়ো’র আদলে প্রতিষ্ঠিত, যা আর্জেন্টিনার মায়েদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যাদের সন্তান ১৯৭৬ এবং ১৯৮৩ সালের মধ্যে সামরিক স্বৈরশাসনের সময় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদীদের হাতে ‘নিখোঁজ’ হয়েছিল।

 

বর্তমানে এ সংগঠনটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার উৎখাতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে বিরোধীদের সমাবেশে নিয়ে আসছে। 

 

ইন্ডিয়া টুডেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, আবেগকে পুঁজি করে সংগঠনটি সরকার পরিবর্তনের এজেন্ডা বাস্তয়াবয়নে কাজ করছে, যা তাদের কর্মকাণ্ড দেখলেই স্পষ্ট।

 

দেশের বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মীদের মতে, একটি গুমের ঘটনাও দুঃখজনক। তবে অনেক সময় দেখা যায় বিভিন্ন কারণে কেউ আত্মগোপন করে থাকেন। যারা পরে আবার ফিরে আসছেন। অনেক সময় এসব ঘটনাকে বিরোধীরা সরকারবিরোধী প্রচারণায় ব্যবহার করছে। 

 

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বরিশাল শাখার একজন নেতা শফিক উল্লাহ মোনায়েম। তিনি ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নিখোঁজ হন। ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ সক্রিয় সমর্থন দিয়েছিল। ওই সব দেশ নিজেদের পছন্দমতো দলকে সরকারে আনতে বিভিন্ন সময় অস্ত্র হিসেবে মানবাধিকার ইস্যুকে ব্যবহার করে থাকে।

 

ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের নানা অভিযোগে কারাগারে প্রবেশ করায়। একপর্যায়ে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস ‘নাগরিক শক্তি’ নামে দল গঠন করে নবম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে চান। এজেন্ডা বাস্তবায়নে দেশের দুটি পত্রিকাও সক্রিয় ভূমিকা রাখে। যদিও শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রত্যাখ্যানের মুখে তাদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।   

 

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। তবে মোনায়েমের খোঁজ পায়নি তার পরিবার। ২০১৩ সালে মায়ের ডাক প্রতিষ্ঠিত হলে মোনায়েমের পরিবারে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছিল।

 

আরও পড়ুন: রাজনৈতিক সংগঠনের মতো তৎপর ঢাকার মার্কিন দূতাবাস

 

মোনায়েমের বাবা আরও বেশ কিছু ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে অপরাধীদের বিচারের আশায় এই প্ল্যাটফর্মে যোগ দিয়েছিলেন। নূর খান লিটন, আদিলুর রহমান খান শুভ্র, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অধ্যাপক আসিফ নজরুল এবং অধ্যাপক সিআর আবরারের মতো তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ মানবাধিকার কর্মীদের একটি দল ‘মায়ের ডাক’-এর পক্ষে মাঠে নামেন। নিখোঁজদের ফিরে পেতে সহায়তা করারও অঙ্গীকার করেছিলেন তারা।

 

২০১৬ সালের দিকে রাজধানীর একটি বাসা থেকে মোয়াজ্জেম হোসেন তপু নামে আরেকজন নিখোঁজ হন। তার বৃদ্ধ মা-ও ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার আশায় এ প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হন। তবে তিনিও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হন। একইভাবে আট বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল থেকে নিখোঁজ আরেক যুবকের পরিবারও আশার আলো দেখেছিল। তবে এখন তারা হতাশ। 

 

নিখোঁজ এক ভুক্তভোগীর ভাই বলেন, প্ল্যাটফর্মকে দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখার সব অঙ্গীকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজনদের অভিযোগ, তারা আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষ্য করেছে যে, প্ল্যাটফর্মটি বাংলাদেশের মানবাধিকার ইস্যুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বিরোধীদের পশ্চিমা সমর্থনে কাজ করছে।’

 

তাদের মধ্যে যারা মায়ের ডাকের বিভিন্ন সভা, প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিয়েছে তারা দেখতে পান যে, প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করে বিরোধী নেতারা হাসিনা সরকারকে আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছেন এবং সমস্ত গুমের জন্য তাকে দায়ী করছেন।

