
আজ থেকে কয়েক বছর আগেও কানাডায় বাড়ি কেনার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া ছিল তুলনামূলক সস্তা। সুদের হার এতটাই কম ছিল যে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি ঋণের কিস্তি অনায়াসে পরিশোধ করতে পারতেন। সেই সুবিধার দিন এখন অতীত। পাঁচ বছর আগে যে বাড়ির জন্য মাসে দুই হাজার ডলার কিস্তি দিতে হতো, ঋণ নবায়নের সময় একই বাড়ির জন্য এখন অতিরিক্ত কয়েক শ ডলার গুনতে হতে পারে। অথচ বাড়িটি সেই আগেরই আছে। বদলেছে শুধু ব্যাংকের সুদের হিসাব। এই বাড়তি খরচ সামলাতে অনেক পরিবারকে ব্যয় কমাতে হচ্ছে। নিজের বাড়িতে থাকার খরচই এখন অনেকের কাছে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মর্টগেজ নবায়নের এই চাপ দেশের বিপুলসংখ্যক বাড়ির মালিককে প্রভাবিত করছে। ব্যাংক অব কানাডার ২০২৬ সালের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাকালে কম সুদে নেওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি মর্টগেজের শেষ বড় অংশটি এখন নবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাস থেকে পরবর্তী ১২ মাসে নবায়নের অপেক্ষায় থাকা এই শ্রেণির ঋণ দেশের মোট বিদ্যমান মর্টগেজের প্রায় ১২ শতাংশ। এসব ঋণগ্রহীতার মাসিক কিস্তি গড়ে ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে। অর্থাৎ যিনি এত দিন মাসে তিন হাজার ডলার কিস্তি দিতেন, তাঁকে এখন প্রায় তিন হাজার ৪৫০ ডলার দিতে হতে পারে। বছরে অতিরিক্ত খরচ পাঁচ হাজার ৪০০ ডলার। সংসারের অন্যান্য খরচের সঙ্গে এই বাড়তি অর্থের ব্যবস্থা করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কানাডায় বাড়ির মর্টগেজ সাধারণত ২০, ২৫ কিংবা ৩০ বছরে পরিশোধের পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু পুরো সময়ের জন্য সুদের হার নির্ধারিত থাকে না। অনেক বাড়ির মালিক পাঁচ বছরের জন্য নির্দিষ্ট সুদে চুক্তি করেন। সেই মেয়াদ শেষ হলে নতুন সুদের হারে ঋণ নবায়ন করতে হয়। করোনার সময় যাঁরা দুই শতাংশের কাছাকাছি সুদে ঋণ নিয়েছিলেন, তাঁদের অনেককেই এখন বেশি সুদে নতুন চুক্তি করতে হচ্ছে। ফলে মূল ঋণের কিছু অংশ পরিশোধ হয়ে গেলেও মাসিক কিস্তি কমার পরিবর্তে বেড়ে যাচ্ছে।
এই বাড়তি কিস্তি সামলাতে অনেক পরিবারকে সংসারের বাজেট নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। আয় কিছুটা বাড়লেও একই সময়ে বেড়েছে গ্রোসারি, বাড়ির বীমা, সম্পত্তিকর এবং অন্যান্য জীবনযাত্রার খরচ। ফলে প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর হাতে আগের মতো টাকা থাকছে না। ব্যক্তিগত খরচ কাটছাঁট করে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছেন অনেকে। যাঁদের আয় সীমিত কিংবা অন্যান্য ঋণ রয়েছে, তাঁদের জন্য চাপ আরও বেশি।
টরন্টো ও আশপাশের এলাকার বাড়ির মালিকদের একটি অংশ আরও কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছেন। বিশেষ করে যাঁরা ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাড়ির দাম বেশি থাকার সময় মর্টগেজ নিয়েছিলেন, তাঁদের আর্থিক চাপ তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছে ব্যাংক অব কানাডা। এর মধ্যে বাড়ির বাজারমূল্যও কমেছে। ফলে কেউ বাড়তি কিস্তি সামলাতে ঋণ পুনর্বিন্যাস করতে চাইলে সমস্যায় পড়তে পারেন। কারণ, বাড়ির বর্তমান বাজারমূল্যের তুলনায় ঋণের পরিমাণ বেশি থাকলে ব্যাংক থেকে নতুন করে অর্থায়নের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। একদিকে বাড়ির মূল্য কমছে, অন্যদিকে ঋণের কিস্তি বাড়ছে। এই দুই চাপ একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিকদের।
মর্টগেজের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে বাড়ির মালিকদের আরও বড় সমস্যায় পড়তে হতে পারে। প্রথমদিকে বকেয়া কিস্তির সঙ্গে অতিরিক্ত ফি বা জরিমানা যুক্ত হতে পারে। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণগ্রহীতার ক্রেডিট স্কোর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ভবিষ্যতে ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ পাওয়া কিংবা মর্টগেজ নবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। বকেয়া দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ব্যাংক আইনি ব্যবস্থা নিয়ে বাড়ি বিক্রি করে ঋণের টাকা আদায়ের উদ্যোগ নিতে পারে। অন্টারিওতে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘পাওয়ার অব সেল’। তবে এক বা দুটি কিস্তি দিতে না পারলেই বাড়ি হারাতে হয় না। আর্থিক সমস্যার কথা আগেভাগে জানালে ব্যাংক পরিস্থিতি বিবেচনায় কিস্তি পুনর্বিন্যাস কিংবা সাময়িক সহায়তার ব্যবস্থা করতে পারে। তাই বাড়ির মালিকদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো, কিস্তি পরিশোধে সমস্যা দেখা দেওয়ার আগেই ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করা।
