ঈদ এলেই সিনেমা, বড় পর্দায় শাকিব খান— ঢাকাই চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিন ধরে যেন এমনই এক সমীকরণ। তবে ঈদের দুই সিনেমায় নিজেকে আটকে রাখতে চান না এই সুপারস্টার। একই সঙ্গে নিজের পারিশ্রমিক, দেশের চলচ্চিত্রের বাজার, প্রযোজনা থেকে সরে আসার কারণ, ক্যারিয়ারের ভুল-আফসোস এবং দর্শকের ভালোবাসা নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
চ্যানেল আইয়ের বিশেষ অনুষ্ঠান ‘হ্যালো শাকিব খান’-এর বিশেষ পর্বে জ্যেষ্ঠ চলচ্চিত্র সাংবাদিক আবদুর রহমানের সঙ্গে আলাপচারিতায় এসব কথা বলেন শাকিব খান।
অনুষ্ঠানে শাকিবকে প্রশ্ন করা হয়, বছরের দুই ঈদের জন্যই কি তিনি এখন ফিক্সড হয়ে গেছেন? জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি এমন নয়। ঈদের বাইরেও সিনেমা করছেন তিনি। আগামী অক্টোবরের দিকে তাঁর অভিনীত ‘সোলজার’ মুক্তি পেতে পারে বলেও জানান এই তারকা।
শাকিব খানের উচ্চ পারিশ্রমিক নিয়ে প্রযোজকদের নানা অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে সহজে পাওয়া যায় না- এমন কথাও প্রায়ই শোনা যায়। এ প্রসঙ্গে শাকিব বলেন, বিষয়টি এমন নয়।
পারিশ্রমিকের প্রসঙ্গ টেনে ভারতীয় দক্ষিণী চলচ্চিত্রের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একসময় সাউথের কোনো তারকা ভাবতেও পারেননি একজন শিল্পী একটি সিনেমার জন্য ৩০০ কোটি টাকা পারিশ্রমিক পাবেন। উপস্থাপক আবদুর রহমান ভারতীয় বাজার বড় বলে উল্লেখ করলে শাকিব বলেন, বাংলাদেশের বাজারকেও ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
তাঁর ভাষায়, “আমাদের বাজার কিন্তু বিরাট বড়। আমাদেরও জনসংখ্যা অনেক। আমাদের দর্শক প্রচুর।”
দেশের সিনেমা হলের পরিবেশ নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন শাকিব। তাঁর মতে, দর্শক এখন সিনেমা দেখতে চান স্বাচ্ছন্দ্য ও ভালো পরিবেশে।
ভাঙাচোরা চেয়ারে বসে, ফ্যান কাজ না করা কিংবা ভালো ওয়াশরুম না থাকার মতো পরিবেশে দর্শক আর সিনেমা দেখতে যেতে চান না বলে মন্তব্য করেন তিনি। আধুনিক সিনেমা হল নির্মাণে সরকারের ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন শাকিব।
তাঁর মতে, দেশের চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিতে সরকারের সহযোগিতা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
শাকিব খান নিজেও কয়েকটি সিনেমা প্রযোজনা করেছেন। তবে বর্তমানে নিয়মিত প্রযোজনায় না থাকার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
শাকিব বলেন, দেশের চলচ্চিত্রের বাজার এমনিতেই ছোট হয়ে গেছে। তিনি নিজেই প্রযোজক হয়ে আবার নিজের সিনেমায় অভিনয় করলে ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন প্রযোজকদের জন্য জায়গা কমে যাবে। বরং নতুন যারা প্রযোজক হিসেবে আসছেন, তাঁদের সিনেমায় কাজ করতে চান তিনি।
