এক কাপ কফির আড়ালে এক সাম্রাজ্যের গল্প – DesheBideshe

এক কাপ কফির আড়ালে এক সাম্রাজ্যের গল্প – DesheBideshe


কফির আড়ালে এক সাম্রাজ্যের গল্প

স্টারবাকসের কফি শুধু এক কাপ কফি নয়। এটি অনেকের কাছে সকালের প্রথম বিলাসিতা, কারও কাছে কাজের ফাঁকে নিজের জন্য রাখা ছোট্ট অবকাশ, কারও কাছে শহরের ভিড়ে একটু বসে থাকার নিরাপদ ঠিকানা। হাতে ধরা সাদা কাপের গায়ে সবুজ সাইরেনের সেই লোগো শুধু একটি ব্র্যান্ড চিহ্ন নয়; তার ভেতরে আছে আভিজাত্যের ঘোষণা।

স্টারবাকসের দোকানগুলোকে শুধু কফি দোকান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো অনেক শহরে এক ধরনের সামাজিক মঞ্চ। কেউ সেখানে ল্যাপটপ খুলে কাজ করে, কেউ চাকরির ইন্টারভিউর আগে শেষবারের মতো নোট দেখে, কেউ বন্ধুর অপেক্ষায় বসে থাকে, কেউ আবার দিনের ক্লান্তি নামিয়ে কয়েক মিনিট নিজের মতো থাকতে চায়। ঘর ও কর্মস্থলের বাইরে মানুষের আরেকটি বসার জায়গা, এই ধারণাই স্টারবাকসকে সাধারণ কফি বিক্রির জায়গা থেকে আলাদা করেছে।

এই আভিজাত্য, সবুজ লোগো এবং বিশ্বজোড়া পরিচয়ের পেছনে যে মানুষটির গল্প আছে, তাঁর নাম হাওয়ার্ড শুলৎস। স্টারবাকসের প্রতিষ্ঠাতা তিনি নন। কিন্তু আজ যে স্টারবাকসকে পৃথিবী চেনে, তার বড় রূপকার তিনিই। তিনি কফিকে শুধু পানীয় হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন মানুষের ছোট ছোট মুহূর্ত, সম্পর্ক, অভ্যাস এবং সম্মানের অংশ হিসেবে। এভাবেই এক কাপ কফির গল্প ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে এক ব্র্যান্ডের উত্থান এবং পৃথিবীর কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

হাওয়ার্ড শুলৎস জন্মেছিলেন ১৯৫৩ সালে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে। তাঁর পরিবার পরে চলে যায় ক্যানারসির একটি সরকারি আবাসন প্রকল্পে। ছোট্ট ফ্ল্যাট, সীমিত আয়, প্রতিদিনের টানাপড়েন, আর বাবা মায়ের মুখে অর্থসংকটের চাপ, এই ছিল তাঁর শৈশবের পৃথিবী। তাঁর বাবা নানা ধরনের শ্রমজীবী কাজ করতেন। কখনও ট্রাক চালক, কখনও ক্যাব চালক, কখনও কারখানার কর্মী। হাওয়ার্ড ছোটবেলা থেকেই বুঝেছিলেন, দারিদ্র্য শুধু পকেট খালি করে না; মানুষের ভেতরেও এক ধরনের অঘোষিত লজ্জা বসিয়ে দেয়। তাঁর পারিবারিক ফাউন্ডেশনের পরিচিতিতেও বলা হয়েছে, তিনি ব্রুকলিনের পাবলিক হাউজিংয়ে বেড়ে ওঠেন এবং পরিবারের প্রথম কলেজ গ্র্যাজুয়েট হন।