মর্টগেজ নবায়নের সময় অনেক বাড়ির মালিক এখন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। কেউ নির্দিষ্ট সুদের চুক্তি বেছে নিচ্ছেন, কেউ পরিবর্তনশীল সুদের মর্টগেজের দিকে ঝুঁকছেন। আবার কেউ পাঁচ বছরের পরিবর্তে এক বা তিন বছরের চুক্তি করছেন। তাঁদের আশা, ভবিষ্যতে সুদের হার কমলে নতুন চুক্তিতে সেই সুবিধা পাওয়া যাবে। কিন্তু সুদ আরও বেড়ে গেলে কিস্তির বোঝাও বাড়তে পারে। ফলে কোন সিদ্ধান্তটি আর্থিকভাবে নিরাপদ হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে মর্টগেজ নবায়নের আগে বিভিন্ন ব্যাংকের সুদের হার ও শর্ত যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে কানাডার ফিন্যান্সিয়াল কনজিউমার এজেন্সি। যে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে, সেখানেই নবায়ন করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। অন্য ব্যাংকে ভালো সুযোগ পাওয়া গেলে ঋণ স্থানান্তর করা যায়। বর্তমান ব্যাংকের সঙ্গেও সুদের হার কমানোর বিষয়ে দরকষাকষির সুযোগ রয়েছে। তবে ব্যাংক পরিবর্তনের সঙ্গে অতিরিক্ত কোনো খরচ যুক্ত হচ্ছে কি না, সেটিও হিসাব করতে হবে।
এদিকে বাড়ি কেনার সময় মর্টগেজের ব্যবস্থা করে দেওয়া কমিউনিটির কিছু এজেন্টের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাড়ি কেনার সময় যাঁরা নানা সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্রেতাদের উৎসাহিত করেছিলেন, সংকটের এই মুহূর্তে পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করেও তাঁদের অনেককে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বারবার ফোন করেও সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের সাড়া পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন কেউ কেউ। অবশ্য মর্টগেজের সুদ বেড়ে যাওয়ার দায় কোনো এজেন্টের ওপর চাপানো যায় না। কিন্তু ঋণের শর্ত, ভবিষ্যতে সুদ বৃদ্ধির ঝুঁকি এবং কিস্তির সম্ভাব্য চাপ সম্পর্কে সঠিক ধারণা না দিয়ে বাড়ি কিনতে উৎসাহিত করার অভিযোগ রয়েছে সেইসব এজেন্টের বিরুদ্ধে। বাড়ি কেনার সময় যাঁরা ক্রেতাদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিলেন, বিপদের মুহূর্তে তাঁদের এভাবে যোগাযোগের বাইরে চলে যাওয়া নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগীরা।
মর্টগেজ নিয়ে প্রতারণা ও অসাধু মধ্যস্থতাকারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে যাঁরা অবিশ্বাস্য কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, আয়সংক্রান্ত তথ্য পরিবর্তন করতে বলেন, তাঁদের বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। অন্টারিওতে মর্টগেজ এজেন্ট ও ব্রোকারদের লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণ করে ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস রেগুলেটরি অথরিটি বা এফএসআরএ। কোনো এজেন্টের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এবং প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে অভিযোগ জানানো যায়।
মর্টগেজ এজেন্ট বা ব্রোকারের মাধ্যমে বাড়ি কিনতে গিয়ে কেউ প্রতারণার শিকার হয়ে থাকলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। বিশেষ করে ঋণের শর্ত গোপন করা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া কিংবা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ আমাদের জানাতে পারেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে আমরা আগ্রহী। আমাদের উদ্দেশ্য অসাধু ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড জনসমক্ষে তুলে ধরা, যাতে অন্য কেউ একই ধরনের প্রতারণার শিকার না হন।
কানাডায় নিজের বাড়ি অনেক পরিবারের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই সম্পদ ধরে রাখতে গিয়ে আজ অনেককেই সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মর্টগেজের সুদ ভবিষ্যতে কতটা কমবে বা বাড়বে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাই নতুন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো ভালোভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি। সাময়িক স্বস্তির আশায় ভুল সিদ্ধান্ত নিলে পরবর্তী সময়ে তার খেসারত আরও বেশি দিতে হতে পারে।
তথ্যসূত্র:
Bank of Canada: Financial Stability Report 2026
Financial Consumer Agency of Canada: Renewing Your Mortgage
OSFI: Mortgage Switching Rules




