অবসরোত্তর বিধিনিষেধের অজুহাতে ৬০% অতিরিক্ত ভাতার দাবি বিটিআরসির: তোলপাড় প্রশাসনিক অঙ্গনে – DesheBideshe

অবসরোত্তর বিধিনিষেধের অজুহাতে ৬০% অতিরিক্ত ভাতার দাবি বিটিআরসির: তোলপাড় প্রশাসনিক অঙ্গনে – DesheBideshe


অবসরোত্তর বিধিনিষেধের অজুহাতে ৬০% অতিরিক্ত ভাতার দাবি বিটিআরসির: তোলপাড় প্রশাসনিক অঙ্গনে – DesheBideshe

ঢাকা, ০৩ অক্টোবর – রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাজস্ব আদায়ের সাফল্যকে সামনে এনে নিজেদের কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধা বাড়িয়ে নেওয়ার নজিরবিহীন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সংস্থাটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য প্রতি মাসে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে ‘রেগুলেটরি ভাতা’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভায় অনুমোদিত এ বিতর্কিত প্রস্তাবনাটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। তবে রাজস্ব আদায়কে ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা এবং চাকরি ছাড়ার পর অবসরোত্তর আইনি শর্তকে ‘আর্থিক ক্ষতির হুমকি’ আখ্যা দিয়ে অতিরিক্ত ভাতা দাবি করার ঘটনায় নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

অবসরোত্তর ৬ মাসের বিধিনিষেধকে ‘আর্থিক ক্ষতি’ দেখানোর আজব যুক্তি

বিটিআরসির কমিশন সভার নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) আইন ২০২৪’-এর ২০(৩) ধারা অনুযায়ী, বিটিআরসির কোনো কমিশনার বা কর্মকর্তা চাকরি ছাড়ার পর ৬ মাস লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোনো টেলিকম প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পারবেন না। টেলিকম খাতের সংবেদনশীলতা ও বাণিজ্যিক গোপনীয়তা রক্ষায় বিশ্বজুড়ে এমন নিয়ম চালু থাকলেও, বিটিআরসি তাদের ভাতা দাবির প্রস্তাবনায় এটিকে কর্মকর্তাদের জন্য চরম ‘আর্থিক ও পেশাগত ক্ষতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।

কমিশনের দাবি:

  • বিটিআরসিতে দীর্ঘকাল কাজ করার ফলে অর্জিত দক্ষতা মূলত টেলিকম খাতকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে।
  • ৬ মাসের আইনি নিষেধাজ্ঞার কারণে সাবেক কর্মকর্তারা ‘সাময়িকভাবে বেকার’ হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে নতুন চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
  • এতে তারা আর্থিক ও পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাই কর্মরত থাকা অবস্থাতেই ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৬০ শতাংশ অতিরিক্ত ভাতা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মত, টেলিকম খাতের রেগুলেটরি সুরক্ষা ও তথ্য সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করার বিপরীতে এ অবসরোত্তর বাধ্যবাধকতাকে ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ বানিয়ে নিয়মিত সরকারি চাকরিরত অবস্থায় ৬০ শতাংশ ভাতা দাবি করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

রাজস্ব আদায়ের বড়াই: আইনি দায়িত্ব নাকি ব্যক্তিগত কৃতিত্ব?

ভাতা দাবির সপক্ষে বিটিআরসি গত ২১ বছরের (২০০৪-০৫ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর) বিশাল রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে:

  • মোট আদায়কৃত রাজস্ব: ৮৫,৭৭৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
  • সরকারি কোষাগারে জমা: ৮২,৭৩৯ কোটি টাকা।
  • সর্বশেষ অর্থবছরে (২০২৫-২৬) আদায়: ৩,৮৮৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া: মোবাইল অপারেটর ও ইন্টারনেট সেবাদাতাদের কাছ থেকে স্পেকট্রাম ফি, লাইসেন্স রিনিউয়াল ফি এবং রেভিনিউ শেয়ারিং আদায় করা একটি সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিটিআরসির মূল আইনি ও অর্পিত দায়িত্ব। বিটিআরসি কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। নিজ অর্পিত দায়িত্ব পালন করে রাজস্ব সংগৃহীত হওয়াকে ব্যক্তিগত কৃতিত্ব দেখিয়ে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ অতিরিক্ত ভাতা দাবি করা নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সুবিধার দোহাই ও বর্তমান প্রশাসনিক ব্যয়

রেগুলেটরি ভাতা আদায়ের পক্ষে যুক্তি দিতে বিটিআরসির নথিতে অন্যান্য আর্থিক ও রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানের উদাহরণের দোহাই দেওয়া হয়েছে:

  • বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি: কর্মকর্তাদের বছরে ৫টি মূল বেতনের সমপরিমাণ ইনসেনটিভ বোনাস।
  • দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক): ২০ শতাংশ ঝুঁকি ভাতা।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর): রাজস্ব আদায়ের ওপর রিকভারি ইনসেনটিভ।

বিটিআরসির বর্তমান ব্যয়ের চিত্র:

নথি অনুযায়ী, বর্তমানে বিটিআরসিতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে সরকারের ব্যয় হয় প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। গত ২১ বছরে (২০০৫ থেকে ২০২৫ সাল) তাদের পেছনে মোট ব্যয় হয়েছে ৬১৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। জাতীয় বেতন স্কেলের সুবিধা পাওয়ার পরও নতুন করে ৬০% ভাতার এই অবাস্তব প্রস্তাবকে খোদ বিটিআরসির ভেতরেই অনেকে ‘অবিবেচনাপ্রসূত’ বলে মনে করছেন।

কর্তৃপক্ষ ও বিটিআরসির অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারীকে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিআরসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করে বলেন, “কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রেগুলেটরি ভাতা দেওয়ার বিষয়ে কমিশন সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। চাকরি শেষে অন্তত ছয় মাস টেলিকম খাতে কাজের সুযোগ না থাকা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ইনসেনটিভের বিষয় বিবেচনা করেই এ প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে।”

অন্যদিকে, খোদ বিটিআরসিরই একাধিক কর্মকর্তা অসন্তোষ প্রকাশ করে জানান, পে-স্কেল অনুমোদনের পর নতুন করে এমন অবাস্তব ভাতা এবং চাকরি শেষে বেকারত্বের অজুহাত দেখিয়ে টাকা দাবি করা যুক্তিসংগত নয়। এটি বাস্তবায়ন হলে অন্যান্য সরকারি দপ্তরেও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।

এনএন/ ০৩ অক্টোবর ২০২৬