<![CDATA[
অভিনেতা মামুনুর রশীদ রুচির দুর্ভিক্ষের কথা বলেছিলেন। হৈচৈ শুরু হয়েছিল এ নিয়ে। অথচ এরও অর্ধশতাধিক বছর আগেই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন একথা বলেছিলেন। ওই বক্তব্য সম্পর্কে এই প্রজন্মের অনেকেরই জানার কথা নয়। তারা এই ‘রুচির দুর্ভিক্ষ, দুটি শব্দের প্রথম ব্যবহারকারী হিসেবে মামুর রশীদকে মনে করে এবং তীব্রভাষায় এর সমালোচনা করে।
জয়নুল আবেদীন চল্লিশের মন্বন্তর খ্যাত মহাদুর্ভিক্ষের ছবি এঁকে কালের শীর্ষে উঠে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, দুর্ভিক্ষের মতো আর ছবি কি তিনি আঁকবেন না? তার জবাব ছিল- এখন চারিদিকে রুচিরই দুর্ভিক্ষ চলছে। একই বক্তব্য মামুনুর রশীদ যখন দিলেন তখন শিল্পীকে তুলোধুনো করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমেও।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন যখন রুচির দুর্ভিক্ষের কথা বলেছিলেন, তখন আজকের মতো ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব জাতীয় কিছুই ছিল না। যে কারণে তিনি তেমন একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হননি। যা মামুনুর রশীদকে হতে হয়েছে।
তবে রুচির যে সত্যিই দুর্ভিক্ষ চলছে, এর আরেকটা জাজ্জল্য প্রমাণ পাওয়া গেল ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর-এ কাজ করার জন্য একজন চিফ হিট অফিসার নিয়োজিত হয়ে আসাকে কেন্দ্র করে আলোচনা সমালোচনাগুলো। আর যখন জানাজানি হলো ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে কাজ করতে আসবেন যে হিট অফিসার, তিনি ক্ষমতাসীন মেয়রের কন্যা। আর যায় কোথায়- মৌচাকে ঢিল মারার প্রতিক্রিয়ার মতো শুরু হয়ে যায় সমালোচনা।
লুটপাট স্বজনপ্রীতি থেকে হেন দোষারোপ নেই যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই কয়দিন না হয়েছে। না জেনে না শুনে মেয়রকে দোষারোপ করা হলো, তার কন্যাকে চিফ হিট অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে এমনটা বলে। বলা হতে থাকে মেয়র ক্ষমতার অপব্যবহার করে মেয়েকে চাকরি দিয়েছেন, যে পদ সিটি করপোরেশনের অরগানোগ্রামেই নেই। তারা একবারও খোঁজ নেয়নি চিফ হিট অফিসার হিসেবে আদৌ সিটি করপোরেশনে কোনো নিয়োগই দেয়া হয়নি। আসলে বুশরা আফরিন বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলামের মেয়ে এটাই তাদের গাত্রদাহের কারণ। যে কারণে ইচ্ছামতো গল্পকাহিনী তৈরি করে পোস্ট এবং সমালোচনা হতে থাকে একের পর এক।
আরও পড়ুন: ঢাকায় ‘হিট অফিসার’ কেন দরকার
অথচ বুশরা আফরিনের বিদেশে উচ্চশিক্ষা লাভ, তার অভিজ্ঞতা এবং দেশের প্রাপ্তির বিষয়টি সমালোচকদের চোখে পড়েনি। কানাডায় গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ-এ উচ্চশিক্ষা লাভ করেন বুশরা। তিনি এশিয়ার প্রথম চিফ হিট অফিসারই শুধু নন, পৃথিবীর স্বল্পসংখ্যক নগরীর হিট অফিসারদেরও অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি, লস অ্যাঞ্জেলেস, চিলির সান্টিয়াগো, সিয়েরা লিওনের সান্টিয়াগো, গ্রিসের এথেন্স, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরে আর্শট-রকফেলারের চিফ হিট অফিসার রয়েছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নাম আর এই বুশরা আফরিন শুধু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনই নয়, তিনি এশিয়ায় নেতৃত্ব দেবেন। তারপরও এমন কুৎসিত সমালোচনা কেন?