স্টারবাকসের প্রথম দোকান খোলা হয়েছিল ১৯৭১ সালে সিয়াটলের Pike Place Market-এ। তখন এটি আজকের মতো কফি হাউস ছিল না। দোকানটি মূলত বিক্রি করত রোস্টেড কফি বিন, চা ও মসলা। Starbucks নামটি নেওয়া হয়েছিল হারমান মেলভিলের বিখ্যাত উপন্যাস মবি ডিক থেকে, যা সমুদ্রযাত্রা ও পুরনো কফি বাণিজ্যের স্মৃতি জাগায়।

১৯৮১ সালে হাওয়ার্ড শুলৎস তখন একটি হাউসওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করতেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, সিয়াটলের একটি ছোট দোকান অস্বাভাবিকভাবে বেশি কফি মেকার কিনছে। কৌতূহল তাঁকে সিয়াটলে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন, কফি শুধু পণ্য নয়; এর সঙ্গে আছে গন্ধ, রীতি, যত্ন ও নিষ্ঠা। ১৯৮২ সালে তিনি স্টারবাকসে যোগ দেন। কিন্তু তাঁর আসল উপলব্ধি আসে ১৯৮৩ সালে ইতালির মিলানে। সেখানে রাস্তার মোড়ে মোড়ে এসপ্রেসো বার দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান। মানুষ দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছে, কথা বলছে, হাসছে, বারিস্তা ক্রেতাদের নাম ধরে ডাকছে। দোকানগুলো শুধু পানীয় বিক্রি করছে না; মানুষকে কয়েক মিনিটের জন্য শহরের ভিড় থেকে আলাদা করে এক সামাজিক পরিসর দিচ্ছে।

শুলৎস ফিরে এসে স্টারবাকসের প্রতিষ্ঠাতাদের বললেন, শুধু কফি বিন বিক্রি করলে চলবে না; দোকানের ভেতরেই মানুষকে কফি পান করার অভিজ্ঞতা দিতে হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতারা তখনও মনে করতেন, স্টারবাকসের মূল কাজ ভালো মানের কফি বিন বিক্রি করা। কফি বার বানালে ব্যবসার চরিত্র বদলে যাবে। এই প্রত্যাখ্যান শুলৎসকে থামাতে পারেনি। বরং তাঁর ভেতরে আরেক দরজা খুলে দেয়।

১৯৮৫ সালে তিনি স্টারবাকস ছেড়ে নিজের কফি বার শুরু করেন। নাম দেন Il Giornale। এটি ছিল ইতালীয় কফি সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত। কিন্তু স্বপ্ন দেখলেই ব্যবসা দাঁড়ায় না। প্রয়োজন পুঁজি, বিশ্বাস এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানুষ। এখানেই শুরু হয় তাঁর জীবনের কঠিন অধ্যায়।

শুলৎস বিনিয়োগকারীদের দরজায় দরজায় ঘুরলেন। অনেকেই বললেন, আমেরিকানরা তিন ডলার দিয়ে কফি খাবে না। কেউ বললেন, এটি রোমান্টিক ভাবনা, ব্যবসা নয়। নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ২৪২ জন বিনিয়োগকারীর কাছে গিয়েছিলেন; ২১৭ জন তাঁকে ফিরিয়ে দেন। সেই প্রত্যাখ্যানের সংখ্যা তাঁর জীবনের ইতিহাসে দাগ কেটে আছে।

তবু তিনি থামেননি। শেষ পর্যন্ত অর্থ জোগাড় হলো। Il Giornale দাঁড়াল। ক্রেতারা এল। মানুষ শুধু কফির জন্য নয়, দোকানের ভেতরের পরিবেশের জন্য আসতে শুরু করল। ১৯৮৭ সালে এল সেই সুযোগ, যা কোনো উদ্যোক্তার জীবনে একবারই আসে। স্টারবাকসের প্রতিষ্ঠাতারা কোম্পানির নাম, রোস্টিং প্লান্ট ও সিয়াটলের ছয়টি দোকান বিক্রি করতে রাজি হলেন। শুলৎস ৩.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জোগাড় করে Il Giornale-এর মাধ্যমে স্টারবাকস কিনে নেন।

