
টেবিলজুড়ে সারি সারি খোলা পাসপোর্ট। মাঝখানে বসে আছেন পাগড়ি পরা এক ব্যক্তি। হাতে আরেকটি পাসপোর্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর পরিচয় ‘Canadian Visa King’। কখনো ভিসার সাফল্য দেখাচ্ছেন, কখনো বিলাসী জীবন। কবজিতে এমন একটি Richard Mille ঘড়ি, যার আনুমানিক দাম তিন লাখ ডলার। জায়গাটি কানাডার ব্রাম্পটন। আর মানুষটির Facebook পরিচয় ‘Visa King Office Canada Channi Bhai’।
কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল হতেই দৃশ্যপট বদলে যায়। শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। প্রশ্ন ওঠে, মানুষের ভিসা আর অভিবাসনের স্বপ্নকে পাসপোর্টের স্তূপ, দামি ঘড়ি আর ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রদর্শনীতে পরিণত করা কতটা গ্রহণযোগ্য? Firstpost America-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যম বিষয়টি তুলে ধরে। বিতর্কের একপর্যায়ে তাঁর Instagram অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু গল্পটি Channi Bhai-কে দিয়ে শুরু করে সেখানে শেষ করলে আসল চিত্রটাই অদেখা থেকে যাবে। কারণ কানাডার ইমিগ্রেশনকে ঘিরে প্রতারণা কোনো একটি জাতি বা সম্প্রদায়ের সমস্যা নয়; এর জাল বাংলাদেশসহ বহু দেশে ছড়িয়ে আছে। এই বাজারে সৎ ও পেশাদার পরামর্শক যেমন আছেন, তেমনি তাঁদের পাশে জায়গা করে নিয়েছে লাইসেন্সহীন দালাল, জাল কাগজের কারবারি, ভুয়া চাকরি বিক্রেতা, কথিত ‘ভিসা বিশেষজ্ঞ’ এবং মানুষের কানাডা যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করা প্রতারকচক্র।
প্রতারণার কৌশল আজকাল আর শুধু মিষ্টি কথা আর রঙিন ব্রোশিওরে আটকে নেই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিও। গত ৩১ জুলাই ঢাকার পুলিশ এমন একটি চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন দিত। এরপর মেডিকেল, ভিসা প্রক্রিয়া, কাগজপত্র যাচাই, টিকিটসহ নানা খাতে ধাপে ধাপে টাকা নেওয়া হতো। বিশ্বাস জন্মাতে দেখানো হতো ভুয়া কানাডীয় ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা অনুমোদনপত্র, এমনকি জাল LMIA। অস্ট্রেলিয়া সরকারের ওয়েবসাইটের আদলে বানানো হয়েছিল নকল ভিসা যাচাইয়ের ওয়েবসাইটও। সেখানে পাসপোর্ট নম্বর দিলে দেখাত, ভিসা অনুমোদিত। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের হিসাবে, ৭২ জনের বেশি মানুষ একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
ঢাকা, সিলেট কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী অধ্যুষিত শহরগুলোতে কানাডার অভিবাসন নিয়ে সেমিনার আয়োজন নতুন কিছু নয়। বড় হোটেলের সম্মেলনকক্ষ, সামনে কানাডার পতাকা, পর্দায় টরন্টোর ছবি, পরিপাটি পোশাকের বক্তা, সফল আবেদনকারীদের গল্প, সঙ্গে বিনা মূল্যে যোগ্যতা যাচাইয়ের আহ্বান। বৈধ প্রতিষ্ঠানও এ ধরনের আয়োজন করে। কিন্তু একই চাকচিক্যকে কাজে লাগিয়ে মানুষের বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করে অসাধু ব্যবসায়ীরাও।
