দীর্ঘ সাত বছর পর ভারতে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং – DesheBideshe

দীর্ঘ সাত বছর পর ভারতে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং – DesheBideshe


চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

বেইজিং,১০ সেপ্টেম্বর- ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত হতে যাওয়া ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দীর্ঘ সাত বছর পর ভারতের মাটিতে তার এই বহুলপ্রতীক্ষিত সফরকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুব বেশি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, কূটনৈতিক পর্যায়ে কিছুটা অগ্রগতি দেখা গেলেও দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হওয়া গভীর অবিশ্বাস ও বৈরী মনোভাব কাটিয়ে ওঠা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

১৯৬২ সালের সীমান্ত যুদ্ধের পর থেকেই ভারত ও চীনের মধ্যে এক ধরনের মানসিক দূরত্ব ছিল। ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার রক্তক্ষয়ী সীমান্ত সংঘর্ষের পর তা আরও চরম আকার ধারণ করে। ওই ঘটনায় দুই দেশের সেনা নিহত হওয়ার পর সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং ভারত সরকার চীনা বিনিয়োগ ও ব্যবসার ওপর বিভিন্ন ধরনের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে।

যদিও গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চীন সফর এবং বিশ্ব বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কঠোর নীতির মুখে দুই দেশই নিজেদের সম্পর্কের বরফ গলাতে আগ্রহী হয়েছে, তবুও পুরোনো সন্দেহ পুরোপুরি কাটেনি। দিল্লির থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হার্শ পন্থের মতে, চীন অর্থনৈতিকভাবে অনেক শক্তিশালী এবং এই মুহূর্তে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ থাকলেও দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে যে বড় ধরনের ‘আস্থার ঘাটতি’ রয়েছে, তা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়।

বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করার উদ্যোগ সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেলেও তা এখনো যথেষ্ট নয়। চলতি বছরের মার্চে ভারত ইলেকট্রনিক্স, ক্যাপিটাল গুডস এবং সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে চীনা বিনিয়োগের নিয়ম কিছুটা শিথিল করে।

এমনকি ভারতের ডিক্সন টেকনোলজিস ও চীনা স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভিভোর যৌথ উদ্যোগের মতো কয়েকটি বড় প্রকল্পও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে বিওয়াইডি ও গ্রেট ওয়াল মোটরসের মতো চীনের বড় বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতারা আগে যেসব বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাতিল করেছিল, সেগুলো নিয়ে নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ভারতীয় সরকারি সূত্রের মতে, চীনা বিনিয়োগের ওপর নয়াদিল্লির কঠোর নজরদারিই তাদের পিছু হটার অন্যতম প্রধান কারণ।

একই সময়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনি জটিলতার কারণ দেখিয়ে ভারতীয় প্রশাসনও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কড়াকড়ি বজায় রেখেছে। সম্প্রতি চীনের অ্যান্ট গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম আলিপে-কে ভারতের অভ্যন্তরীণ দ্রুত লেনদেন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার আবেদন জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে নয়াদিল্লি। এ ছাড়া চীনা মোবাইল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান শাওমির বিরুদ্ধে বিদেশি বিনিয়োগ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্ত চালানোর প্রস্তাবও ভারতের একটি তদন্তকারী সংস্থা খতিয়ে দেখছে।

অন্যদিকে, চীনের দিক থেকেও একই ধরনের কঠোরতা ও পাল্টা চাপের কৌশল দেখা যাচ্ছে। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যের সঙ্গে মিল রেখে চীন ও ভারতকে প্রতিদ্বন্দ্বীর পরিবর্তে একে অপরের অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করলেও পর্দার আড়ালে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বলা হচ্ছে, চীনা সরকারও ভারতের কাছে উচ্চপ্রযুক্তি পণ্য, সৌর প্যানেল, বন্দর নির্মাণের সরঞ্জাম এবং বিশেষ ধরনের শিল্পযন্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের চীন সফরের ভিসা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং ভারতের অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য চীন থেকে আনা বড় বোরিং মেশিন মাসের পর মাস চীনা কাস্টমসে আটকে রাখার ঘটনাও ঘটছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রশাসনিক জটিলতা শুধু আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং ভারতের বাণিজ্যিক নির্ভরতাকে কাজে লাগিয়ে বেইজিং রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে এগুলো ব্যবহার করছে।

এস এম/ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