৮ মে টেলিভিশন মাধ্যমে বিষয়টি সম্পর্কে প্রথম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম। ক্যামেরার সামনে আতিকুল ইসলামকে তখন বিমর্ষ মনে হচ্ছিল। যা ব্যতিক্রম বলেই মনে হয়েছে আমার কাছে। সাম্প্রতিক সমালোচনাগুলো বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায়, এই বিমর্ষ চেহারার পেছনে প্রচণ্ড ক্ষোভ কাজ করছে তার। আর হবেই না কেন, কোনো বাবা-ই তার যোগ্য মেয়ে সম্পর্কে অন্যায্য দোষারোপকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়ার কথা নয়। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হওয়ার কারণে তাকে ক্ষোভ সংবরণ করতে হয়েছে চোখ-মুখ বুঝে।
আবারও বলছি, বুশরা আফরিনকে সামনে এনে এরা আতিকুল ইসলামকে এক হাত নিতে চেয়েছে। তার প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়েছে খামোখা। তিনি যখন বলেন, চিফ হিট অফিসারের জন্য সিটি করপোরেশনে কোনো অফিস কিংবা চেয়ারও নেই। চিফ হিট অফিসারের নিয়োগ দেয়নি উত্তর সিটি করপোরেশন, তার বেতন, গাড়ি, ড্রাইভার কিছুই দেবে না সিটি করপোরেশন; সবই বহন করবে আর্শট-রকফেলার ফাউন্ডেশন; বরং বিদেশি টাকায় সেবা পাবে ডিএনসিসি নাগরিকরা, তখন জোঁকের মুখে লবণ পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে যেন। একটু পার্থক্য অবশ্য এক্ষেত্রে আছে, জোঁক লবণের ছোঁয়ায় মরে যায়, এরা মরে না। শুধু ঘাপটি মেরে থাকে। সুযোগ পেলেই ফনা তোলে।
কথিত সমালোচকরা গুজব ছড়ায় আর গুজব গুজবই। যার ভিত্তি থাকে না, সত্য যেখানে অনুপস্থিত। তাদের ভাবনায় নেই এর মাধ্যমে ঢাকার মানুষের নাগরিক সেবায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। এই বুশরা আফরিনের উছিলায় বাংলাদেশে কম-বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আসার সুযোগ তৈরি হবে। এ ধরনের কাজ যেহেতু এশিয়ার মধ্যে প্রথম ঢাকা থেকে শুরু হচ্ছে, তাই এর সুফলের ওপর ভিত্তি করে অন্যদেশগুলোও বাংলাদেশমুখি হবে। সুতরাং এর সঙ্গে দেশের সুনামও জড়িয়ে আছে।
তাপ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কাজে অবশ্যই গবেষণার বিষয়ও জড়িয়ে আছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ গবেষণাক্ষেত্র হিসেবেও গণ্য হবে, যাতে ভবিষ্যতে সুফল বৃদ্ধির সুযোগ থাকছে। ঢাকার মানুষ এই মুহূর্তে গরমে যেভাবে হাঁসফাঁস করছে, সেই উপলব্ধি থেকেও বিবেচনা করা উচিত, এই মহানগরীর মানুষের জন্য প্রাকৃতিকভাবে তাপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাটা কতটুকু জরুরি। জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাপবৃদ্ধির সম্পর্ক থাকায় আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের দুর্ভোগের চিত্র প্রকাশেরও সুযোগ বাড়বে। সুতরাং বুশরার এই নিয়োগ নিয়ে যারা সমালোচনা করছেন তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করা কি অযৌক্তিক হবে?
