
ঢাকা, ০৯ সেপ্টেম্বর – দেশের বর্ধিত জ্বালানি চাহিদা মেটানো এবং শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ যুগান্তকারী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সম্পদ উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে অভূতপূর্ব শুল্ক ছাড় ও বিশেষ মূল্য প্রণোদনার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে নারী আসন-১৭ এর সদস্য সুলতানা আহমেদ এবং মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজউদ্দীন খানের পৃথক দুটি প্রশ্নের জবাবে সরকারপ্রধান দেশের সংকট নিরসন ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার এই মাস্টারপ্ল্যান উন্মোচন করেন।
গ্যাস সংকট নিরসন ও নিজস্ব সম্পদ উত্তোলনে বিশাল মাস্টারপ্ল্যান
সম্প্রতি এলএনজি টার্মিনালে সাময়িক ত্রুটি ও জাতীয় গ্যাসের ঘাটে শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত করেন যে, দেশীয় উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি নতুন কূপ খনন করা হবে।
আন্তর্জাতিক বিডিং ও সার্ভে: গভীর সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং আহ্বান করা হয়েছে, যার দরপত্র জমা নেওয়া হবে নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। পাশাপাশি ৪,৫০০ লাইন কিমি ২ডি এবং ৪,২০০ বর্গ কিমি ৩ডি সাইসমিক সার্ভে চলছে।
অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬: স্থলভাগে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ টানতে নতুন ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ প্রণয়ন করা হচ্ছে।
নতুন এলএনজি অবকাঠামো: মহেশখালীর কুতুবজোমে ভাসমান টার্মিনাল (উৎপাদন ২০২৮) ও মাতারবাড়িতে ল্যান্ড-বেইজড টার্মিনাল (উৎপাদন ২০৩০) বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে গভীর সমুদ্রে আরও একটি ভাসমান টার্মিনালের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। ভোলার গ্যাসকেও এলএনজি করে মূল ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক অঞ্চলে সরবরাহের বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি: ছাদভিত্তিক সোলারে শুল্ক ছাড় ও আকর্ষণীয় দাম
বিদ্যুৎ খাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর লক্ষ্য—২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০% এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করা।
সৌরবিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা ও মেগা অফার:
- ছাদভিত্তিক সোলার থেকে ৫,৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক সোলার থেকে ৪,৫০০ মেগাওয়াটসহ বায়ু ও বর্জ্য বিদ্যুৎ মিলিয়ে বিপুল পরিমাণের পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হবে।
- সম্পূর্ণ শুল্ক ছাড়: সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি আমদানিতে সব ধরনের কাস্টমস, রেগুলেটরি, সম্পূরক শুল্ক ও অগ্রিম কর পুরোপুরি মওকুফ করা হয়েছে।
- উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রির অফার: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিটে ৮ টাকা ধরা হয়েছে। প্রিমিয়াম ও মুনাফাসহ গ্রিডে বিক্রির দাম ধরা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা। যেসব গ্রাহক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০৭-এর মধ্যে সোলার বসাবেন, তারা টানা ৩ বছর (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত) সরকারের কাছে এই আকর্ষণীয় দামে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবেন।
বিগত সময়গুলোতে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন চরম ধাক্কা খেয়েছে। সরকারের এই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা যদি সঠিক সময়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কেবল শিল্প খাতকেই সচল রাখবে না, বরং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন আস্থা তৈরি করবে। বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সোলারে দেওয়া শুল্ক ছাড় এবং ১০.৫০ টাকা রেটে বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ী উভয়কেই সবুজ শক্তি ব্যবহারে দারুণভাবে উৎসাহিত করবে।
এনএন/ ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

