সিলেটে সাপের উপদ্রব বাড়লেও নেই অ্যান্টিভেনম | বাংলাদেশ

সিলেটে সাপের উপদ্রব বাড়লেও নেই অ্যান্টিভেনম | বাংলাদেশ

<![CDATA[

সিলেটে বর্ষা মৌসুমে বিষধর সাপের উপদ্রব বাড়লেও উপজেলা পর্যায়ে নেই প্রতিষেধক টিকা- অ্যান্টিভেনম। এতে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসার পথেই মৃত্যু হচ্ছে আক্রান্তদের। আবার সাপে কামড়ের পর মানুষের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণেও হচ্ছে প্রাণহানি।

গত ৮ আগস্ট সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ইয়াগুল এলাকার সফিক উদ্দিনের শিশুকন্যা শাহিনা বেগমকে সাপে কামড় দিলে নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু সেখানে প্রতিষেধক টিকা অ্যান্টিভেনম না থাকায় ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনার পর থেকে আতঙ্কিত স্থানীয়রা। তারা বলছেন, বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে সাপের উপদ্রব বাড়লেও হাসপাতালে প্রতিষেধক টিকা না থাকায় তৈরি হয়েছে ঝুঁকি।

জাহিদ উদ্দিন নামের একজন বলেন, গোলাপগঞ্জ উপজেলা অনেক বড়। এমন অনেক এলাকা আছে যেখান থেকে ৩ ঘণ্টায়ও ওসমানী মেডিকেল নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। সেক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিৎ।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিন থেকে চার লাখ জনসংখ্যার একটি উপজেলায় প্রতি বছর ৩ থেকে চারটি প্রতিষেধক টিকা আসলেও সেগুলোর প্রয়োগেও থেকে যায় নানা জটিলতা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এবছর এখনও জেলার কোন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই পৌঁছেনি সাপে কাটার প্রতিষেধক টিকা অ্যান্টিভেনম। চাহিদা পাঠানো হয়েছে। তবে লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় টিকার প্রয়োগ করতে ঝুঁকি নিতে চান না চিকিৎসকরা।

আরও পড়ুন: সাপের কামড়ে প্রাণ গেল প্রবাসীর স্ত্রীর

সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. এসএম শাহরিয়ার জানান, বিষধর সাপের কামড়ের প্রতিষেধক টিকার চাহিদা পাঠানো হয়েছে ৬৫০ ডোজ। কিন্তু এসব টিকা প্রয়োগের পর যেকোনো ধরণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মোকাবিলায় সময় নষ্ট না করে সাপেকাটা রোগীদের ওসমানী মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে নিয়ে আসার পরামর্শ তার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন মতে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ সাপের ছোবলের শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে প্রায় ২৫-২৭ লাখ মানুষের শরীরে বিষ প্রবেশে প্রায় দেড় লাখের মৃত্যু ও প্রায় পাঁচ লাখ লোক অন্ধ ও চিরস্থায়ী পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। আফ্রিকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাপে কাটার ঘটনা সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যায়।

গবেষকরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে সকাল ও সন্ধ্যায় সাপে বেশি  ছোবল দেয়। বন্যাপ্রবণ এলাকায় সাপে বেশি ছোবল দেয়। শীতকালে গোখরা সাপের দংশনের ঘটনা ঘটে। বর্ষাকালে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাপে কাটা রোগী হাসপাতালে আনার পথে মৃত্যু ঘটে।

বাংলাদেশে একটা প্রচলিত ভুল ধারণা আছে সাপে কাটলেই মানুষের মৃত্যু হবে। কিন্তু ৮০ শতাংশ সাপের কামড়ের ক্ষেত্রেই দেখা যায় সাপ থাকে নির্বিষ। সাপের কামড়ের পর প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত যত দ্রুত সম্ভব সাপে কামড়ানোর ওষুধ বা অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা। তাহলেই কেবল মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশে ৯৪ প্রজাতির সাপ রয়েছে। এদের মধ্যে ২৬টি প্রজাতি বিষধর। বাকি ৬৮ প্রজাতির সাপে বিষ নেই। এরা ছোবল দিলে কিছুই হয় না। বিষধর ১২ প্রজাতির সাপের অবস্থান সাগরে, বাকিগুলো গহীন জঙ্গলে এবং লোকালয়ে বাস করে।