এই প্রচারণা কতটা আগ্রাসী হতে পারে, তার একটি নমুনাও প্রকাশ্যে রয়েছে। ২০২৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার Renaissance Hotel, Gulshan-এ একটি কানাডা অভিবাসন সেমিনারের আয়োজকের নিজস্ব ওয়েবপেজে অনুষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছিল “Canadian Exclusive Seminar on Guaranteed Work & Live Pathway Program”। নামের ‘Guaranteed’ বা ‘নিশ্চিত’ শব্দটিই এখানে লক্ষণীয়। কারণ কানাডা সরকারের বক্তব্য ঠিক উল্টো: কোনো প্রতিনিধি ভিসা, চাকরি বা আবেদন অনুমোদনের নিশ্চয়তা দিতে পারেন না।
অসাধুদের কৌশল সেমিনারেই শেষ হয় না। এরপর শুরু হতে পারে ব্যক্তিগত বৈঠক। কয়েক মিনিটেই আবেদনকারীকে বলা হয়, ‘আপনি যোগ্য’। আজই অগ্রিম টাকা দিলে বিশেষ সুযোগ, চাকরি প্রস্তুত, LMIA পাওয়া যাবে, স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা নিশ্চিত, ভিসা না হলে টাকা ফেরত, এমন নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেওয়া শুরু হয়। অথচ কানাডায় কাজ, পড়াশোনা কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রতিটি কর্মসূচিরই আলাদা যোগ্যতা রয়েছে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় কানাডীয় কর্তৃপক্ষ।
তারপর মাসের পর মাস কেটে যায়। WhatsApp-এ উত্তর আসে না। অফিসে তালা। যে ফোনে প্রতিদিন কথা হতো, সেটি বন্ধ। কেউ থানায় যান, কেউ মামলা করেন, কেউ দূতাবাসের দরজায় ঘোরেন, কেউ সংবাদমাধ্যমে এসে অভিযোগ জানান। অনেক পরিবার লজ্জায় প্রথম দিকে কাউকে কিছুই বলে না। কারণ টাকা হারানোর সঙ্গে তখন যোগ হয় ধারদেনার চাপ, আত্মীয়স্বজনের প্রশ্ন আর নিজের ভুল সিদ্ধান্তের যন্ত্রণা।
এই প্রতারণার সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর একটি এখন LMIA, অর্থাৎ Labour Market Impact Assessment। সহজ ভাষায়, বিদেশ থেকে কর্মী আনার আগে কানাডীয় নিয়োগকর্তাকে দেখাতে হয় যে নির্দিষ্ট চাকরিটির জন্য উপযুক্ত কানাডীয় নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ কানাডা সরকারের নথিতেই LMIA কেনাবেচা, অনৈতিক নিয়োগ এবং দুর্বল বিদেশি কর্মীদের আর্থিকভাবে শোষণের কথা উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় নিয়োগকর্তা, তৃতীয় পক্ষ কিংবা বিদেশে থাকা মধ্যস্থতাকারীও জড়িত থাকতে পারে।
সমস্যার গভীরতা সরকারি হিসাবেও ধরা পড়ছে। ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কানাডার অস্থায়ী বিদেশি কর্মী কর্মসূচিতে উচ্চঝুঁকির ক্ষেত্রগুলোতে ১,৪৮৮টি নিয়োগকর্তা পরিদর্শন করা হয়। এর ১২ শতাংশে অনিয়ম পাওয়া যায়। জরিমানা করা হয় ১০.২ মিলিয়ন ডলারের বেশি এবং ৩০ নিয়োগকর্তাকে কর্মসূচিটি ব্যবহারে নিষিদ্ধ করা হয়।
কানাডা সরকার বলছে, অর্থের বিনিময়ে অভিবাসন বিষয়ে পরামর্শ বা প্রতিনিধিত্ব করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অনুমোদিত হতে হবে। নিয়ন্ত্রিত immigration consultant-দের নাম ও লাইসেন্সের অবস্থা College of Immigration and Citizenship Consultants-এর Public Register-এ যাচাই করা যায়; আইনজীবীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক law society-তে যাচাই করতে হয়। কানাডায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখার আগে তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি ‘কত টাকা লাগবে’ নয়। প্রশ্নটি হলো, যাঁর হাতে টাকা দিচ্ছি, তিনি আসলে কে?
তথ্যসূত্র:
Immigration, Refugees and Citizenship Canada