তাঁর মতে, কোনো নতুন প্রযোজকের সিনেমা সফল হলে তিনি পরবর্তী সিনেমাও নির্মাণ করতে পারবেন। এমনকি কোনো সিনেমা বা গল্প নিয়ে মতের অমিল হলেও সেই প্রযোজক অন্য শিল্পীকে নিয়ে নতুন সিনেমা তৈরি করবেন। এতে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের পরিধি বাড়বে।
প্রায় তিন দশকের ক্যারিয়ারে আড়াই শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন শাকিব খান। জুটি হিসেবে সবচেয়ে বেশি সিনেমা করেছেন অপু বিশ্বাসের সঙ্গে। তার একসঙ্গে সিনেমার সংখ্যা প্রায় ৭২টি।
অনুষ্ঠানে আবদুর রহমান জানান, ক্যারিয়ারে অন্তত ৮০ জন নায়িকার সঙ্গে কাজ করেছেন শাকিব। তাদের সবার নাম মনে আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে শাকিবের সরল উত্তর, “একদমই মনে নেই।”
তিনি জানান, অনেকের সঙ্গে দীর্ঘদিন দেখা হয় না, আবার কারও সঙ্গে বহু বছর পর হঠাৎ কোথাও দেখা হয়ে যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে শাকিব রহস্য পুরুষ হয়ে গেছে। নিজের মুখোমুখি কি শাকিবের বসার সময় হয়? উপস্থাপকের এমন প্রশ্নে শাকিব হেসে বলেন, এখন প্রতিদিনই বসি। এখন মাঝে মাঝেই মনে হয়, অনেক কিছুই হয়ে গেছে; যেটা হওয়ার ছিলো না।” আব্দুর রহমান তখনই জিজ্ঞেস করেন, ‘কখনো কি মনে হয়, ভুল করেছো?’ উত্তরে শাকিব বলেন, “হ্যাঁ, তা তো মনে হয় ই। অনেক ভুল করেছি, অনেক ভুল চোখের সামনে চলে আসে। মনে হয়, ইশ- এই কাজটা না করলেই পারতাম। এটা এমন না হলে এমন হলে কী হতো।”
এসময় আব্দুর রহমান শাকিবের কাছে দুয়েকটা উদাহরণ জানতে চাইলে এই নায়ক বলেন,“অনেক কথাই তো আমার বলার আগেই মানুষ জেনে যায়। আমার বলা পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে হয় না।”
শাকিব কি পেছন ফিরে তাকাতে চায় না? এমন প্রশ্নে এই তারকা বলেন,“পেছন ফিরে তাকাই। অনেক সময় পেছনে তাকালে আফসোস লাগে। অনেক ভুল না হলে হয়তো জীবন আরো বেশি স্মুথ হতো, বা আরো অন্যরকম হতে পারতো।”
মানুষকে কতোটা ভালোবাসেন শাকিব? উত্তরে ‘তুফান’-এর নায়ক বলেন,“অনেক ভালোবাসি। জ্ঞানত আমার মনে পড়ে না কখনো আমি কারো ক্ষতি করেছি। পারলে কারো ভালো করেছি।”
সবশেষে এই তারকা বলেন, “মানুষ আমাকে অনেক ভালোবাসা দেয়। এই ভালোবাসার কাছে আমি যেমন কৃতজ্ঞ, তেমনি যখন কিছুটা ডাউন ফিল করি, কখনো মনে হয় আর যদি আমাকে দিয়ে কিছু না হয়, আমি যা পেয়েছি, মানুষের যতোটা ভালোবাসা পেয়েছি, এটা দিয়েই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারবো।”
তবে সেই ভালোবাসাই তাকে নতুন করে কাজের অনুপ্রেরণা দেয়। শাকিব বলেন,“মানুষের ভালোবাসার কারণেই আমার মনে হয়, তাদের জন্য আমাকে কাজ করতে হবে। যারা আমাকে ভালোবেসে আমার সিনেমাটা দেখতে যাচ্ছে। যারা অন্ধের মতো আমাকে সাপোর্ট করে যাচ্ছে, তার জন্য হলেও আমাকে একটা ভালো কাজ করতে হবে।”