এই জায়গাটিই গল্পের আসল মোড়। যে কোম্পানি একসময় তাঁর ধারণাকে গ্রহণ করেনি, সেই কোম্পানিকেই তিনি পরে কিনে নিলেন। প্রতিশোধের জন্য নয়; নিজের দেখা সম্ভাবনাকে বাস্তবে নামানোর জন্য। শুলৎসের হাতে স্টারবাকস বদলে গেল। দোকানের আলো, গন্ধ, সংগীত, বসার জায়গা, বারিস্তার আচরণ, সবকিছু গুরুত্ব পেল। একটি কাপে নাম লেখা, কাউন্টারের ওপাশ থেকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা, দোকানের ভেতরে কফির গন্ধ বজায় রাখা, এসবই হয়ে উঠল স্টারবাকসের আলাদা অভিজ্ঞতার অংশ।

স্টারবাকস বড় হতে শুরু করার পর শুলৎস কর্মীদের সঙ্গে সেই সাফল্য ভাগ করার চিন্তা করেন। ১৯৯১ সালে চালু হয় Bean Stock, একটি স্টক অপশন কর্মসূচি। এতে বারিস্তা থেকে ম্যানেজার পর্যন্ত যোগ্য কর্মীরা কোম্পানির মালিকানার অংশ পেতে শুরু করেন। স্টারবাকসের নিজের ইতিহাস অনুযায়ী, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার প্রায় ১০০ দোকানের ৭০০ কর্মী এই কর্মসূচিতে যুক্ত হন। আংশিক সময়ের কর্মীদেরও স্টক অপশন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি অগ্রণী ভূমিকা রাখে।

আজ স্টারবাকস শুধু একটি কফি চেইন নয়; এটি বিশ্বায়নের এক সাংস্কৃতিক চিহ্ন। অফিসপাড়া, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বিমানবন্দর, শপিংমল, শহরের মোড়, সবখানে তার উপস্থিতি। ২০২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক শেষে, অর্থাৎ ২৮ জুন ২০২৬ পর্যন্ত, স্টারবাকসের মোট দোকান দাঁড়িয়েছে ৪১,৩০৪টিতে। এর মধ্যে উত্তর আমেরিকায় ১৮,৩৭১টি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ২২,৯৩৩টি দোকান রয়েছে। একই প্রান্তিকে কোম্পানির মোট রাজস্ব ছিল ৯.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে শুধু নতুন দোকান নয়, আগে থেকেই চালু থাকা স্টারবাকস দোকানগুলোর বিক্রিও ৭.৯ শতাংশ বেড়েছে।

শুধু দোকান নয়, কর্মীর সংখ্যাও বিশাল। সর্বশেষ বার্ষিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্টারবাকস বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ লাখ ৮১ হাজার মানুষকে নিয়োগ দিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার কর্মী ছিলেন।

এই সংখ্যাগুলো শুধু কর্পোরেট সাফল্যের হিসাব নয়। এগুলো দেখায়, একটি ধারণা কত দূর যেতে পারে, যদি সেটি মানুষের অভ্যাস, আবেগ ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ব্রুকলিনের সরকারি আবাসনের এক তরুণের চোখে যে স্বপ্ন জন্মেছিল, সেটিই একদিন কফি ব্যবসাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলে।

হাওয়ার্ড শুলৎসের গল্প তাই কফির গল্প নয়। এটি মানুষের নিজের ভাঙা জায়গাকে শক্তিতে পরিণত করার গল্প। একটি দরজা বন্ধ হলে আরেক দরজায় কড়া নাড়ার গল্প। সবচেয়ে বড় কথা, এটি সেই বিশ্বাসের গল্প যে ব্যবসা শুধু মুনাফার জন্য হলে বড় হতে পারে, কিন্তু মানুষের জন্য হলে দীর্ঘস্থায়ী হয়।

তথ্যসূত্র:
Starbucks Coffee Company