সমালোচনাকে উসকে দেয়া মানুষগুলোর মধ্যে এমন অনেকে আছে যারা দিনরাত অফিস ও বাড়িতে সময় কাটান এয়ার কন্ডিশন্ড রুমে। তাদের পক্ষে ঢাকার নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষের কী দুর্ভোগ- তা বোঝার কথা নয়। বুশরা আফরিন তার নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা ও নিজের শিক্ষার আলোকে ঢাকা উত্তরের মানুষকে নিরাপদ রাখার কাজে নেতৃত্ব দেবেন। বাস্তবায়ন হলে সমালোচকরাও সুফল পাবেন। তারপরও সমালোচনার উদ্দেশ্য কি?
বলার অপেক্ষা রাখে না, সমালোচকদের টার্গেট আসলে মেয়র আতিকুল ইসলাম। সাবেক মেয়র আনিসুল হকের পথ ধরে তিনি ঢাকাকে সাজানোর চেষ্টা করছেন। কিছু সুফল ঢাকার মানুষ ইতোমধ্যে পাচ্ছে। যেমন কল্যাণপুর খাল উদ্ধার, মিরপুর সাগুফতা হাউজিং এলাকায় খাল উদ্ধার ও তাকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে সংস্কার করা, পয়ঃনিষ্কাষণে দুরবস্থা দূর করতে উদ্যোগ গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ ও ব্যবস্থা গ্রহণে অগ্রণী ভূমিকা পালন, মশক নিধনে চেষ্টা করা, উত্তরের ফুটপাথগুলোকে ব্যবহারোপযোগী করা, মিরপুর এলাকায় দিয়াবাড়ি থেকে ডিওএইচএস পর্যন্ত ফুটপাথ ও রাস্তা সংস্কারের ব্যবস্থা, মহানগর এলাকায় গাছকাটায় সিটি করপোরেশনের অনুমতির নির্দেশনা, উত্তরের কিছু স্কুলে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল বাসের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষিত নগরীর রেকর্ড হয়েছে। এই দুর্নাম থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে ৫০টি ইলেক্ট্রনিক বাস চালুর ব্যবস্থা হচ্ছে, উত্তর সিটিতে ২৪টি পার্ক নির্মাণ (ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রফিস এওয়ার্ড পেয়েছেন স্বীকৃতি হিসেবে), একসময়ের আবর্জনার শহর ঢাকায় স্ট্রিট আর্ট ধারণা ও বাস্তবায়ন, এমন অনেক উদ্যোগ তার পূর্বসূরি মেয়রের পথ ধরেই এগিয়ে যাওয়ার উদাহরণ।
ঢাকা মহানগর সমস্যারও মহানগর। স্বাভাবিকভাবেই সমস্যাগুলো নাগরিক জীবনে কষ্টদায়ক। যা শতভাগ নিরসন করা সম্ভবও নয়। সেক্ষেত্রে মেয়রদের সমালোচনা সইতে হয়। আতিকুল ইসলামও ব্যতিক্রম নন। কিন্তু বিদেশি একটি সংস্থায় তার মেয়ে চাকরি পাওয়ায় তাকে তুলোধুনো করতে হবে এর কি কোনো যুক্তি আছে?
চিফ হিট অফিসার হিসেবে সাফল্য ব্যর্থতা নিরূপণের এখনও সময় আসেনি। এই মুহূর্তে নাগরিকদের কেউ যদি আগাম মূল্যায়ণ করে বসে তখন বুঝতে অসুবিধা নেই আসলে অবিবেচনা বা রুচির দুর্ভিক্ষের ব্যাপকতা কমেনি এখনও। সেই শিল্পচার্য বলেছিলেন রুচির দুর্ভিক্ষ গ্রাস করেছে সমাজে, সেটাই আরও বিস্তৃত হয়েছে আমাদের মধ্যে। এমন রুচির দুর্ভিক্ষ থেকে আমাদের ফিরে আসতে হবে, সমালোচনা করতে হবে ইতিবাচক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে, গুজবকে নিয়ে নয়।
]]>