আরও পড়ুন: ঘুমন্ত অবস্থায় সাপের কামড়ে দুই শিক্ষকের মৃত্যু

বাংলাদেশে সাপে কাটার পর মানুষ বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন বলে জানান ডাক্তাররা। এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকে সাপে কাটার পর আগে ওঝা বা কবিরাজের কাছে নিয়ে যায়। যখন রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায় তখন হাসপাতালে নিয়ে আসেন, ফলে সেই সময়ে ডাক্তারদের আর কিছু করার থাকে না। এ কারণে দেশে সাপের কামড়ে বেশি মানুষ মারা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব অঞ্চলে সাপের কামড়ে মানুষের মৃত্যু হয় সেসব অঞ্চলে যদি সাপে কাটার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুতগতিতে অ্যান্টিভেনম দেওয়া যায় তাহলে অবশ্যই সাপের কামড়ে মৃত্যু কমানো সম্ভব। বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত ও বন্যার সময় সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। তাই বর্ষা শুরুর আগেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে সারাদেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন সরবরাহ করা প্রয়োজন।

সাপে কামড়ালে কী করবেন?

সাপে কামড়ালে প্রথমেই রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে। রোগীকে ভরসা দিয়ে শান্ত রাখতে হবে। একদমই আতঙ্কিত হতে দেয়া যাবে না। কারণ সাপের কামড়ে যত মানুষ মারা যায় তার চাইতে বেশি মানুষ মারা যান কামড় খেয়ে আতঙ্কিত হওয়ার ফলে।

সাপে কামড়ানো জায়গা তৎক্ষণাৎ পরিষ্কার ব্যান্ডেজ বা সুতির কাপড় দিয়ে ঢেকে দিন, যাতে ধুলোবালি না লাগে। কামড় দেখে বুঝতে হবে যে এটি বিষধর সাপে কামড়েছে নাকি বিষহীন সাপে কামড়েছে। তারপর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। বিষাক্ত সাপের কামড়ে দুটি দাঁত বসে গিয়ে ক্ষত তৈরি হয়। নির্বিষ সাপের কামড়ে অনেকগুলো দাঁতের আঁচড় পড়তে পারে। বিষধর সাপের কামড়ে ক্ষতস্থান জ্বালাপোড়া করে।

আরও পড়ুন: গাইবান্ধায় সাপের কামড়ে গৃহবধূর মৃত্যু

কোনো অবস্থাতেই বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করা ঠিক নয়। সাপে কামড়ানোর জায়গায় কোনো ধরনের ওষুধ বা কেমিক্যাল ব্যবহার করা ঠিক নয়। বরং জায়গাটিকে সাবান বা আয়োডিন দিয়ে পরিষ্কার করা ভালো। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় সাপ যেখানে কামড় দিয়েছে সেখানে কেটে রক্ত বের করার চেষ্টা করা হয়। এতে লাভ কিছুই তো হবে না বরং আশপাশের রক্ত সংবহনতন্ত্র বা স্নায়ুতন্ত্র কেটে যেতে পারে।

সাপ যদি হাতে বা পায়ে কামড় দেয় তাহলে বাঁধন দিতে হবে। বাঁধনটি যেন খুব বেশি শক্ত না হয়। বাঁধনটি এমনভাবে দিতে হবে যেন একটা আঙুল ওই বাঁধনের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। গামছা, মাফলার, ওড়না এমন কাপড় দিয়ে বাঁধা উচিত। মনে রাখতে হবে বাঁধনটি যেন শক্ত না হয়। বাঁধনটি দেয়ার উদ্দেশ্য হলো রক্ত চলাচল বন্ধ রাখা। সাপে কাটা জায়গায় শক্ত করে বাঁধলে রক্ত জমে গিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তি পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে বাঁধনটা যেন কনুই, কবজি বা গোড়ালি এবং গলা বা মাথায় না হয়।

বিষাক্ত সাপে কাটলে বাঁচার পথ একটাই। দ্রুত হাসপাতাল যাওয়া। দংশনের পর আত্মীয়ের পরামর্শ, ওঝা-ঝাড়ফুঁকের নামে এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে সোজা রোগীকে নিয়ে বড় সরকারি হাসপাতালে যাওয়া। 

]]>