 

মায়ের ডাক ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তখন প্রায় ভুক্তভোগী ৮০টি পরিবার এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হলেও বর্তমানে মাত্র ১৯টি পরিবার এ সংগঠনের ব্যানারে রয়েছে। জনসাধারণের নজরে আনতে বাংলাদেশের বিরোধী দলের সমাবেশগুলোতে প্রায়ই তাদের সামনে রাখা হয়।

 

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ‘নিখোঁজ প্রতিটি ঘটনাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে তদন্ত করা দরকার, যাতে কেউ নিখোঁজ না থাকে বা যারা বলপূর্বক গুমের শিকার হন তারা যেন ন্যায়বিচার পান।’

 

আরও পড়ুন: নিজ স্বার্থে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ড. ইউনূস: অধ্যাপক আরাফাত

 

মোনায়েমের বাবার ভাগ্যের প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক মিজান বিরোধী দলের ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন,  নিহতদের পরিবারের আবেগকে পুঁজি করে কাজ করছে তারা। 

 

অধ্যাপক মিজান বলেন, একজন অধিকার কর্মী হিসেবে এটা দেখা দুঃখজনক। কারণ একজনের অধিকারের বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত না। নিকটাত্মীয়দের হারিয়েছেন এমন পরিবারের আবেগ নিয়ে কোনো পক্ষের খেলা করার অধিকার নেই। 

 

বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তৈরি মায়ের ডাক প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা হাজেরা খাতুন। তার ছেলে সাজেদুল ইসলাম সুমন ঢাকার একজন সুপরিচিত বিএনপি নেতা ছিলেন। তিনি ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন। সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম এই প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ক।

 

এ প্ল্যাটফর্মটিকে ব্যবহার করে সানজিদা ইসলাম সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে শামিল হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। 

 

আরও পড়ুন:  জিয়ার আমলে সাদা মাইক্রোতে উঠে কেউ আর ফেরেনি: প্রধানমন্ত্রী

 

নিখোঁজ অনেকেই আবার ফিরে আসেন

ইডিয়া টুডের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি প্রায়ই উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠনকে। বিশেষ করে ‘নিখোঁজ’ বা ‘গুম’ হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে। তবে সরকারের বিরুদ্ধে এ ধরনের ঢালাও অভিযোগ যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা প্রমাণিত হয়েছে ‘নিখোঁজ’ অনেক ব্যক্তির ফিরে আসার মধ্য দিয়ে।

 

অনেককে দেখা যায় যারা পরে ফিরে এসেছেন, তারা জঙ্গিবাদে যোগদান কিংবা পারিবারিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে আত্মগোপনে চলে যান। 

 

সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২-এর উপনির্বাচনে বিএনপির সাবেক নেতা ও নির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু আসিফ আহমেদ নির্বাচনের আগে ছয় দিন নিখোঁজ ছিলেন। পরে তিনি বাসায় ফিরে দাবি করেন, নিজের ইচ্ছায় আত্মগোপন করেছেন।

 

এছাড়া, নিষিদ্ধ সংগঠন জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শরক্বীয়ার সামরিক কমান্ডার মাসিকুর রহমান ওরফে রণবীরের মোবাইল ফোন থেকে উদ্ধার একটি ভিডিও অন্তত ৯টি পরিবারকে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।

 

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এ ধরনের বিতর্কিত এবং পক্ষপাতদুষ্ট মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনের ওপর কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে, বৈশ্বিক সংস্থাগুলোকেও সঠিক চ্যানেল এবং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা দরকার। 

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটন মায়ের ডাকের মতো সংগঠনগুলোর অভিযোগগুলোকে যাচাই করছে না। বরং অধিক গুরুত্ব দিয়ে তারা অনেক কিছু যাচাই না করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এ অবস্থায় প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকে আরও সতর্কভাবে এসব তথ্য যাচাইয়েরও আহ্বান জানান তারা।

 

]]>